অস্ত্রের পাশাপাশি প্রযুক্তিও আছে, ইউক্রেনের ফ্রন্টে নেই পর্যাপ্ত সেনা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
০৮ অক্টোবর, ২০২৬, 11:45 AM
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
০৮ অক্টোবর, ২০২৬, 11:45 AM
অস্ত্রের পাশাপাশি প্রযুক্তিও আছে, ইউক্রেনের ফ্রন্টে নেই পর্যাপ্ত সেনা
ড্রোন যুদ্ধে নতুন কৌশল দেখিয়ে বিশ্বকে চমকে দিয়েছে ইউক্রেন। রাশিয়ার বিরুদ্ধে দূরপাল্লার হামলা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর অস্ত্র এবং উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহারেও দেশটি একের পর এক নতুন সক্ষমতা দেখাচ্ছে। কিন্তু যুদ্ধের পঞ্চম বছরে এসে সেই প্রযুক্তিগত সাফল্যের আড়ালে দেখা দিয়েছে পুরোনো এক সংকট- যুদ্ধ করার মতো পর্যাপ্ত মানুষ নেই।
ইউক্রেনের কিছু ফ্রন্টলাইন ইউনিট অর্ধেক জনবল নিয়ে লড়ছে, ক্লান্ত সৈন্যদের নিয়মিত বিশ্রাম দেওয়া যাচ্ছে না, আর সেনাবাহিনীতে নতুন সদস্য আনার পথও ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাশিয়ার তুলনায় শুরু থেকেই জনবলে পিছিয়ে থাকা ইউক্রেন এখন আরও তীব্র সেনা সংকটে পড়েছে। দীর্ঘ যুদ্ধ, হতাহত, সেনা পলায়ন, বাধ্যতামূলক নিয়োগ এড়িয়ে যাওয়া এবং যুদ্ধের কারণে জনসংখ্যা কমে যাওয়ায় সামনের সারিতে প্রয়োজনীয় সংখ্যক সেনা মোতায়েন করা কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে ড্রোন প্রযুক্তি দিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে সাময়িক সুবিধা তৈরি হলেও সেই সুবিধাকে বড় সামরিক অভিযানে রূপ দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত জনবল নেই।
পূর্ব ইউক্রেনের পোকরভস্ক এলাকায় রাশিয়ার বড় আক্রমণের মুখে থাকা দা ভিঞ্চি উলভস ব্যাটালিয়নের এক উপকম্যান্ডার এপিকে বলেন, বর্তমানে তাদের হাতে থাকা অস্ত্র ও জনবল দিয়ে বিদ্যমান অবস্থান ধরে রাখতেই কষ্ট হচ্ছে। সামনের দিকে এগোতে গেলে আরও বেশি প্রাণহানির ঝুঁকি তৈরি হবে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউক্রেনের প্রায় ১ হাজার ২৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ ফ্রন্টলাইনে সেনা সংকটের প্রভাব স্পষ্ট। পর্যাপ্ত রিজার্ভ না থাকায় এক ইউনিটকে সরিয়ে অন্য জায়গায় পাঠানো কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে কোনো এলাকায় রাশিয়ার ওপর সাময়িক চাপ তৈরি হলেও সেটিকে বড় ধরনের সামরিক সাফল্যে পরিণত করা যাচ্ছে না।
ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা গবেষণা প্রতিষ্ঠান রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষক নিক রেনল্ডসের মতে, সেনা সংকটের কারণে ইউক্রেনীয় বাহিনীকে পর্যাপ্ত সময় পরপর ফ্রন্টলাইন ইউনিট বদলাতে পারছে না। এতে সৈন্যদের ক্লান্তি বাড়ছে, যা আবার হতাহতের হার বাড়িয়ে দিচ্ছে। অর্থাৎ কম জনবল থেকে বেশি হতাহত, আর বেশি হতাহত থেকে আরও বড় জনবল সংকট- এক ধরনের চক্র তৈরি হয়েছে।
ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ও সমস্যাটির গুরুত্ব স্বীকার করছে। মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা এপিকে বলেন, যথেষ্ট মানুষ নেই। সেনাবাহিনীতে পলায়নকারী সদস্যদের আবার ফিরিয়ে আনার বিষয়টিও নতুন নিয়োগ নীতির আলোচনায় রয়েছে।
চলতি বছরের মার্চে তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী মিখাইলো ফেদোরভ জানিয়েছিলেন, প্রায় ২০ লাখ ইউক্রেনীয় পুরুষ সামরিক দায়িত্ব এড়িয়ে যাচ্ছেন এবং প্রায় ২ লাখ সেনা পলায়ন করেছেন বা অনুমতি ছাড়া ইউনিট ছেড়েছেন। সেনাবাহিনী ত্যাগের জন্য সর্বোচ্চ ১২ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। এর আগে জানুয়ারিতেও ফেদোরভ প্রায় ২ লাখ সেনা পলায়ন এবং ২০ লাখ মানুষের নিয়োগ এড়ানোর তথ্য দিয়েছিলেন।
জনবল সংকটের আরেকটি বড় কারণ ইউক্রেনের জনসংখ্যাগত বাস্তবতা। যুদ্ধ, বাস্তুচ্যুতি ও বিদেশে চলে যাওয়ার কারণে সামরিক বয়সী পুরুষের সংখ্যা কমেছে। জাতিসংঘের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ইউক্রেনে ২৫ থেকে ৫৯ বছর বয়সী পুরুষের সংখ্যা প্রায় ৬৮ লাখ। তবে এদের সবাই সামরিক দায়িত্ব পালনের উপযুক্ত নন; অনেকে আহত, অসুস্থ অথবা অন্য কারণে যুদ্ধে যেতে অক্ষম।
