নিজস্ব প্রতিবেদক
২৮ জানুয়ারি, ২০২৬, 11:53 AM
সরকারি চাকুরেরা কোনো পক্ষ নিতে পারবেন না
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে গণভোটে সরকারি কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী কোনো পক্ষ নিতে পারবেন না। তাঁরা যদি ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’-এর পক্ষে প্রচার চালান সেটি হবে দণ্ডনীয় অপরাধ। গতকাল মঙ্গলবার দুজন নির্বাচন কমিশনার গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ-১৯৭২ এবং গণভোট অধ্যাদেশের সংশ্লিষ্ট অনুচ্ছেদ ও ধারা উল্লেখ করে জানিয়েছেন, শুধু ভোট গ্রহণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাই নন, তাঁরা ছাড়াও যেসব সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী গণভোটকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করবেন তাঁদের দণ্ডনীয় অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হতে হবে।
সরকারি চাকুরেরা কোনো পক্ষ নিতে পারবেন নানির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ গতকাল সন্ধ্যায় বলেন, ‘আইন অনুসারে আমি জোর দিয়ে বলছি, গণভোটের প্রচারে কী কী প্রস্তাব রয়েছে সেসব উল্লেখ করাতে কোনো সমস্যা নেই।
খোদ নির্বাচন কমিশনও এটা করছে। কিভাবে কী ধরনের ব্যালটে ভোট দিতে হবে—এগুলো নির্বাচন কমিশন প্রচার করছে। গণভোট সম্পর্কে অ্যাওয়ারনেস বিল্ডিংয়ের জন্য এটা করা হচ্ছে। কিন্তু রিটার্নিং, সহকারী রিটার্নিং অফিসার, প্রিজাইডিং ও পোলিং অফিসাররা তো বটেই, কোনো সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ‘হ্যাঁ’ পক্ষে দেন বা বিপক্ষে ‘না’ ভোট দেন এটা বলতে পারবেন না। এটা একেবারেই নিষেধ।
তিনি বলেন, “আপনারা হয়তো প্রশ্ন করবেন, উপদেষ্টা মহোদয়রা তো ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার করছেন। আমি বলব, উপদেষ্টা মহোদয়রা সরকারি চাকুরে নন। তাঁরা পাবলিক সার্ভেন্ট। গভর্নমেন্ট সার্ভেন্ট বা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী নন। কাজেই উপদেষ্টারা গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে বলতে পারবেন। উনারা নিজেরাই জাতির জন্য অনেক টাকা-পয়সা খরচ করে এ বিষয়ে একটা উদ্যোগ নিয়েছেন। সে কারণে উপদেষ্টাদের ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার চালাবেন—এটাই বাস্তবতা। কিন্তু সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তা পারবেন না। শুধু না পারার বিষয় না, গণভোটের হ্যাঁ-না-এর পক্ষে বা বিপক্ষে বলাটা তাঁদের জন্য দণ্ডনীয় অপরাধ।”
এই বিষয়ে কি নির্বাচন কমিশন থেকে কোনো নির্দেশনা জারি করা হয়েছে—এ প্রশ্নে আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, ‘একটু আগেই আমরা (নির্বাচন কমিশন) আলাপ-আলোচনা করেছি। পরিপত্র জারি করতেও পারি। তবে নানাভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জানিয়ে দিচ্ছি। কয়েক দিন আগে আমি চট্টগ্রামে গিয়েছিলাম। সেখানকার জেলা প্রশাসককে আইনের বিষয়টি জানিয়েছি। আপনাদের (গণমাধ্যম) এসব কথা বলার উদ্দেশ্য হচ্ছে, আপনারাও এ বিষয়ে বিধি-নিষেধগুলো প্রচার করেন। আমরা পরিপত্র জারি না করলেও এই আইন তো বলবৎ রয়েছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ-১৯৭২ (আরপিও) এর ৮৬ অনুচ্ছেদে এবং গণভোট অধ্যাদেশের (অপরাধ, দণ্ড ও বিচার পদ্ধতি) ২১ ধারায় এ বিষয়ে স্পষ্টভাবে বলা আছে যে, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যদি নির্বাচনের ফল প্রভাবিত করার চেষ্টা করেন তাহলে এটা শুধু অপরাধই নয়, দণ্ডনীয় অপরাধ।’
উল্লেখ্য, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ-১৯৭২ (আরপিও) এর ৮৬ অনুচ্ছেদে বলা আছে, ‘যদি প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিত কোনো ব্যক্তি কোনোভাবে নির্বাচনের ফলাফলকে প্রভাবিত করিবার উদ্দেশে তাঁর সরকারি পদমর্যাদার অপব্যবহার করেন, তাহা হইলে তিনি (অনধিক পাঁচ বৎসর এবং অন্যূন এক বৎসরের কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডে দণ্ডিত) দণ্ডনীয় কোনো অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হইবেন।’
আর গণভোট অধ্যাদেশের (অপরাধ, দণ্ড ও বিচার পদ্ধতি) ২১ ধরায় বলা হয়েছে, ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২ ও সংশ্লিষ্ট বিধিবিধান মোতাবেক যেসব কার্য অপরাধ ও নির্বাচনী আচরণবিধির লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য, একই ধরনের কার্য গণভোটের ক্ষেত্রেও যতদূর প্রযোজ্য, অপরাধ ও আচরণবিধির লঙ্ঘন বলে গণ্য হইবে, এবং এরূপ ক্ষেত্রে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২ ও সংশ্লিষ্ট বিধিবিধান প্রয়োগ করিয়া এখতিয়ার সম্পন্ন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক উক্ত অপরাধের বিচার এবং আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাইবে।’
