“জিয়ার হ্যা-না ভোট: সংসদ বিলুপ্তি ও বিএনপি’র সংসদীয় পাপ”
১৩ মে, ২০২৩, 2:18 PM
NL24 News
১৩ মে, ২০২৩, 2:18 PM
“জিয়ার হ্যা-না ভোট: সংসদ বিলুপ্তি ও বিএনপি’র সংসদীয় পাপ”
-অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বদরুজ্জামান ভূঁইয়া-
একটি দেশে ভোট হয় ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র পরিচালকদের নির্বাচনের জন্য। সংসদীয় গণতন্ত্রে নির্বাচন হয় সাংসদ নির্বাচনের জন্য, রাষ্ট্রপতিশাসিত পদ্ধতির গণতন্ত্রে নির্বাচন হয় রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য। সংসদ কিংবা প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হয় দলভিত্তিক। সে জন্য এ নির্বাচন নিয়ে জনসাধারণ খুব সচেতন থাকে এবং সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে। যেহেতু উচ্চ হারের ভোটার উপস্থিতি নির্বাচনকে বৈধতা দেয়, তাই সব সরকারই তাদের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিপুল ভোটার উপস্থিতি ঘটাতে চায়। কিন্তু সে উপস্থিতি বাস্তবিক না কৃত্রিম, তা সব ক্ষেত্রে বোঝা যায় না। সম্পূর্ণ নির্বাচনী প্রক্রিয়া স্বচ্ছ না হলে সাধারণ মানুষের পক্ষে তা বোঝা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে, তখন নানা রকমের ধারণা কাজ করে। বিপুল ভোটার উপস্থিতি বা ভোটপ্রাপ্তি প্রত্যেক রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তিত্বের আকাঙ্ক্ষিত। এই লক্ষ্যে তাঁরা নানা রকমের চেষ্টা চালান। যেসব দেশে গণতন্ত্র বহুদিন ধরে বিকশিত হয়েছে, যেখানে রাজনৈতিক দল ও জনসাধারণ গণতন্ত্রের মূল আদর্শে বিশ্বাসী, সেসব দেশের দলগুলো ও তাদের নেতারা নির্বাচনে জনগণের অংশগ্রহণ বাড়ানোর জন্য প্রচারণা চালান। ভোটাররা যাতে নির্ভয়ে–নির্বিঘ্নে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে নিজেদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারেন, সেই লক্ষ্যে সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়। যেসব দেশে ভোটার উপস্থিতি আর ভোটপ্রাপ্তির সংখ্যার প্রতিই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়, সেসব দেশের সরকারগুলো শুধু পরিসংখ্যানটাই ব্যবহার করতে চায়।নির্বাচনে হস্তক্ষেপের কাজে রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করার নিকৃষ্টতম দৃষ্টান্ত ছিল জেনারেল জিয়াউর রহমানের ১৯৭৭ সালের তথাকথিত রেফারেন্ডাম বা গণভোট। এর কিছুদিন আগে তিনি রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমকে পদত্যাগে বাধ্য করে নিজে আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। তারপর তিনি দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত ঘুরে বেড়ান মানুষকে তাঁর ১৯ দফা কর্মসূচিতে যোগদানে উদ্বুদ্ধ করতে। ওই কর্মসূচিতে তিনি জনপ্রশাসনের মাঠপর্যায়ের সব কর্মকর্তা–কর্মচারী ও ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান–মেম্বারদের কাজে লাগান। জেলায় জেলায় ঘুরে ঘুরে জনসভায় বক্তৃতা করার মধ্য দিয়ে কিছুদিন কাটানোর পর যখন তাঁর মনে হলো যে জনসাধারণ তাঁর ভক্ত হয়ে গেছে, তখন তিনি ভাবতে লাগলেন, কীভাবে এই জনসমর্থন ব্যবহার করে নিজের অনির্বাচিত ও অবৈধ ক্ষমতা বা পদটির বৈধতা ও গ্রহণযোগ্য প্রতিপন্ন করা যায়। তিনি ঊর্ধ্বতন সামরিক–বেসামরিক আমলাদের নিয়ে একটি পরামর্শক দল গঠন করেন এবং তাঁদের সঙ্গে পরামর্শ করে একটি রেফারেন্ডাম বা গণভোট অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে নিজের ক্ষমতার বৈধতা প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা ও উদ্যোগ নেন।সেই গণভোট অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭৭ সালের মে মাসে। এর তিন মাস আগে থেকে থানায় থানায়, গ্রামে গ্রামে প্রচারণা চালানো হয়, জনসাধারণকে গণভোটে অংশগ্রহণে উদ্বুদ্ধ করার জন্য নানা রকমের পদক্ষেপ নেওয়া হয়। ১৯ দফা কর্মসূচি মাথায় রেখে গণভোটের সরল প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়: বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল জিয়াউর রহমানের ওপর আপনার আস্থা আছে কি না (হ্যাঁ অথবা না)। তখন সামরিক শাসন চলছিল, কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মকান্ড ছিল না। ফলে জিয়াউর রহমানের ওই আস্থা ভোটের বিরুদ্ধে কথা বলার বা প্রচারণা চালানোর কেউ ছিল না। জিয়াউর রহমানের নিজের পক্ষে এত প্রচারণারও প্রয়োজন ছিল না। কিন্তু তাঁর বুদ্ধিদাতা পরামর্শক দলটি কোনো ঝুঁকি নিতে সাহস পাচ্ছিল না গণভোটের দিন বিপুল ভোটার উপস্থিতি ও জিয়ার পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোট নিশ্চিত করতে। সামরিক–বেসামরিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জেলায় জেলায় গিয়ে জেলা প্রশাসকদের সঙ্গে বৈঠক করেন, তাঁদের বলেন যে গণভোটে ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ ভোটার উপস্থিতি নিশ্চিত করতে না পারলে তাঁরা ব্যর্থ বলে প্রমাণিত হবেন।