ইউক্রেনের সামরিক বাহিনীতে মোট সদস্যসংখ্যা প্রায় ১০ লাখ বলে সরকারি হিসাবে উল্লেখ করা হলেও তাঁদের মাত্র একটি ছোট অংশ সরাসরি ফ্রন্টলাইনে মোতায়েন। ফলে কাগজে সেনাবাহিনীর আকার বড় হলেও বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রে কার্যকর জনবল অনেক কম।
এই সংকটের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে পদাতিক বাহিনীতে। রাশিয়ার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের লড়াইয়ে পদাতিক সেনাদের ফ্রন্টলাইনে দীর্ঘ সময় থাকতে হচ্ছে। কোনো কোনো সৈন্য প্রায় এক বছর পর্যন্ত পর্যাপ্ত রোটেশন ছাড়াই সামনের সারিতে দায়িত্ব পালন করছেন। একটি ইউনিটের উপকম্যান্ডারের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর ইউনিট বর্তমানে অনুমোদিত শক্তির প্রায় অর্ধেক নিয়ে কাজ করছে, অথচ তাদের দায়িত্বের এলাকা আগের তুলনায় দ্বিগুণ হয়েছে।
শুধু সাধারণ সৈন্য নয়, দক্ষ সামরিক কর্মীরও ঘাটতি রয়েছে। আধুনিক যুদ্ধে ড্রোন, ইলেকট্রনিক যুদ্ধব্যবস্থা, নজরদারি প্রযুক্তি ও অন্যান্য অত্যাধুনিক সরঞ্জামের ব্যবহার বাড়লেও সেগুলো পরিচালনার মতো প্রশিক্ষিত জনবল পাওয়া কঠিন হয়ে উঠেছে। ফলে ইউক্রেনের যুদ্ধ এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে অস্ত্র ও প্রযুক্তি যতটা গুরুত্বপূর্ণ, দক্ষ মানুষও ততটাই গুরুত্বপূর্ণ।
এই পরিস্থিতি সামাল দিতে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সেনা নিয়োগ, প্রশিক্ষণ, সামরিক চুক্তি এবং ইউনিট কাঠামোয় পরিবর্তন আনার চেষ্টা করছে। সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ফেদোরভ শক্তিশালী ইউনিটগুলোকে আরও শক্তিশালী করে দুর্বল ইউনিট পুনর্গঠনের পরিকল্পনা করেছিলেন। নতুন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়েভহেনি খমারা সেই সংস্কার অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছেন। তবে এসব পরিবর্তনের সুফল পেতে সময় লাগবে।
তারপরও ইউক্রেন কিছু এলাকায় সীমিত পাল্টা অভিযান চালাতে পারছে। চলতি বছর রুশ বাহিনী প্রায় ৯৯০ বর্গকিলোমিটার ইউক্রেনীয় ভূখণ্ড দখল করেছে বলে ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির উদ্ধৃতি দিয়ে এপি জানিয়েছে। একই সময়ে ইউক্রেনীয় বাহিনী প্রায় ৮২০ বর্গকিলোমিটার এলাকা পুনর্দখল করেছে। তবে সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এসব স্থানীয় সাফল্য এখনো যুদ্ধের সামগ্রিক ভারসাম্য বদলে দেওয়ার মতো নয়।
রাশিয়াও অবশ্য জনবল সংকটের বাইরে নয়। ২০২২ সালে ৩ লাখ রিজার্ভ সেনাকে আংশিকভাবে মোতায়েন করার পর ব্যাপক সমালোচনা ও দেশত্যাগের মুখে ক্রেমলিন এখন তুলনামূলক বেশি বেতন ও সুবিধার মাধ্যমে স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগের ওপর নির্ভর করছে। প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের হিসাবে, ইউক্রেনে রাশিয়ার হয়ে প্রায় ৭ লাখ সেনা লড়ছে।
তবে ইউক্রেনের জন্য সংকটটি শুধু কতজন সেনা আছে, সেই হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দীর্ঘ যুদ্ধের ক্লান্তি, পর্যাপ্ত রোটেশনের অভাব, হতাহত এবং অনিশ্চিত মেয়াদের সামরিক দায়িত্ব নতুন নিয়োগপ্রার্থীদেরও নিরুৎসাহিত করছে। ড্রোন হয়তো একজন সেনার জায়গা কিছুটা পূরণ করতে পারে, কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্র দখল করে ধরে রাখতে পারে না।
চার বছরের বেশি সময়ের যুদ্ধ তাই ইউক্রেনের সামনে এক কঠিন বাস্তবতা দাঁড় করিয়েছে। প্রযুক্তিতে যতই এগিয়ে যাওয়া যাক, যুদ্ধের শেষ পর্যন্ত লড়াই করতে মানুষই লাগে। ড্রোন রাশিয়ার অবস্থানে আঘাত করতে পারে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা লক্ষ্য শনাক্ত করতে পারে, কিন্তু ক্লান্ত সৈন্যকে বিশ্রাম দেওয়া, হারানো অবস্থান পুনর্দখল করা এবং দীর্ঘ ফ্রন্টলাইন ধরে রাখা যায় না শুধু প্রযুক্তি দিয়ে। ইউক্রেনের জন্য এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তাই নতুন কোনো অস্ত্র পাওয়া নয়; বরং এই দীর্ঘ যুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার মতো পর্যাপ্ত মানুষ কোথা থেকে আসবে। তথ্য সূত্র- এপি নিউজ।