“৩০ মে গণতন্ত্র হরণের দিবস”
৩১ মে, ২০২৩, 3:19 PM
NL24 News
৩১ মে, ২০২৩, 3:19 PM
“৩০ মে গণতন্ত্র হরণের দিবস”
-অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বদরুজ্জামান ভূঁইয়া-
প্রাচীনকালে বঙ্গ নামে পরিচিত জনপদ থেকেই মূলত আজকের বাঙালি জাতির ও স্বাধীন বাংলাদেশের উৎপত্তি। বঙ্গ জনপদ থেকে স্বাধীন বাংলাদেশ হওয়ার পিছনে রয়েছে বাঙালি জাতির গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। বাঙালি জাতি ইতিহাসের শুরু থেকে আজ পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের লড়াই সংগ্রাম যেমন ফকির আন্দোলন, ফরায়েজি আন্দোলন, নীল বিদ্রোহ এবং সবশেষ ১৯৭১ এ পাকিস্তানের বিরুদ্ধে মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে আজকের বাংলাদেশ গড়ে তুলেছে। এতো গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের মাঝেও বাংলাদেশের এবং বাঙালি জাতির রয়েছে কিছু কলঙ্কিত এবং ঘৃণিত অধ্যায়। ১৯৭১ সনে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দূরদর্শী নেতৃত্বের মাধ্যমে প্রায় ৩০ লক্ষ শহীদদের রক্ত এবং ২ লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে বাঙালি জাতি অর্জন করেছিল। যুদ্ধ বিধ্বস্ত বাংলাদেশকে সকলকের সহায়তা নিয়ে নতুন করে গড়ে তুলেছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টে জিয়াউর রহমান এবং আরোও কিছু কুচক্রী মিলে ক্ষমতার লোভে নির্মমভাবে সপরিবারে হত্যা করেছে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। পূনরায় বাঙালি জাতি এবং বাংলার মানুষ তাদের অধিকার হারালো।
পাকিস্তানী শাসন নামে শোষণ এবং অত্যাচার থেকে মুক্তি হলেও জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করার মাধ্যমে বাংলার জনগণ বন্দী হলো সামরিক শাসক এবং বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারী জিয়াউর রহমানের শাসন নামক অত্যাচারের জাতাঁকলে। গণতন্ত্রকে হত্যা করে শুরু হয় জিয়া’র একনায়কতান্ত্রিক সামরিক স্বৈরশাসন। ১৯৭৭ সালে এপ্রিল মাসে প্রেসিডেন্ট আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমকে ক্ষমতাচ্যুত করে, অবৈধভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করেন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান। এরপর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে একটি হ্যাঁ-না ভোটের আয়োজন করেন তিনি। লোক দেখানো সেই ভোটের আগে, বিক্ষোভের ভয়ে, রাস্তায় কোনো মানুষকে পর্যন্ত বের হতে দেওয়া হয়নি। এমনকি কোনো প্রচারণাও করা হয়নি। ভোটের দুদিন আগে সড়কের পাশের দেয়ালে, চলমান রিকশা-বাস ও মানুষের ব্যক্তিগত গাড়ি থামিয়ে জোড় করে জেনারেল জিয়ার সামরিক পোশাক পরিহিত পোস্টার সাঁটিয়ে দেওয়া হয়। এক ধরনের আতঙ্ক ছড়ানো হয় মানুষের মধ্যে। ভোটের দিন ভয়ে কেউ বের হওয়ার সাহস পায়নি। ফলে ভোটারবিহীন থেকে যায় ভোটকেন্দ্রগুলো। এক পর্যায়ে মানুষ খুঁজে না পেয়ে, শেষ পর্যন্তস্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রীকে ভোট দিতে নিয়ে যাওয়া হয়। দিন শেষে ঘোষণা আসে, ৯৯.