সিআইএর গোপন স্থাপনায় ইরানি হামলায় রুশ সম্পৃক্ততা খতিয়ে দেখছে যুক্তরাষ্ট্র
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
২৩ জুলাই, ২০২৬, 11:03 AM
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
২৩ জুলাই, ২০২৬, 11:03 AM
সিআইএর গোপন স্থাপনায় ইরানি হামলায় রুশ সম্পৃক্ততা খতিয়ে দেখছে যুক্তরাষ্ট্র
উপসাগরীয় অঞ্চলে সিআইএর একাধিক স্থাপনায় ইরানের ড্রোন হামলার ঘটনায় লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ কিংবা উন্নত ড্রোন প্রযুক্তি সরবরাহে রাশিয়ার কোনো ভূমিকা ছিল কি না, তা তদন্ত করে দেখছেন মার্কিন গোয়েন্দা বিশ্লেষকেরা। বিষয়টির সঙ্গে পরিচিত চারটি সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে।
জাতীয় নিরাপত্তার স্পর্শকাতর বিষয় হওয়ায় নাম প্রকাশ না করার শর্তে সূত্রগুলো জানায়, রাশিয়ার সম্পৃক্ততার বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি। তবে হামলার লক্ষ্যভেদের নির্ভুলতা, এর কার্যকারিতা এবং ইরানের প্রতি মস্কোর দীর্ঘদিনের প্রযুক্তিগত সহযোগিতাকে তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
এর আগে রয়টার্সসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এবং মার্কিন কর্মকর্তারা স্বীকার করেছিলেন, উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুর ওপর ইরানের হামলায় রাশিয়া লক্ষ্যবস্তু নির্বাচনসহ নানা ধরনের সহায়তা দিয়েছিল। তবে সিআইএর স্থাপনাগুলোতে হামলার ক্ষেত্রে মস্কোর সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার তদন্তের বিষয়টি এবারই প্রথম প্রকাশ্যে এলো।
রয়টার্স ও অন্যান্য গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চে অন্তত দুটি সিআইএ স্থাপনায় হামলা হয়। এর একটি ছিল সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে মার্কিন দূতাবাসের ভেতরে থাকা সিআইএ স্টেশন। অন্যটি ছিল ইরাকের পূর্বাঞ্চলের একটি স্থাপনা। কয়েকটি সূত্রের দাবি, আরও কয়েকটি সিআইএ স্থাপনাও হামলার শিকার হয়েছিল। তবে নিরাপত্তাজনিত কারণে সেগুলোর অবস্থান বা বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
গোয়েন্দা নথিতে রাশিয়ার সম্ভাব্য সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত : একটি পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থার অভ্যন্তরীণ নথিতে আঞ্চলিক সিআইএ স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করতে রাশিয়ার সম্ভাব্য ভূমিকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন নথিটি দেখা এক আঞ্চলিক কর্মকর্তা।
এ ছাড়া গোয়েন্দা প্রতিবেদনের বিষয়ে অবগত উপসাগরীয় অঞ্চলের দুই পশ্চিমা কর্মকর্তা জানান, সৌদিতে হামলায় রাশিয়ার প্রযুক্তিতে উন্নত করা ইরানের দুটি শাহেদ ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছিল বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথম ড্রোনটি দূতাবাস ভবনের বাইরের দেয়ালের তুলনামূলক দুর্বল অংশে আঘাত করে বড় একটি ছিদ্র সৃষ্টি করে। এরপর দ্বিতীয় ড্রোনটি সেই ছিদ্র দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে বিস্ফোরিত হয়। তবে এ ঘটনায় কেউ নিহত বা আহত হয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানকে রাশিয়ার প্রযুক্তিগত সহায়তা নতুন কিছু নয়। তবে সিআইএর মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করতে সহায়তা করা হয়ে থাকলে, সেটি যুক্তরাষ্ট্রের কার্যক্রম ব্যাহত করতে মস্কোর আরও প্রত্যক্ষ ভূমিকার ইঙ্গিত দিতে পারে। বিশেষ করে এমন সময়ে, যখন ওয়াশিংটন ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের অবসান ঘটানোর চেষ্টা করছে।
