NL24 News
২৯ এপ্রিল, ২০২৬, 11:17 AM
হাদিসের আলোকে: মানসিক প্রশান্তি লাভের চার উপাদান
প্রত্যেক মানুষের জীবনে মানসিক শান্তি খুব গুরুত্বপূর্ণ, যা অনেকাংশে নির্ভর করে তার পারিপার্শ্বিক কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর। প্রত্যেকের জীবনে এমন কিছু উপাদান রয়েছে, যেগুলো সঠিক ও সুন্দর হলে জীবন কিছুটা স্বস্তির ও সুখময় হয়; আর এগুলোতে ত্রুটি থাকলে নেমে আসে অশান্তি, দুশ্চিন্তা ও কষ্ট। হাদিস শরিফে এমন কিছু জিনিসকে চিহ্নিত করা হয়েছে, যেগুলো ভালো হলে মানুষের জীবন যেমন অনেক ক্ষেত্রে শান্তিময় হয়, আর তা না হলে জীবন দুঃখ-কষ্টময় হয়। তাই তো হাদিসের ভাষায় এগুলোকে সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্যের অন্যতম মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
হাদিস শরিফে ইরশাদ হয়েছে, সাআদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘চারটি জিনিস সৌভাগ্যের অন্তর্ভুক্ত—নেককার স্ত্রী, প্রশস্ত বাসস্থান, সৎ প্রতিবেশী এবং আরামদায়ক বাহন। আর চারটি জিনিস দুর্ভাগ্যের অন্তর্ভুক্ত—খারাপ প্রতিবেশী, বদকার স্ত্রী, খারাপ বাহন এবং সংকীর্ণ বাসস্থান।’ (সিলসিলাতুস সহিহাহ, পৃষ্ঠা-২৮২, সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস : ৪০৩২)
এই হাদিসে মানুষের জীবনে সুখ-দুঃখের কিছু মৌলিক উপকরণ অত্যন্ত সুন্দরভাবে তুলে ধরা হয়েছে। মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত এই বিষয়গুলোই তার মানসিক প্রশান্তি, স্বস্তি ও স্থিতিশীলতার ওপর গভীর প্রভাব ফেলে।
হাদিসটিকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়; এক. মহানবী (সা.) ‘চারটি জিনিসকে সৌভাগ্যের’ বলেছেন, আবার ঠিক এই চারটি জিনিস যদি প্রতিকূলে হয়, তবে তাকে দুর্ভাগ্যের আখ্যা দিয়েছেন। নিম্নে এগুলো সম্পর্কে আরো ব্যাখ্যা দেওয়া হলো—
১. নেক স্ত্রী : যিনি দ্বিনদার, যাকে দেখে স্বামী আনন্দ পায়, তিনি স্বামীর আনুগত্য করেন, স্বামীর অনুপস্থিতিতে নিজের পবিত্রতা রক্ষা করেন এবং স্বামীর সম্পদের হেফাজত করেন। এটাই একজন সৎ নারীর মূল বৈশিষ্ট্য। স্ত্রী যদি নেক হয়, তবে তা দুনিয়ায় মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় নিয়ামতগুলোর একটি।
হাদিস শরিফে এসেছে, আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) সূত্রে বর্ণিত যে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, দুনিয়া উপভোগের উপকরণ (ভোগ্যপণ্য) এবং দুনিয়ার উত্তম উপভোগ্য উপকরণ পুণ্যবতী নারী। (মুসলিম, হাদিস : ৩৫১২)
নেককার নারী কেমন, তার ইঙ্গিত হাদিসে পাওয়া যায়। আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে নারী পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করে, তার গুপ্তাঙ্গ হেফাজত (সতীত্ব রক্ষা) করে এবং তার স্বামীর আনুগত্য করে, সে জান্নাতের যেকোনো দরজা দিয়ে ইচ্ছা প্রবেশ করবে। (সহিহ ইবনে হিব্বান)
কিন্তু স্ত্রী যদি স্বামীর অবাধ্য হয়, অশ্লীল ভাষী ও ঝগড়াটে হয়, দাম্পত্য ও পারিবারিক জীবনে যদি সৎ না হয়, তাহলে সেই ব্যক্তির পরিবারটা জাহান্নামের টুকরায় পরিণত হয়।
