শেষ হচ্ছে ইলিশের মৌসুম, ৩০ শতাংশ কম আহরণ
নিজস্ব প্রতিবেদক
১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, 11:27 AM
নিজস্ব প্রতিবেদক
১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, 11:27 AM
শেষ হচ্ছে ইলিশের মৌসুম, ৩০ শতাংশ কম আহরণ
দেশে ইলিশ আহরণ কমেছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই-আগস্টে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ইলিশ আহরণ ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কমেছে বলে প্রাথমিক হিসাব দিয়েছে মৎস্য অধিদপ্তর। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ইলিশের উৎপাদনের হিসাব এখনও চূড়ান্ত না হলেও তা পাঁচ লাখ টনের নিচে নেমেছে বলে জানিয়েছে অধিদপ্তর। ফলে টানা তিন বছর উৎপাদন কমার মধ্য দিয়ে শেষ হচ্ছে এবারের ইলিশ মৌসুম। আগামী ৮ থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত সারাদেশে ইলিশ আহরণ নিষিদ্ধ থাকবে।
মৎস্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশে ইলিশ উৎপাদন সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ ৭১ হাজার টনে পৌঁছেছিল। এর পর ২০২৩-২৪ অর্থবছরে উৎপাদন কমে পাঁচ লাখ ২৯ হাজার টনে এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আরও কমে প্রায় পাঁচ লাখ টনে নামে।
ইলিশের উৎপাদন কমার এই প্রবণতা সংশ্লিষ্ট গবেষকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। তাদের মতে, নদী ও মোহনায় নাব্য কমে যাওয়া, পানি প্রবাহ হ্রাস, দূষণ, অতিরিক্ত আহরণ, ছোট ফাঁস জালের ব্যবহার এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব একসঙ্গে ইলিশের প্রজনন ও অভিবাসনকে বাধাগ্রস্ত করছে।
প্রায় দুই দশক ধরে ধারাবাহিকভাবে ইলিশ উৎপাদন বাড়ছিল। মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০০১-০২ অর্থবছরে দেশে ইলিশ উৎপাদন ছিল প্রায় দুই লাখ টন। ২০০৭-০৮ অর্থবছরে তা বেড়ে দুই লাখ ৯৫ হাজার টনে দাঁড়ায়। এর পর উৎপাদন আরও বাড়তে থাকে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ইলিশ উৎপাদন হয় চার লাখ ৯৬ হাজার টন। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে প্রথমবারের মতো তা পাঁচ লাখ টন ছাড়িয়ে পাঁচ লাখ ১৭ হাজার টনে পৌঁছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে পাঁচ লাখ ৩২ হাজার, ২০১৯-২০ সালে পাঁচ লাখ ৫০ হাজার, ২০২০-২১ সালে পাঁচ লাখ ৬৫ হাজার এবং ২০২১-২২ সালে পাঁচ লাখ ৬৬ হাজার টন ইলিশ উৎপাদিত হয়। ২০২২-২৩ অর্থবছরে উৎপাদন সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ ৭১ হাজার টনে পৌঁছানোর পর পরিস্থিতি বদলে যায়। পরের দুই অর্থবছরে উৎপাদন ধারাবাহিক কমতে থাকে। চলতি অর্থবছরের প্রাথমিক আহরণ পরিস্থিতি নিম্নমুখী প্রবণতা আরও তীব্র হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক আনিসুর রহমান বলেন, ৩৩ বছর ধরে ইলিশ নিয়ে গবেষণা করছি। কিন্তু উৎপাদন কমে যাওয়ার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে এতটা শঙ্কিত হইনি। প্রাকৃতিক কারণের পাশাপাশি অতিরিক্ত মাছ আহরণ ও ছোট ইলিশ ধরা উৎপাদন কমার বিশেষ কারণ বলে আমি মনে করি।
এ পরিস্থিতিতে ইলিশের প্রজনন সুরক্ষায় আগামী ৮ থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত সারাদেশে ২২ দিন ইলিশ আহরণে নিষেধাজ্ঞা আসছে। এ সময়ে ইলিশ পরিবহন, মজুত, বাজারজাত, ক্রয়-বিক্রয় ও বিনিময়ও নিষিদ্ধ থাকবে। গতকাল মঙ্গলবার সচিবালয়ে ইলিশসম্পদ উন্নয়ন-সংক্রান্ত জাতীয় টাস্কফোর্স কমিটির সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ।
নিষেধাজ্ঞার সময়ে মাছ ধরা থেকে বিরত থাকা জেলেদের ভিজিএফ খাদ্য সহায়তা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। মন্ত্রী বলেন, ইলিশের টেকসই উৎপাদন নিশ্চিত করতে মা ইলিশ রক্ষায় কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। বরিশাল, চাঁদপুর, ভোলাসহ প্রধান প্রজনন এলাকাগুলোতে নজরদারি ও অভিযান জোরদার করা হবে। অবৈধভাবে ধরা ইলিশের বাজারজাত বন্ধে বরফকল, আড়ত ও বাজারে নজরদারি বাড়াতে হবে। চাঁদপুর মোহনাসহ ইলিশের প্রজননক্ষেত্রে অবৈধ জাল অপসারণে অভিযান চালানোরও পরামর্শ দেন তিনি।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, ইলিশ উৎপাদন কমে যাওয়ার কারণ গবেষণার মাধ্যমে খুঁজে বের করতে হবে। উৎপাদন কমে যাওয়ায় উল্টো ইলিশ আমদানি করতে হচ্ছে, এটিও উদ্বেগের বিষয়। উৎপাদন বাড়াতে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হবে। সূত্র : দৈনিক সমকাল