ঢাকা ০৬ অক্টোবর, ২০২৬
সংবাদ শিরোনাম
চার দিনের সফরে জাপান যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী ‘পোশাক লাগিয়েছি ঘুষ খাওয়ার জন্যই’ বলা এএসআই প্রত্যাহার শিশুদের বিকাশের সুযোগ দিলে দেশের ভিত্তি মজবুত হবে: প্রধানমন্ত্রী প্রতিটি শিশুর জন্য নিরাপদ ও বৈষম্যহীন পরিবেশ নিশ্চিতের আহ্বান রাষ্ট্রপতির বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম উৎপাদন কেন্দ্র হতে চায়: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শিশু একাডেমির ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী ভারত ক্ষমা না চাওয়ায় লিজেন্ডস টুর্নামেন্ট থেকে সরে দাঁড়াল পাকিস্তান জাতীয় জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন দিবস আজ ভারতভাগের পর প্রথমবার আসাম থেকে ঢাকার আন্তর্জাতিক নৌপথে পণ্য পরিবহন ঘুরে দাঁড়িয়ে ১৪ মিনিটে চার গোল করে জিতল জিদানের ফ্রান্স

রেডিওথেরাপির অপেক্ষায় সাড়ে ৭ হাজার রোগী, সিরিয়াল ঠেকেছে ২০২৮ সালে

#

নিজস্ব প্রতিবেদক

০৬ অক্টোবর, ২০২৬,  11:19 AM

news image

জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল

ব্রেস্ট ক্যান্সার শনাক্ত হওয়ার পর সার্জারি ও কেমোথেরাপি শেষ করে রেডিওথেরাপির অপেক্ষায় নেত্রকোনার আসমা বেগম। রাজধানীর মহাখালীর জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে (এনআইসিআরএইচ) টানা তিন দিন ঘুরেও রেডিওথেরাপির সিরিয়াল পাননি তিনি। কারণ, নতুন রোগীদের জন্য সিরিয়াল দেওয়া গত এক মাস ধরে বন্ধ রেখেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। হাসপাতালের ছয়টি রেডিওথেরাপি মেশিনের চারটিই দুই বছরের বেশি সময় ধরে বিকল। বাকি দুটি মেশিনে তিন শিফটে প্রতিদিন গড়ে ২৫০ রোগীকে থেরাপি দেওয়া হচ্ছে। এরই মধ্যে অপেক্ষমাণ রোগীর সংখ্যা সাত হাজার ছাড়িয়েছে; কারও কারও সিরিয়াল পড়েছে ২০২৮ সালের শেষভাগে।


সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মেশিন দুটি সক্ষমতার চেয়ে বেশি রোগীকে সেবা দিচ্ছে। তিন শিফটে প্রতিদিন গড়ে আড়াইশ রোগী থেরাপি নিচ্ছেন। যারা অনেকদিন পরের সিরিয়াল পেয়েছেন, তারা জানেন না ততদিনে তাদের ক্যান্সারের পরিস্থিতি কেমন দাঁড়াবে। দীর্ঘসূত্রতার কারণে শরীরে ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়া কিংবা পুনরায় ফিরে আসার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ ক্যান্সার রোগীর সার্জারির পর সাধারণত দুই মাসের মধ্যে রেডিওথেরাপি শুরু করতে হয়। এর বেশি দেরি হলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে থেরাপির কার্যকারিতা কমতে থাকে। বাড়ে রোগীর জীবনের ঝুঁকিও।


শুধু রোগী নয়, এনআইসিআরএইচের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মোস্তফা আজিজ সুমনও মনে করেন, দেরিতে সিরিয়াল পাওয়া রোগীরা নির্ধারিত সময়ে থেরাপি নিয়ে যথেষ্ট উপকৃত হতে পারবেন না। রেডিওথেরাপির সিরিয়াল বন্ধের বিষয়ে তিনি বলেন, সিরিয়াল দিয়েও তেমন কোনো লাভ নেই। কারণ নতুন করে রেডিওথেরাপির সিরিয়াল দিলে এসব রোগীকে দুই বছর পর থেরাপি নিতে হবে। এতদিন রোগী থেরাপির অপেক্ষা করলে তাদের স্বাস্থ্যগত অবস্থা খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ মুহূর্তে সাত হাজারের বেশি রোগী অপেক্ষমাণ তালিকায়। রেডিওথেরাপির জন্য নতুন রোগীর সিরিয়াল নেওয়া গত এক মাস বন্ধ রয়েছে।


হাসপাতালে মোট ছয়টি রেডিওথেরাপি মেশিন পরিচালনার ব্যবস্থা থাকলেও কেন নতুন মেশিন কেনা হচ্ছে না—জানতে চাইলে এনআইসিআরএইচের পরিচালক আরও বলেন, একটি রেডিওথেরাপি মেশিন কেনা ও স্থাপন করতে ৩২ থেকে ৩৫ কোটি টাকার প্রয়োজন পড়ে। প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ না থাকায় মেশিন কেনা সম্ভব হচ্ছে না।


হাসপাতালের চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সেখানে রেডিওথেরাপির শিফট শুরু হয় সকাল ৮টা থেকে, যা চলে রাত ১২টা পর্যন্ত। এ সময়ের মধ্যে প্রতিদিন গড়ে আড়াইশ রোগীকে রেডিওথেরাপি দেওয়া হয়। নতুন একটি মেশিন কেনা হয়েছে, যা আগামী জানুয়ারির মধ্যে দেশে আসবে। এ ছাড়া আরও একটি রেডিওথেরাপি মেশিন কেনার জন্য নতুন দরপত্র প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।


