ঢাকা ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
সংবাদ শিরোনাম
উপাচার্য পরিবর্তনের প্রতিবাদে চুয়েটে সর্বাত্মক শাটডাউন বাসভাড়া বাড়ল দূরপাল্লা ও মহানগরে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছুটি পুনর্নির্ধারণ দূরপাল্লার বাসে কিমি প্রতি ৮ পয়সা, শহরে ১০ পয়সা ভাড়া বাড়ানোর প্রস্তাব জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর ইস্যুতে আইএমএফের কোনো শর্ত নেই: জাহেদ উর রহমান নারীর গোলাপি বাস: তেলের টাকাই উঠছে না দিনে ভর্তুকি ৫০ হাজার নিয়ম না মানলে অনুমোদিত ক্লিনিকও বন্ধ: স্বাস্থ্যমন্ত্রী বেশ কয়েকটি দ্বিপক্ষীয় ও বহুপাক্ষিক বৈঠকে অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী: মাহদী আমিন জাপানে টাইফুন দুজুয়ানের তাণ্ডব, বাতিল শত শত ফ্লাইট ও বন্ধ রেল চলাচল সারের পর ডিজেল, বড় পরীক্ষায় কৃষক

খুলনায় ডেঙ্গুতে এক রাতে দুই অন্তঃসত্ত্বার মৃত্যু, মেলেনি আইসিইউ

#

নিজস্ব প্রতিনিধি

২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,  11:17 AM

news image

নাহিদ হাসান ও নুসরাত জাহান দম্পতি চিকিৎসকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন গত ১৫ সেপ্টেম্বর। তাদের তৃতীয় সন্তান আগমনের জন্য গত রোববার সিজারিয়ান অপারেশনের দিন নির্ধারণ করে দেন সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক। নতুন সদস্যের আগমনের ক্ষণ গুনছিলেন সবাই। নবজাতকের নামও ঠিক করা ছিল। তবে গত রোববার আনন্দের বদলে বিষাদ নামে পুরো পরিবারে।


নাহিদ হাসান বলেন, গত শুক্রবার নুসরাতের ডেঙ্গু ধরা পড়ে। ওই দিন রক্তের প্লাটিলেট ৬২ হাজারে নেমে যায়। তাকে নগরীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরদিন অবস্থার অবনতি হলে আইসিইউতে (নিবিড় পরিচর্যা) স্থানান্তরের পরামর্শ দেন চিকিৎসক। প্রথমে কয়েকটি বেসরকারি হাসপাতালে আইসিইউ শয্যার জন্য চেষ্টা করে পাইনি। পরে রাতে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাই। সেখানেও আইসিইউ শয্যা ফাঁকা ছিল না। পরে অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হই। রোববার ভোরে ফরিদপুরের ভাঙ্গার কাছে পৌঁছালে নুসরাত নিস্তেজ হয়ে পড়ে। দ্রুত স্থানীয় একটি হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। চিকিৎসকরা গর্ভের সন্তানকে বাঁচানোর চেষ্টা করেও পারেননি।


একই সময়ে খুলনার একটি বেসরকারি হাসপাতালে সাদিয়া আফরিন সুমাইয়া নামে আরেক অন্তঃসত্ত্বা নারীর মৃত্যু হয়। পরিবারের সদস্যরা জানান, গত বুধবার সুমাইয়ার মায়ের এবং শুক্রবার বাবার শরীরে ডেঙ্গু ধরা পড়ে। জ্বরে আক্রান্ত হন সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা সুমাইয়াও। গর্ভকালীন জটিলতা ভেবে হাসপাতালে যাননি তিনি। গত শনিবার রাতে শরীরে রক্তক্ষরণ শুরু হলে দ্রুত তাঁকে গাজী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান স্বজনরা। চিকিৎসকরা তাঁকে আইসিইউতে ভর্তির পরামর্শ দেন। ওই হাসপাতালে আইসিইউ না থাকায় তাঁকে বেসরকারি সিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানেও আইসিইউ ফাঁকা পাওয়া যায়নি। অন্য হাসপাতালগুলোতে আইসিইউ ফাঁকা না থাকায় তাঁকে ওই হাসপাতালের লেবার ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়। গত রোববার ভোরে সুমাইয়া মারা যান। সুমাইয়ার মা রিনা বেগম এখনও ওই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।


শুধু নুসরাত ও সুমাইয়াই নন; খুলনায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। সরকারি তথ্যে তাদের নাম আসছে না। গত দুদিন স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য ঘেঁটে এ দুজনের নাম পাওয়া যায়নি। 

স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যে শুধু সেপ্টেম্বরের ২০ দিনে খুলনা মেডিকেল কলেজ ও জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন ২ হাজার ৮৯৮ জন। মারা গেছেন ১১ জন। তবে বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আক্রান্তের সংখ্যা কয়েক গুণ বেশি। 


