প্রতি ১০ নারীর আটজনই রক্তস্বল্পতায় ভুগছেন
নিজস্ব প্রতিবেদক
০৮ নভেম্বর, ২০২৬, 2:27 PM
নিজস্ব প্রতিবেদক
০৮ নভেম্বর, ২০২৬, 2:27 PM
প্রতি ১০ নারীর আটজনই রক্তস্বল্পতায় ভুগছেন
মাসিকের সময় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, গর্ভাবস্থা, সন্তান জন্মদানকালে পুষ্টির বাড়তি চাহিদা এবং অন্যান্য সময়েও উপযুক্ত খাদ্যাভ্যাসের অভাব নারীর রক্তস্বল্পতার ঝুঁকি বাড়ায়। এসব কারণে পুরুষের তুলনায় নারীর রক্তস্বল্পতায় আক্রান্ত হওয়ার হার প্রায় দ্বিগুণ। স্বাস্থ্যসেবা নিতে আসা নারীদের ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, ১০ জনের প্রায় আট নারীই রক্তস্বল্পতায় আক্রান্ত। পুরুষদের ক্ষেত্রে এ হার ১০ জনে প্রায় চারজন।
চট্টগ্রাম বিভাগের চারটি গ্রামীণ ইউনিয়নে স্বাস্থ্যসেবা নিতে আসা প্রাপ্তবয়স্কদের তথ্য নিয়ে সম্পন্ন গবেষণাটি গত ১০ অক্টোবর প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক সাময়িকী হেলথ সায়েন্স রিপোর্টস। গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত ৪৫৯ জনের মধ্যে ৫৯ দশমিক ৩ শতাংশের রক্তস্বল্পতা পাওয়া গেছে।
নারী ও পুরুষের নমুনা আলাদা করে বিশ্লেষণ করে দেখেছেন গবেষকরা। নারীর নমুনায় আক্রান্তের হার পাওয়া গেছে ৭৭ দশমিক ৯ শতাংশ। অন্যদিকে, পুরুষের নমুনায় রক্তস্বল্পতায় ভোগার হার ৩৯ দশমিক ৭ শতাংশ।
আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে ২৭ শতাংশের মৃদু, ২৯ দশমিক ৬ শতাংশের মাঝারি এবং ২ দশমিক ৬ শতাংশের তীব্র রক্তস্বল্পতা পাওয়া গেছে। অর্থাৎ প্রতি তিনজনের প্রায় একজন মাঝারি মাত্রার রক্তস্বল্পতায় আক্রান্ত।
গবেষণার উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা গেছে, পুরুষের তুলনায় নারীর মৃদু রক্তস্বল্পতায় আক্রান্ত হওয়ার আপেক্ষিক ঝুঁকি ২ দশমিক ৫১ গুণ। আবার মাঝারি রক্তস্বল্পতার ক্ষেত্রে এ ঝুঁকি ১১ দশমিক ৫৩ গুণ।
তীব্র রক্তস্বল্পতার ক্ষেত্রেও নারীরাই বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। তবে গবেষণায় এ ধরনের রোগীর সংখ্যা কম হওয়ায় এই হিসাবের অনিশ্চয়তা তুলনামূলক বেশি। এদিকে কম ওজনের মানুষের মধ্যে মাঝারি মাত্রার রক্তস্বল্পতার ঝুঁকি বেশি বলে সতর্ক করছে এই গবেষণা। ফলাফল বলছে, স্বাভাবিক ওজনের মানুষের তুলনায় কম ওজনের মানুষের রক্তস্বল্পতার ঝুঁকি বেড়ে যায় ৩ দশমিক ৪২ গুণ।
তবে শুধু আক্রান্তের হারেই নয়, রোগের তীব্রতার বিচারেও নারী-পুরুষের মধ্যে রয়েছে উদ্বেগজনক ব্যবধান। এই গবেষণা জানাচ্ছে, মাঝারি মাত্রার রক্তস্বল্পতায় ভোগা নারীর আপেক্ষিক ঝুঁকি পুরুষের তুলনায় ১১ গুণেরও বেশি।
এই গবেষণাকালে চারটি গ্রামীণ ইউনিয়নে স্বাস্থ্যসেবা নিতে আসা দুই হাজার ১১৮ জন প্রাপ্তবয়স্কের তথ্য বিবেচনায় নেওয়া হয়। হিমোগ্লোবিন পরীক্ষার তথ্য পাওয়া গেছে এমন ৪৫৯ জনকে চূড়ান্ত বিশ্লেষণে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তাদের মধ্যে ২৩৫ জন নারী এবং ২২৪ জন পুরুষ।
এসব ফলাফলের নিরিখে গবেষকদের পরামর্শ, গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে রক্তস্বল্পতা প্রতিরোধ ও চিকিৎসার উদ্যোগ নেওয়ার ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের বৈষম্যকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।