ক্যান্সারের সামগ্রিক চিকিৎসা ব্যয়বহুল। অনেক পরিবারের পক্ষেই বেসরকারি হাসপাতালে এ চিকিৎসা নেওয়া সম্ভব হয় না। তাদের অনেকে জাতীয় ক্যান্সার হাসপাতাল বা এনআইসিআরএইচে আসেন। সারা দেশ থেকেই রোগীরা হাসপাতালটিতে চিকিৎসা নিতে আসেন।


সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ক্যান্সারের মতো ব্যয়বহুল চিকিৎসায় মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তদের বড় ভরসার জায়গা জাতীয় ক্যান্সার হাসপাতাল। কিন্তু রোগীর তুলনায় হাসপাতালের রেডিওথেরাপি মেশিন এমনিতেই অপর্যাপ্ত। তার মধ্যে চারটি মেশিন বছরের পর বছর অকেজো পড়ে থাকা দুঃখজনক।


বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী ক্যান্সারে আক্রান্ত অর্ধেকেরও বেশি রোগীর চিকিৎসার কোনো না কোনো পর্যায়ে রেডিওথেরাপির প্রয়োজন হতে পারে। সংস্থাটি রেডিওথেরাপির সুবিধা সম্প্রসারণের পাশাপাশি নিরাপদ ও মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।


এনআইসিআরএইচের চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একজন রোগীর রেডিওথেরাপির কোর্স শেষ করতে সাধারণত চার থেকে আট সপ্তাহ সময় লাগে। এ থেরাপি কার্যক্রম চলার মধ্যেই এতদিন নতুন থেরাপি নিতে আসা রোগীদের সিরিয়াল দেওয়া হচ্ছিল। তবে রোগীর সংখ্যা এত বেশি বেড়ে গেছে যে, বর্তমানে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নতুন রোগীর সিরিয়াল নেওয়া সাময়িকভাবে বন্ধ রেখেছে।


বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে বিশেষায়িত একটি হাসপাতাল দিয়ে ক্যান্সার রোগীদের চিকিৎসাসেবা দেওয়া সম্ভব নয়। সরকারি উদ্যোগে এ ধরনের আরও হাসপাতাল মফস্বল শহরেও গড়ে তুলতে হবে। রাজধানীকেন্দ্রিক ক্যান্সার চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতাও কমাতে হবে। তবে ক্যান্সারের আধুনিক চিকিৎসা নিশ্চিত করতে শুধু যন্ত্র কেনাই যথেষ্ট নয়। রেডিওথেরাপির অবকাঠামোর পাশাপাশি প্রশিক্ষিত রেডিয়েশন অনকোলজিস্ট, মেডিকেল ফিজিসিস্ট ও রেডিয়েশন থেরাপিস্টও তৈরি করতে হবে।


ক্যান্সার রোগীদের জন্য সরকারি চিকিৎসাসেবায় চলমান সংকট নিয়ে জানতে চাইলে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মোস্তাক হোসেন বলেন, ক্যান্সার রোগীদের এ ধরনের ভোগান্তি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। দেশে এখন বিপুলসংখ্যক ক্যান্সার রোগী আছেন, যাদের বেশির ভাগই মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত। এ রোগীদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে সরকারকে দ্রুত বিকল্প ব্যবস্থা নিয়ে ভাবতে হবে। প্রয়োজন হলে যে বেসরকারি হাসপাতালগুলো রেডিওথেরাপি দিচ্ছে, তাদের সঙ্গে যৌথভাবে চিকিৎসাসেবা দেওয়া যেতে পারে। এতে সরকারি ক্যান্সার হাসপাতালগুলোয় চাপ কিছুটা কমবে। সরকারের হয়তো ভর্তুকি দিতে হবে। তবুও ক্যান্সার আক্রান্তদের সেবা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।


বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অধীনস্থ আন্তর্জাতিক ক্যান্সার গবেষণা সংস্থার প্রকল্প গ্লোবক্যান ২০২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ২০২৪ সালে নতুন করে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছেন আনুমানিক ১ লাখ ৮৭ হাজার ২৬৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ৭ হাজার ৮২০ এবং নারী ৭৯ হাজার ৪৪৩ জন। এসব রোগী দেশের সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল এবং অনেকে দেশের বাইরে চিকিৎসা নেন। আক্রান্তদের একটি বড় অংশ চিকিৎসা নেন জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে।


জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, একক বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান হওয়ায় এবং অন্যান্য হাসপাতাল থেকে রোগীর বাড়তি চাপের কারণে জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে দীর্ঘ লাইন তৈরি হয়। সরকার বিশেষ উদ্যোগে আটটি বিভাগীয় পর্যায়ে বিশেষায়িত হাসপাতাল তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে। যার মধ্যে ক্যান্সার, হৃদরোগ ও কিডনি রোগের বিশেষায়িত সেবা দেওয়া হবে। এরই মধ্যে বিভিন্ন বিভাগীয় শহরে অবকাঠামোও তৈরি করা হয়েছে। যেখানে জনবল ও যন্ত্রপাতি ক্রয় প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। এসব বিভাগীয় কেন্দ্র চালু হলে ক্যান্সার হাসপাতালসহ অন্যান্য বিশেষায়িত হাসপাতালের ওপর রোগীর চাপ ক্রমান্বয়ে কমে যাবে।


সূত্র: বণিক বার্তা।

logo

সম্পাদক ও প্রকাশক : মো. নজরুল ইসলাম