২৪ ঘণ্টায় আরও ছয়জনের মৃত্যু

ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে গতকাল সোমবার সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় আরও ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে ডেঙ্গু নিয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৬৫৫ জন। এ নিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১৯০-এ দাঁড়িয়েছে। আর এ বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন মোট ৬৩ হাজার ৬২৭ জন। গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোলরুমের ডেঙ্গুবিষয়ক ড্যাশবোর্ড থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।


স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২৪ ঘণ্টায় সবচেয়ে বেশি রোগী ভর্তি হয়েছেন চট্টগ্রাম বিভাগে– ৩১৪ জন। খুলনা বিভাগে ভর্তি হয়েছেন ২৭১ জন এবং ঢাকা বিভাগের (সিটি করপোরেশনের বাইরে) ২৮১ জন।

এ ছাড়া বরিশাল বিভাগে ২১৭ জন, রাজশাহী বিভাগে ১৪৬, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ১৬৭, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ১৬৬, ময়মনসিংহ বিভাগে ৪৩, রংপুর বিভাগে ৪১ ও সিলেট বিভাগে ৯ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।


‘আমি কাকে আম্মু বলে ডাকব’

খুলনা নগরীর সিদ্দিকীয়া মহল্লার কাছেই নাহিদ হাসানদের পারিবারিক ভবন। গতকাল দুপুরে বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তাদের বড় ছেলে রাইয়ান হাসান ও ছয় বছর বয়সী মেয়ে রওদা হাসান পরিবারের অন্য শিশুদের সঙ্গে খেলছে। রাইয়ান কিছুটা শোকাচ্ছন্ন হলেও রওদা এখনও মা হারানোর শোক বুঝে উঠতে পারছে না।


নাহিদের বড় ভাই মাহমুদ হাসান সোহেল বলেন, ওদের সুখের সংসার ছিল। নতুন সদস্যের আগমন নিয়ে আমরা সবাই উচ্ছ্বসিত ছিলাম। কীভাবে কী হয়ে গেল, এখনও বুঝে উঠতে পারছি না। ছোট মেয়েটার জন্য বেশি খারাপ লাগছে। মাঝেমধ্যে ও প্রশ্ন করছে, ‘আমি কাকে আম্মু বলে ডাকব?’


পরিবারের সদস্যরা জানান, নুসরাত বটিয়াঘাটার ইউসুফিয়া দাখিল মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করতেন। গর্ভধারণের পর তিনি চাকরি ছেড়ে দেন। গত ১৫ সেপ্টেম্বর তাঁর ডেঙ্গু ধরা পড়ে। নুসরাতই অন্য শিশুদের মশা থেকে দূরে রাখার জন্য সাবধান করতেন।


নুসরাতের স্বামী নাহিদ হাসান খুলনার গ্রামীণফোন সেন্টারের ডেপুটি ইনচার্জ হিসেবে কাজ করছেন। তিনি বলেন, ‘কীভাবে কী হয়ে গেল, কিছুই বুঝতে পারছি না!’ 


মাকে খুঁজছে দেড় বছরের কেয়া

খুলনা নগরীর বসুপাড়ায় সাদিয়া আফরিন সুমাইয়ার বাবার বাড়ি। স্বামী শেখ ইশতিয়াজ সম্রাট পেশায় আইনজীবী। তাদের দেড় বছর বয়সী কেয়া নামের একটি কন্যাসন্তান রয়েছে। মা হারানো সেই কেয়া একটু পরপর বলছে, ‘আমার সোনা মা কোথায়?’ 


এক স্বজন জানান, দ্বিতীয়বার গর্ভধারণ করায় সুমাইয়া বাবার বাড়িতেই ছিলেন। তাঁর শরীরে কয়েক দিন ধরে জ্বর ছিল। এটি গর্ভকালীন কোনো উপসর্গ ভেবে চিকিৎসকের কাছে যাননি। শেষ সময় হাসপাতালে নেওয়ার পর কোথাও আইসিইউ শয্যা পাওয়া যায়নি। শরীরের অবস্থা বেশি খারাপ হওয়ায় তাৎক্ষণিকভাবে ডেঙ্গু পরীক্ষাও করা হয়নি। তাঁর মৃত্যুসনদে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধের কথা লেখা রয়েছে। 

খুলনা সিটি করপোরেশনের (কেসিসি) প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. শরীফ শাম্মীউল ইসলাম বলেন, স্বাস্থ্য বিভাগ ও আমরা সরাসরি হাসপাতাল থেকে তথ্য সংগ্রহ করি। হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ভর্তি এবং মৃত্যু না হলে সেই তথ্য আমাদের কাছে আসে না।


কেসিসি প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, এডিস মশা নির্মূলে কেসিসি সব শক্তি নিয়োগ করেছে। ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসায় কেসিসির পক্ষ থেকে বিনামূল্যে সাতটি মেডিকেল ক্যাম্প চালু রয়েছে। সূত্র : সমকাল 

logo

সম্পাদক ও প্রকাশক : মো. নজরুল ইসলাম