রক্তস্বল্পতার কারণ কী
দেশে কৈশোর থেকেই অনেক মেয়ে অপুষ্টিতে ভোগে বলে জানালেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. আফসানা হাবিব শিউলী। রক্তস্বল্পতার কারণ নিয়ে সমকালকে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে নারীদের রক্তস্বল্পতার প্রধান কারণ পুষ্টিহীনতা, কম বয়সে বিয়ে ও মাতৃত্ব। এর মধ্যে বিয়ে ও গর্ভধারণের কারণে শরীরে পুষ্টির চাহিদা আরও বেড়ে যায়। কিন্তু প্রয়োজন অনুযায়ী আয়রন ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদানসমৃদ্ধ খাবার না পাওয়ায় তাদের রক্তস্বল্পতার ঝুঁকি বাড়ে।’
এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ জানালেন, বাংলাদেশে রক্তস্বল্পতার সর্বশেষ উল্লেখযোগ্য তথ্য পাওয়া যায় ২০২০ সালের জাতীয় মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট সার্ভেতে। ওই জরিপে রক্তস্বল্পতার হার ছিল প্রায় ২৫ শতাংশ। তবে জরিপটি এখনও সরকারিভাবে অনুমোদিত নয়। তাই জাতীয় পর্যায়ে তথ্যসূত্র হিসেবে এর ব্যবহার সীমিত।
রক্তস্বল্পতা প্রতিরোধে পুষ্টিকর খাবার সম্পর্কে সচেতনতার অভাবও একটি বড় সমস্যা। ডা. আফসানা হাবিব শিউলী বলেন, ‘পরিবারগুলোকে বৈচিত্র্যময় খাবার খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হলেও বাস্তবে খাদ্যাভাসে এর প্রতিফলন কম।’
কোন খাবার থেকে কী ধরনের পুষ্টি পাওয়া যায়, সে সম্পর্কে অনেকের পর্যাপ্ত ধারণা নেই বলেও উল্লেখ করলেন এই চিকিৎসক। তাঁর মতে, পুষ্টি বিষয়ে সার্বিক সচেতনতা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপনে অভ্যস্ত হতে সামাজিক ও আচরণ পরিবর্তন যোগাযোগ (এসবিসিসি) কার্যক্রম আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
নারীরা ঝুঁকিতে যেসব কারণে
রক্তস্বল্পতার অন্যতম পরিচিত কারণ আয়রনের ঘাটতি। আবার ফলেট ও ভিটামিন বি১২-এর ঘাটতি, দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ, সংক্রমণ এবং বংশগত কিছু রক্তরোগও রক্তস্বল্পতার কারণ হতে পারে। পুষ্টিকর খাবারের অভাব ও স্বাস্থ্যসেবায় সীমিত প্রবেশাধিকার যুক্ত হয়ে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
এই গবেষণায় রক্তস্বল্পতার সব কারণ আলাদাভাবে নির্ণয় করা হয়নি। এ ছাড়া নির্দিষ্ট চারটি ইউনিয়নে স্বাস্থ্যসেবা নিতে আসা মানুষের তথ্যের ভিত্তিতে গবেষণার ফলাফল সাজানো হয়েছে। আর এসব তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে প্রায় এক দশক আগে। তাই এই ফলাফলকে জাতীয় চিত্র হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে জানিয়েছেন গবেষকরা।
রক্তস্বল্পতার কারণ নিয়ে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সব ধরনের রক্তস্বল্পতার কারণ আয়রনের ঘাটতি নয়। তাই কারণ নির্ণয় না করে শুধু আয়রন ট্যাবলেট খাওয়া ঠিক নয়। হিমোগ্লোবিন, ফেরিটিনের পরিমাণ পরীক্ষা করে চিকিৎসা নিতে হবে।
এই গবেষণার সহগবেষক ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশের (ইউল্যাব) মিডিয়া স্টাডিজ অ্যান্ড জার্নালিজম বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম। তিনি বলেন, রক্তস্বল্পতা কমাতে সচেতনতামূলক প্রচারণাই যথেষ্ট নয়। এ জন্য সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ প্রয়োজন।
