NL24 News
১৮ অক্টোবর, ২০২৩, 11:38 AM
পাবনা মানসিক হাসপাতাল ও অতীত ইতিবৃত্তে হেমায়েতপুর
-মোহাম্মদ সেলিম রেজা-
পাবনা জেলার হেমায়েতপুর গ্রামটি পদ্মার তীরে অবস্থিত। তখন পদ্মার পানি এখানে প্রবাহিত হলেও এখন পদ্মার গতিপথ প্রায় ৫ কিলোমিটার সরে গেছে। এখানেই গড়ে উঠেছে পাবনা মানসিক হাসপাতাল। ১৯৫৭ সালের জুলাই মাসে পাবনা শহরের শীতলাই জমিদারবাড়িতে ৬০টি শয্যা নিয়ে হাসপাতালের কার্যক্রম শুরু হয়। দুই বছর পর হাসপাতালটি হেমায়েতপুর গ্রামে স্থানান্তর করা হয়। হাসপাতালের এলাকা মোট ১৩৩.২৫ একর। হাসপাতালটি নির্মাণে ব্যবহৃত জমির সিংহভাগই ছিল শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূল চন্দ্রের। মানব কল্যাণে তিনি সর্বতভাবে আত্মনিয়োগ করেছিলেন। তিনি সারা জীবন অপরিসীম ত্যাগ-তিতিক্ষা সাধনার মধ্যে নিজেকে নিহিত করেছিলেন। মানসিক রোগের চিকিৎসায় দেশের প্রথম এবং একমাত্র বিশেষায়িত সরকারি হাসপাতাল শুধু দেশে নয় ভারতীয় উপমহাদেশের মধ্যে প্রসিদ্ধ। তাই, বিভিন্ন প্রান্ত থেকে রোগীদের নিয়ে স্বজনরা ছুঁটে আসেন মানসিক রোগ চিকিৎসার একমাত্র ভরসা হিসেবে পরিচিত এই হাসপাতালে।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপ ২০১৮-২০১৯ এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রাপ্তবয়স্ক (১৮ বছরের বেশি) মানুষের মধ্যে ১৮ শতাংশের বেশি কোনো না কোনো মানসিক রোগে আক্রান্ত এবং ১২ দশমিক ৬ শতাংশ কিশোর-কিশোরীর (৭-১৭ বয়সী) মধ্যে মানসিক রোগ শনাক্ত করা গেছে।
পাবনা মানসিক হাসপাতালের ধারণক্ষমতা ৬০ শয্যা বিশিষ্ট ছিল। পরে ১৯৬৬ সালে প্রথম দফায় শয্যা সংখ্যা বাড়িয়ে ১৫০ ও পরে ২০০টি করা হয়। ১৯৯৬ সালে শেষ দফায় ৫০০ শয্যায় উন্নীত করা হয় এই হাসপাতালটিকে। পুরুষদের জন্য ১৪টি ওয়ার্ড এবং মহিলাদের জন্য ৫টি ওয়ার্ড রয়েছে। হাসপাতালটি দোতলা বিশিষ্ট। এখানে পেইং বেড ২৪% এবং সাধারণের জন্য ৭৬%। এতে ইনডোর ও আউটডোর সুবিধা রয়েছে। সরকার স্বীকৃত একটি ওয়েলফেয়ার সোসাইটি রোগীদের সাহায্য সহযোগিতা করে। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র ১৮৮৮ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর বঙ্গ প্রদেশের পাবনা জেলার হেমায়েতপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা শিবচন্দ্র চক্রবর্তী ও মাতা মনোমোহিনী দেবী অত্যন্ত আদরের পুত্রের নাম রাখেন- অনুকূলচন্দ্র চক্রবর্তী। শিষ্যরা তাঁকে ভালোবেসে ‘ঠাকুর’ বলে ডাকতেন। উনিশ শতকের শেষার্ধে হেমায়েতপুরের মাটিতে ঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের প্রাক-আবির্ভাব পরিস্থিতি ছিল খুবই সংকটাবহ। সুস্থ জীবনযাপনকামী জনজীবন ও সামাজিক পরিবেশে ছিল ভয়াবহ অস্থিরতা। হেমায়েতপুর ছিল অন্যায়, অপবাদ, অপশাসন, নিপীড়ন ও বিশৃঙ্খলায় ভরপুর। মানুষের চিন্তাভাবনায় ছিল অপসংস্কৃতি, অশিক্ষা ও কুসংস্কারপূর্ণ।