৪ ভাগ ভোট পেয়ে একচেটিয়াভাবে জয় লাভ করেছেন জেনারেল জিয়া। এইভাবে স্বৈরশাসক জিয়ার জাতাঁকলে বাংলার মানুষ হারায় তাদের গণতান্ত্রিক জীবনধারা এবং হারিয়েছে সব ধরনের স্বাভাবিক জীবনধারণের অধিকার। জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর শুরু হয় বাঙালি জাতির জীবনের কালো অধ্যায়। স্বৈরাচারী জিয়াউর রহমান বাংলার মানুষের অধিকার হরন করেই কেবল শান্তহয়নি বরং ক্ষমতা পেয়ে তা ব্যবহার করে এমন কোনো অন্যায় নাই যা তার দ্বারা হয়নি। অবৈধ উপায়ে ক্ষমতা দখল করেই দুর্নীতি, দুঃশাসন ও নৈরাজ্যে মেতে ওঠেন স্বৈরশাসক জিয়াউর রহমান। ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করতে বৈধতা অর্জনে বিএনপি গঠন করে জিয়া। জানা গেছে, বিএনপির পুরো শাসনামল আকণ্ঠ দুর্নীতিতে নিমজ্জিত ছিলো। বিভিন্ন পন্থায় তিনি তরুণদের দুর্বৃত্তায়নের দিকে ধাবিত করেন বলে সমালোচনাও রয়েছে। জিয়ার হাতে তৈরি বিএনপি পরবর্তীতে রাষ্ট্রীয় দুর্নীতি ও দুঃশাসনে মেতে ওঠে। ঐতিহাসিক তথ্যসূত্র বলছে, স্বৈরশাসক জিয়া রাষ্ট্রীয় টাকার বিপুল অপচয় ঘটিয়ে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক কাঠামোর বিভিন্ন স্তরে নানা কৌশলে দুর্বৃত্তায়নের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ক্ষমতা দখল এবং ক্ষমতায় টিকে থাকতে অসংখ্য সেনা কর্মকর্তাকে বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ রয়েছে জেনারেল জিয়াউর রহমানের বিরুদ্ধে। বঙ্গবন্ধুর আমলে যেখানে প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় হতো মূল বাজেট বরাদ্দের ১৩ শতাংশ, সেখানে ১৯৭৮ সালে প্রেসিডেন্ট জিয়ার আমলে তা দাঁড়ায় ২৯ শতাংশে। দেশের যুবকদের দুর্নীতিগ্রস্তকরতে যুব কমপ্লেক্সের নামে দেশজুড়ে উন্মুক্ত-চাঁদাবাজির প্রচলন করেন জিয়া। মাত্র তিন বছরে বাংলাদেশে ৩ হাজার ৬৭০টি যুব কমপ্লেক্স করা হয়। এই যুব কমপ্লেক্সের আয়ের উৎস ছিল দেশের হাট-বাজার ও মেলা থেকে আদায়কৃত টাকা। ১৯৭৯-৮০, ১৯৮০-৮১ এই দুই অর্থবছরে বাজার ও মেলা থেকে আয় হয়েছিল ১২ কোটি ৭৪ লাখ ৮৭ হাজার ২০০ টাকা। এসব টাকা গেছে যুব কমপ্লেক্সের অন্তর্ভুক্ত সমবায় সমিতির পান্ডাদের পকেটে। এসময় জিয়া চোখ বন্ধ করে ছিলেন কারণ সন্ত্রাসীরা জিয়ার রাজনৈতিক সমর্থক ছিলো। বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশে পাকিস্তানিদের যেসব সম্পত্তি জাতীয়করণ করেছিলেন, তা জিয়া তাদের ফিরিয়ে দেন। যাদের ফিরিয়ে দিতে পারেননি তাদের ক্ষতিপূরণ দেন। জিয়া মদ, জুয়া ও পতিতাবৃত্তির লাইসেন্স প্রদান করে সমাজ নষ্টের বিষবৃক্ষ রোপণ করেন। তখনকার প্রজন্মকে দুর্নীতিগ্রস্ত করে তুলেছিলেন জিয়া। গ্রাম্য যুবকদের তিনি হাট-বাজারের ইজারার অধিকার দিয়ে দলীয় ক্যাডারে পরিণত করেন। প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র যারা ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মহান মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত প্রতিটি সংগ্রামে গৌরবোজ্জ্বল ভুমিকা রেখেছেন তাদেরকে নষ্ট রাজনীতির পঙ্কিল পথে টেনে আনেন। এসব মেধাবী ছাত্ররা লেখাপড়া ভুলে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি থেকে শুরু করে টেন্ডারবাজি, তদবিরবাজি, হলের সিট ভাড়া ইত্যাদি বিভিন্ন অপকর্মে লিপ্ত হয়। জিয়ার পুরো শাসনামলে দেশে দুর্নীতির ব্যাপক বিস্তার ঘটে। দুর্নীতির কারণে পিছিয়ে পড়ে দেশ। এছাড়া