এই স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ, গ্রামীণ নারীর জন্য নিয়মিত রক্তের হিমোগ্লোবিন পরীক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে কিশোরী, সন্তান ধারণের বয়সী নারী ও গর্ভবতীদের অগ্রাধিকার দিতে হবে। আমিনুল ইসলাম আরও বলেন, ‘যাদের রক্তস্বল্পতা পাওয়া যাবে, তাদের ক্ষেত্রে প্রয়োজন অনুযায়ী আরও পরীক্ষা করে প্রকৃত কারণ নির্ণয় করতে হবে।’
আয়রন ও ফলিক এসিডের সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের সুযোগ বাড়ানোর দিকেও নজর দিতে বলেন ইউল্যাবের এ শিক্ষক।
একই সঙ্গে তিনি বলেন, ‘শুধু ওষুধ বিতরণ করলেই হবে না। নারীরা নিয়মিত ওষুধ খাচ্ছেন কিনা, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এবং চিকিৎসায় উন্নতি ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণে আনতে হবে।’ পরিবারের খাদ্যাভ্যাসেও পরিবর্তন আনায় জোর দিয়েছেন এই গবেষণার সহগবেষক আমিনুল ইসলাম।
সচেতন করতে তিনি বলেন, ‘মাছ, মাংস, ডিম, ডাল, শাকসবজি ও আয়রনসমৃদ্ধ খাবার খাওয়ার সুযোগ বাড়াতে হবে। আয়রনসমৃদ্ধ খাবারের সঙ্গে ভিটামিন সি-যুক্ত ফল খেলে শরীরে আয়রন শোষণ ভালো হয়। পাশাপাশি খাবারের সঙ্গে চা পান না করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।’
কিশোরীদের পুষ্টি ও প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে বিশেষ উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করছেন এই গবেষক। তাঁর মতে, ‘বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, নিরাপদ মাতৃত্ব এবং সন্তান জন্মদানের মধ্যে যথেষ্ট বিরতি নিশ্চিত করতে হবে। এতে নারীদের শরীর সুস্থ হয়ে ওঠার সুযোগ পাবে।’
এ ছাড়া গ্রামের কমিউনিটি ক্লিনিক, স্বাস্থ্যকর্মী ও মোবাইল স্বাস্থ্যসেবার মাধ্যমে নিয়মিত পরীক্ষা ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। যেসব নারীর মাঝারি বা তীব্র রক্তস্বল্পতা রয়েছে, তাদের দ্রুত উপযুক্ত চিকিৎসাকেন্দ্রে পাঠাতে হবে। নারীর পুষ্টি নিশ্চিত করতে পরিবারের সদস্যদেরও সম্পৃক্ত করা জরুরি।
আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘পরিবারের পুরুষ সদস্যদের বুঝতে হবে, নারীর পুষ্টি ও স্বাস্থ্য শুধু তাঁর নিজের দায়িত্ব নয়, পুরো পরিবারেরই দায়িত্ব।’
থ্যালাসেমিয়া রোগী বেশি চট্টগ্রামে
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও রক্তরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মো. সালাহউদ্দিন শাহ জানান, চট্টগ্রাম অঞ্চলের মানুষের মধ্যে থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্তের হার বেশি। রক্তস্বল্পতার প্রকৃত কারণ নির্ণয় করায় গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, ‘বিশেষ করে মাঝারি ও তীব্র রক্তস্বল্পতায় নারীদের বেশি আক্রান্ত হওয়ার ফলাফল উদ্বেগজনক। মাঝারি ও তীব্র রক্তস্বল্পতায় আক্রান্তদের অবহেলা করার সুযোগ নেই। ডা. সালাহউদ্দিন শাহ বলেন, নারী ও পুরুষের রক্তস্বল্পতার ফলাফলে ব্যবধানের প্রকৃত কারণ জানতে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর ওপর আরও গবেষণা প্রয়োজন। সূত্র : দৈনিক সমকাল