গত সপ্তাহের শেষে জর্ডানে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিমানঘাঁটিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় দুই মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার পর রাশিয়া তেহরানকে লক্ষ্যবস্তু-সংক্রান্ত তথ্য সরবরাহ করছে কি না, তা নিয়েও উদ্বেগ বেড়েছে।
এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে হোয়াইট হাউস বিষয়টি সিআইএর কাছে পাঠায়। তবে সিআইএ কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। জাতিসংঘে ইরানের মিশন, রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এবং সৌদি সরকারও এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
‘কমেটা-এম’ প্রযুক্তি নিয়ে প্রশ্ন : সূত্রগুলোর দাবি, রাশিয়া ইরানের শাহেদ ড্রোনের লক্ষ্যভেদ সক্ষমতা উন্নত করতে সহায়তা করেছে। তাদের ধারণা, রিয়াদের হামলায় ওই উন্নত সংস্করণের ড্রোনই ব্যবহার করা হয়েছিল।
আরেকটি সূত্র জানায়, রাশিয়া ইরানকে ‘কমেটা-এম’ নামে একটি স্যাটেলাইট নেভিগেশন ব্যবস্থা দিয়েছে, যা শাহেদ-১৩৬ ড্রোনের নির্ভুলতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রযুক্তি ইরানের নিজস্ব ব্যবস্থার তুলনায় অনেক বেশি নির্ভুল এবং ইলেকট্রনিক জ্যামিং মোকাবিলায়ও কার্যকর।
গত মার্চে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল প্রথম এ তথ্য প্রকাশ করলেও ক্রেমলিন সেটিকে ‘ভুয়া খবর’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছিল।
তদন্তের কেন্দ্রবিন্দু লক্ষ্যবস্তু নির্বাচন : বিদেশে সিআইএর কার্যক্রমের আওতায় দূতাবাসভিত্তিক স্টেশনের পাশাপাশি নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র, লজিস্টিক হাব, নজরদারি কেন্দ্র এবং বিভিন্ন গোপন অপারেশনের স্থাপনা রয়েছে। এসব স্থাপনার অবস্থান অত্যন্ত গোপন রাখা হয়।
সূত্রগুলো হামলার শিকার স্থাপনাগুলোর সুনির্দিষ্ট সংখ্যা বা অবস্থান প্রকাশ করেনি। একজনের ভাষ্য, আক্রান্ত স্থাপনার সংখ্যা ‘একটির বেশি, তবে এক ডজনের কম’। আরেকজন বলেন, একাধিক স্থাপনা হামলার শিকার হয়েছে।
মার্কিন গোয়েন্দারা এখন বিশেষভাবে তদন্ত করছেন, রিয়াদে মার্কিন দূতাবাসে হামলার সময় ইরান রাশিয়ার দেওয়া লক্ষ্যবস্তু-সংক্রান্ত তথ্য ব্যবহার করেছিল কি না।
তবে তদন্তসংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্র সতর্ক করে বলেছে, ইরানের মূল লক্ষ্য হয়তো পুরো মার্কিন দূতাবাসই ছিল এবং ঘটনাক্রমে সিআইএ স্টেশনটিও হামলার শিকার হয়েছে।
তা সত্ত্বেও কয়েকজন বিশ্লেষকের মতে, রাশিয়া ছাড়া খুব কম দেশই এমন সংবেদনশীল লক্ষ্যবস্তুর তথ্য সংগ্রহ এবং তা সামরিক অভিযানে ব্যবহারের সক্ষমতা ও আগ্রহ রাখে।
সাবেক সিআইএ স্টেশন প্রধান ও আন্ডারকভার অপারেশন কর্মকর্তা ড্যানিয়েল হফম্যান বলেন, যদি মস্কো তেহরানকে সিআইএর স্থাপনা লক্ষ্যবস্তু করতে সহায়তা করে থাকে, তাহলে তাতে বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই।
তার ভাষায়, ‘রাশিয়া ও ইরান—উভয়েরই লক্ষ্য নিজেদের প্রভাববলয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমিয়ে দেওয়া, কিংবা পুরোপুরি সরিয়ে দেওয়া।’