মানুষের শরীরে কলেরা, প্লেগসহ মৃত্যুমহামারি দেখা দিয়েছিল ভয়াবহরূপে। পরস্পরের প্রতি ছিল বিভেদ ও তিক্ত অসন্তোষ। ছিল না সম্প্রীতি- শালীনতা। দিন-রাতে নারী সম্ভ্রম লুণ্ঠনের মুক্ত মঞ্চে পরিণত হয়েছিল। এমন পরিবেশে ঠাকুর অনুকূলচন্দ্র যেন মানুষের কল্যাণে আলোকবর্তীকা হয়ে এলেন। অনুকূলচন্দ্র ছিলেন একজন চিকিৎসক, শিক্ষাবিদ এবং সমাজ সংস্কারক। কর্মের মাধ্যমে যোগ্যতর মানুষ গড়ে তোলাই ছিলো তাঁর লক্ষ্য। তিনি যখন পাবনা ইনস্টিটিউশনের ছাত্র, তখন থেকেই মাতা মনোমোহিনী দেবীর আদর্শে হেমায়েতপুরের মাটি ও মানুষকে হৃদয়ের আবেগে ভালোবাসতে শিখেছিলেন। তিনি কলকাতার ন্যাশনাল মেডিক্যাল স্কুলের ছাত্র ছিলেন। শিক্ষা বিস্তারে তিনি তপোবন বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। হেমায়েতপুরে গড়ে তুলেছিলেন ‘সৎসঙ্গ’ নামে একটি জনহিতকর সংগঠন। সৎসঙ্গ বিশ্ববিজ্ঞান কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন বিজ্ঞান চেতনা বিস্তারে। তিনি মানুষকে বিবেকবান হতে ও আত্মশক্তি অর্জনে আধ্যাত্মিক ধ্যান মননে আগ্রহী করে তুলেছিলেন।
ঠাকুর অনুকূলচন্দ্র জনহিতকর সংগঠন ‘সৎসঙ্গ’-এর মাধ্যমে জীবনমুখী একটি আধ্যাত্মিক আন্দোলন শুরু করলেন। তাঁর জীবনের সফলতা এবং উচ্চতর আধ্যাত্মিক উপলব্ধির প্রচার বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিষ্ঠানটির নামের তাৎপর্য ব্যখ্যা করে তিনি বলেন, ‘সৎ ও সংযুক্তির সহিত তদগতিসম্পন্ন যাঁরা তাঁরাই সৎসঙ্গী, আর তাদের মিলনক্ষেত্র হল সৎসঙ্গ। মানুষ তৈরির আবাদস্থল। কর্মের মাধ্যমে যোগ্যতর মানুষ গড়ে তোলাই হল এর লক্ষ্য।’ ঠাকুর অনুকূলচন্দ্র মোট ৮২টি বই লিখেন। ১২টি বই লিখেছেন ইংরেজিতে। তাঁর বইয়ের মুলকথা ছিলো- কিভাবে মানুষ ভাল থাকবে, সুস্থ থাকবে, শান্তিপূর্ণ ভাবে সবাই মিলে মিশে থাকবে। তিনি তাঁর সময়ের মহান নেতাদের প্রভাবিত করেছিলেন। মহাত্মা গান্ধী, নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু, লাল বাহাদুর শাস্ত্রী, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, গুলজারীলাল নন্দা, শেরে বাংলা এ.কে ফজলুল হক এই সৎসঙ্গের কর্মকা- দর্শন করে ভূয়শী প্রশংসা করেন। ঢাকা, পাবনা ও চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন শহরে তাঁর নামে আশ্রম ও কার্যালয় রয়েছে।
অসংখ্য মানুষ এই সৎসঙ্গ সংগঠনের সাথে তাদের হৃদয়ের আবেগে কেন্দ্রীভূত ছিলেন। ঠাকুর অনুকূলচন্দ্র ৫৮ বছর বয়সে হেমায়েতপুর ছেড়ে ১৯৪৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর ভারতের ঝাড়খ-ের দেওঘরে আসেন। সাধারণ মানুষের কথা ভেবে ১৯৪৬ সালে বিহারের ‘দেওঘর’ এলাকায় তপোবন বিদ্যালয়, দাতব্য চিকিৎসালয়, ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপ, পাবলিশিং হাউজ, ছাপাখানা ইত্যাদি প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগ হয়। তাঁর সম্পত্তিসমূহ আজও বাংলাদেশ সরকারের সরকারি সম্পত্তি হিসেবে রয়ে গেছে।
একটি অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর শৈশবের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেছিলেন, “আমার আব্বা (শেখ মুজিবুর রহমান) পাবনা সৎসঙ্গ আশ্রমে গিয়েছিলেন যখন শ্রীশ্রীঠাকুর ছিলেন। আশ্রম ও তার আশপাশ দেখে তিনি খুব আনন্দিত হলেন। তিনি উল্লেখ করেছিলেন, এত সুন্দর জায়গা আমি জীবনে দেখিনি, কোনো বইয়ে পড়িনি, কারো কাছ থেকে আগে শুনিনি। সৎসঙ্গ আশ্রমে কে হিন্দু কে মুসলমান বা খ্রিস্টান তা স্বীকার করা খুবই কঠিন। এই কথাগুলো এখনো আমার কানে বাজে।”
ভারতের বরেণ্য ঔপন্যাসিক সুকেশ কুমার ম-ল পাবনার হেমায়েতপুর নিয়ে দীর্ঘকাল গবেষণারত। সম্প্রতি তিনি গবেষণাধর্মী গ্রন্থ ‘তপোভূমি হিমাইতপুর’ প্রকাশ করে দেশ-বিদেশে সুখ্যাতি অর্জন করেছেন। লেখক : সাংবাদিক ও গবেষক