২. প্রশস্ত বাসস্থান : মানুষের জীবনে বাসস্থানও মহান আল্লাহর অন্যতম নিয়ামত। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘তিনি তোমাদের গৃহকে তোমাদের জন্য আবাসস্থল বানিয়েছেন।’ (সুরা : নাহল, আয়াত : ৮০)
প্রত্যেক মানুষের মৌলিক চাহিদার অন্যতম প্রধান হলো বাসস্থান, যা প্রকৃতির বিরূপ প্রভাব তথা রোদ, বৃষ্টি, ঝড় থেকে সুরক্ষা দেয়। জীবনের নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার একটি মাধ্যম। সুস্থ পরিবার গঠন, সামাজিক স্থিতি এবং শারীরিক ও মানসিক শান্তির জন্য একটি অপরিহার্য স্থান হলো বাসস্থান। তাই মহান আল্লাহ যদি কাউকে তাদের পরিবার-পরিজন নিয়ে নিরাপদে থাকার জন্য যথেষ্ট একটি বাসস্থানের ব্যবস্থা করে দেন, তাহলে একেও একটি সৌভাগ্য হিসেবে বিবেচনা করা যায়। আর যদি এর বিপরীত হয়, বাসস্থান সংকীর্ণ ও অনিরাপদ হয়, ভেজালযুক্ত হয় (মামলা-মোকদ্দমা চলছে এমন) তাহলে তা মানুষকে সব সময় দুশ্চিন্তায় রাখে। এ জন্য মহানবী (সা.) তাঁর উম্মতদের যে দোয়াগুলো শিখিয়েছেন, তার মধ্যে অন্যতম দোয়া হলো, প্রশস্ত বাসস্থানের দোয়া। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত যে এক ব্যক্তি এসে বলল, ইয়া রাসুলুল্লাহ! আপনার রাতের দোয়া আমি শুনেছি। এ থেকে যেসব শব্দ আমার কাছে এসে পৌঁছেছে, তাতে ছিল যে আপনি বলেছিলেন, ‘আল্লাহুম্মাগফিরলি জাম্বি, ওয়া ওয়াস সি লি ফি দা-রি, ওয়া বারিক লি ফি-মা রজাকতানি।’ অর্থ : ‘হে আল্লাহ! মাফ করে দাও আমার গুনাহ, প্রশস্ত করে দাও আমার ঘর, বরকত দাও আমাকে যে রিজিক দিয়েছ তাতে।’ তিনি বললেন, এতে কি কিছু ছুটেছে বলে দেখতে পাচ্ছো? (তিরমিজি, হাদিস : ৩৫০০)
৩. সৎ প্রতিবেশী : ইসলামের দৃষ্টিতে সৎ প্রতিবেশীও সৌভাগ্যের লক্ষণ। যে প্রতিবেশী প্রকাশ্যে কিংবা গোপনে কষ্ট দেয় না, ক্ষতি করার চেষ্টা করে না, বরং উপকার করে এবং প্রতিবেশীর হক আদায় করে। ষড়যন্ত্রকারীদের সহযোগী হয় না। মহানবী (সা.) অসৎ প্রতিবেশীর ব্যাপারে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তোমরা স্থায়ী প্রতিবেশীর অনিষ্ট থেকে আল্লাহ তাআলার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করবে। কেননা গ্রাম্য প্রতিবেশী তো তোমার নিকট থেকে কোনো এক সময় চলে যাবে।’ (নাসায়ি, হাদিস : ৫৫০২)
৪. আরামদায়ক বাহন : মানুষের দৈনন্দিন জীবনে বাহনও খুবই গুরুত্বপূর্ণ সঙ্গী। আগের যুগে নির্দিষ্ট কিছু পশু মানুষের বাহন হিসেবে ব্যবহৃত হতো। বর্তমানে উন্নত প্রযুক্তির বহু বাহন আছে। পশু হোক কিংবা যন্ত্র, বাহনে ত্রুটি থাকলে তা মানুষের জীবনযাত্রা কষ্টের করে দেয়। আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। বিভিন্ন রকম বিড়ম্বনায় ফেলে। কখনো কখনো জীবনও হুমকিতে ফেলে দিতে পারে। তাই মহানবী (সা.) আরামদায়ক ও নিরাপদ বাহনকে সৌভাগ্যের প্রতীক হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।
অতএব, জিনিসগুলো নির্বাচনের ক্ষেত্রে মানুষের সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। ভালোভাবে খোঁজখবর নিয়ে, বুঝেশুনে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।