স্বৈরাচারী জিয়াউর রহমান কর্তৃক গঠিত রাজনৈতিক দল বিএনপি ও বাংলার ইতিহাসে দূর্নীতির ক্ষেত্রে সবসময় সফলতার পদচিহ্ন রেখে গিয়েছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপি ও দুর্নীতি একে অপরের পরিপূরক শব্দ। বাংলাদেশে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন বিএনপির হাত ধরেই শুরু। জানা গেছে, রাষ্ট্রীয় সম্পদ তছরুপ, চুরি-দুনীতি ও সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের জন্য সারা দেশে বিএনপির রাজনীতি মুখ থুবড়ে পড়েছে। বিএনপির নেতা-কর্মীদের চোর-বাটপার সন্ত্রাসী হিসেবে মনে করে দেশবাসী। অতীত অপকর্মের কারণে বিএনপি নেতারা সমাজে মুখ দেখাতে পারেন না। যার কারণে বিএনপির নেতা-কর্মীদের সাথে মেয়ের বিয়ে দেয়াসহ অন্যান্য সম্পর্ক স্থাপন করতে চায় না দেশের বেশিরভাগ মানুষ। যা বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও নিজ মুখে স্বীকার করেছেন। অনেকেই মনে করেন বাংলাদেশে দুর্নীতির সূত্রপাত হয় স্বৈরাচারী জিয়াউর রহমানের সুযোগ্য উত্তরসূরী তারেক রহমানের হাত ধরে। বড় বড় দুর্নীতিবাজদের দুর্নীতির হাতেখড়ি তারেক রহমানের হাত ধরে হয়েছে। বাংলাদেশের দুর্নীবাজদের জনক হিসেবে চির স্মরণীয় হয়ে থাকবে ইতিহাসে। তারেক রহমান দুর্নীতিবাজদের জাতীয় পিতা। এতিমদের সহায়তা করার উদ্দেশ্যে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট এর নামে বিদেশ থেকে থেকে আসা ২ কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৭১ টাকা আত্মসাত করেছিলেন তারেক ও তার মা খালেদা। বিএনপি দলের সব ধরনের দূর্নীতির শিক্ষক মূলত স্বৈরাচারী জিয়াউর রহমান। একজন দূর্নীতিবাজ এবং স্বৈরাচারী ব্যক্তি হাতে গড়া সংগঠন এবং তার নেতাকর্মীরাও তার দেখানো পথে হেটে বাংলার মানুষের জীবন তাদের অগণতান্ত্রিক শাসনামলে বিষিয়ে তুলেছে। স্বৈরাচারী জিয়ার এবং তার প্রতিষ্ঠিত দল বিএনপি এর অগণতান্ত্রিক এবং দূর্নীতিপূর্ণ শাসনামলকে বর্তমান এবং অনাগত প্রজন্মের কাছে পরিচয় করিয়ে দিতেই মূলত ৩০ মে দিনটিকে বাংলাদেশ সরকার এবং জনসাধারণ কর্তৃক গণতন্ত্র হরণ দিবস হিসেবে পালন করা হয়। ৩০ মে ১৯৮১ সালে বাংলার জনগণ স্বৈরাচারী জিয়াউর রহমানের হাত থেকে মুক্তি পায় এবং পূণরায় গণতান্ত্রিক জীবনধারায় ফিরে আসতে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে একতাবদ্ধ হয়ে দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে আজ বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলায় গণতান্ত্রিক জীবন ফিরে পেয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশের গণতান্ত্রমনা জনগণ ৩০ মে দিনটিকে গণতন্ত্র হরণ দিবস হিসেবে পালন করে মূলত একজন স্বৈরাচারী এবং অগণতান্ত্রিক শাসকের সকল অগণতান্ত্রিক কার্যকলাপের প্রতি তীব্র ঘৃণা ব্যক্ত করেন। এই গণতন্ত্র হরণ দিবস উদযাপনের মাধ্যমে বাংলার জনগণ আরোও বেশি গণতন্ত্রে বিশ্বাসী হবে এবং স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রে বিশ্বাসী এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় অবিচল গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতকে শক্তিশালী করে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তুলতে সহায়তা করবে বলে আশা রাখি।