ফলে সরকারি কর্মচারীরা মাঠে নেমে পড়লেন: যেভাবেই হোক, ভোটার উপস্থিতি যেন বেশি হয়। এ কাজে জেলা প্রশাসন চাপ প্রয়োগ করে অধস্তন কর্মকর্তা–কর্মচারীদের ওপর, আর তাঁরা এ দায়িত্ব দেন ইউনিয়ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের ওপর। এসবের ফলে দেখা গেল, গণভোটে সারা দেশে ভোট পড়েছে ৯০ শতাংশ, আর এই ৯০ শতাংশের ৯৯ শতাংশ ভোটই পড়েছে জিয়াউর রহমানের পক্ষে (অর্থাৎ হ্যাঁ ভোট)।জিয়াউর রহমানের অতি উৎসাহী বুদ্ধিদাতা ও সরকারি কর্মকর্তা–কর্মচারীদের কারণে হোক, আর যে কারণেই হোক, গণভোটের ঘোষিত ফলাফলে এই ভোটার উপস্থিতি ও হ্যাঁ ভোটের অবিশ্বাস্য উচ্চ হার দেশে–বিদেশে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।
বিএনপি জানে, তারা নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসবে না। তাই তারা মাঝেমধ্যেই নতুন ফর্মুলা নিয়ে হাজির হয়। বিএনপি তাদের পুরনো অপকৌশল অবলম্বন করে নির্বাচন ও নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অপতৎপরতা শুরু করেছে। নির্বাচনে নিজেদের ক্রমাগত ব্যর্থতার কারণে রাষ্ট্রক্ষমতা পরিবর্তনের সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করার ষড়যন্ত্র শুরু করেছে।এদেশের গণতন্ত্র ও নির্বাচনী ব্যবস্থাকে প্রহসনে পরিণত করেছিল বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান। সামরিক ফরমান জারি করে জিয়াউর রহমান জোরপূর্বক নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করেছিল। রাষ্ট্রপতি হতে জিয়াউর রহমানের কোনো প্রস্তাবক ও সমর্থকের প্রয়োজন ছিল না।’একই সাথে অবৈধভাবে রাষ্ট্রপতি, সেনাপ্রধান ও প্রধান সামরিক আইন কর্মকর্তা পদে থেকে হ্যাঁ/না ভোটের আয়োজন করে। যা সম্পূর্ণভাবে অসাংবিধানিক এবং বাংলাদেশ সামরিক বাহিনী বিধিমালা পরিপন্থী। জিয়াউর রহমান জাতিকে কারফিউ মার্কা গণতন্ত্র উপহার দিয়েছিল এবং সামরিক আইন বহাল রেখে ১৯৭৭ সালে হ্যাঁ/না ভোট, ১৯৭৮ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন এবং ১৯৭৯ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজন করেছিল। জিয়াউর রহমানের পদাঙ্ক অনুসরণ করে তার পতœী বেগম খালেদা জিয়া। যার ধারাবাহিকতায় রাষ্ট্রক্ষমতা কুক্ষিগত করার অভিপ্রায়ে খালেদা জিয়া ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি প্রহসনের নির্বাচন করেছিল। বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনিকে বিরোধীদলীয় নেতার আসনে বসিয়ে মহান জাতীয় সংসদকে কলঙ্কিত করেছিল।বিএনপি এদেশের সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রধান প্রতিবন্ধক ও বাংলাদেশের রাজনীতির সকল অশুভ শক্তির প্রতিভূ। জনগণ কর্তৃক বার বার প্রত্যাখ্যাত হয়ে বিএনপি আজ তাদের ব্যর্থতার দায়ভার জাতির উপর চাপাচ্ছে। এমনকী নিজেদের দুর্নীতিবাজ নেতৃত্বকে জায়েজ করতে সংগঠনের গঠনতন্ত্র পরিবর্তন করেছে। তারাও স্বৈরাচারী জিয়ার মতো জোর করে ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে চায়।যেমনটা ১৯৭৮সালে ভোটের দুদিন আগে সড়কের পাশের দেয়ালে, চলমান রিকশা-বাস ও মানুষের ব্যক্তিগত গাড়ি থামিয়ে জোর করে জেনারেল জিয়ার সামরিক পোশাক পরিহিত পোস্টার সাঁটিয়ে দেয়া হয়। একধরনের আতঙ্ক ছড়ানো হয় মানুষের মধ্যে। ভোটের দিন ভয়ে কেউ বের হওয়ার সাহস পায়নি। ফলে ভোটারবিহীন থেকে যায় ভোটকেন্দ্রগুলো। একপর্যায়ে মানুষ খুঁজে না পেয়ে শেষ পর্যন্ত স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীদের ভোট দিতে নিয়ে যাওয়া হয়। এই প্রক্রিয়ার সংসদীয় নির্বাচন কখনোই একটা দেশের গনতান্ত্রিক মানদন্ড হতে পারেনা যেখানে মানুষের স্বাধীনতা থাকবেনা। তাই সংসদ বিলুপ্তি করে বিএনপি তাদের সংসদীয় পাপ পুনরাবৃত্তি না করাটাই এই বাঙালি জাতির জন্য এবং সর্বোপরি গনতন্ত্রের জন্য ফলপ্রসু হবে।