আরেকজন নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার গতকাল নির্বাচন ভবনে তাঁর কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করা কর্মকর্তারা গণভোটের প্রচার করতে পারবেন। তবে তাঁরা ‘হ্যাঁ’-‘না’ এর পক্ষে কিংবা বিপক্ষে প্রচার করতে পারবেন না। গণভোটের বিষয়ে কমিশনের অবস্থান কী—এমন প্রশ্নে মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, ‘আমাদের বক্তব্য হচ্ছে, গণভোটের জন্য আমরা ভোটারদের ভোট দিতে উদ্বুদ্ধ করছি। নির্বাচনী কাজের দায়িত্বে যাঁরা থাকবেন, তাঁরা আইনগতভাবে এ বিষয়ে কোনো পক্ষে কাজ করবেন না। নির্বাচনী দায়িত্বে রিটার্নিং অফিসার, সহকারী রিটার্নিং অফিসার এবং অন্যান্য যাঁরা নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করবেন তাঁরা গণভোটের প্রচার করতে পারবেন, কিন্তু পক্ষে-বিপক্ষে প্রচার চালানো যাবে না। রিটার্নিং অফিসার যখনই তিনি হয়েছেন, তখনই তিনি কোনো পক্ষের লোক না। কোনো রিটার্নিং অফিসার, সহকারী রিটার্নিং অফিসার গণভোটের কোনো পক্ষে প্রচার চালাচ্ছেন না বলেই জানি।’
সরকার এবং সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা গণভোটের ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে অবস্থানে প্রচারণা করছেন। এটা কতটা আইনসংগত—এ প্রশ্নে এই নির্বাচন কমিশনার বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি মন্তব্য করতে চাচ্ছি না। তবে কমিশন একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করছে।’
এদিকে নির্বাচন কমিশনের এই অবস্থানের বিপরীতে বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দিয়ে গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে প্রচার-প্রচারণা চলমান। সরকারি ভবনগুলোতে শোভা পাচ্ছে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে বিলবোর্ড, ব্যানার ফেস্টুন। উপদেষ্টা পরিষদের পক্ষে এমন দাবিও রয়েছে যে, গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে প্রচার চালাতে সরকারি কর্মকর্তাদের সামনে কোনো আইনগত বাধা নেই। বিদ্যমান সংবিধান, আরপিও, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫ কিংবা এই গণভোট সংক্রান্ত অধ্যাদেশের কোথাও বলা নেই যে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা ইতিবাচক পরিবর্তনের পক্ষে কথা বলতে পারবেন না। প্রচারণায় আইনগত বাধা আছে এমন কোনো রেফারেন্স কেউ দেখাতে পারবে না। ১৯৭২ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ৪৮টি গণভোট হয়েছে, তার বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সরকার গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছে। সুতরাং আন্তর্জাতিকভাবে এটা গ্রহণযোগ্য ব্যবস্থা, নৈতিকভাবে এটা আমাদের কর্তব্য ও দায়িত্ব। যারা এ বিষয়ে বাধা আছে বলে প্রচার করছে, তারা ভিন্ন উদ্দেশ্য নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। গত ২৪ জানুয়ারি প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী এবং গণভোট বিষয়ক প্রচার কার্যক্রমের মুখ্য সমন্বয়ক অধ্যাপক আলী রীয়াজ সিলেটের বিভাগীয় মতবিনিময়সভায় এসব কথা বলেন।
বিশেষজ্ঞ বক্তব্য : এ বিষয়ে সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও সুপ্রীম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক গতকাল এ প্রতিবেদককে বলেন, বিদ্যমান আইন অনসুারে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টারও গণভোটে ‘হ্যা’ এর পক্ষে প্রচার চালাতে পারেন বলে মনে হয় না। কারণ তারাও তো প্রজাতন্ত্রের বাইরের কেউ না। সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারির জন্য যে বিধি-নিষেধ প্রযোজ্য, মন্ত্রী, উপমন্ত্রী পর্যায়ের উপদেষ্টাদের জন্যও একই বিধান প্রয়োজ্য। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে তাঁরা যে প্রচার চালাচ্ছেন, সরকারি প্রতিষ্ঠান ও সরকারি কর্মকর্তা- কর্মচারিদের দিয়ে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে যেভাবে প্রচার চলছে তা সংশ্লিষ্ট আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ও নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের অন্যতম সদস্য বেগম জেসমিন টুলি বলেন, ‘আমি আগেই বলেছিলাম, গণভোটের আইন করতে হলে, এর পক্ষে কিভাবে প্রচার চালাতে হবে, না হবে, সেটি আইনেই স্পষ্ট করে দিতে হতো। কিন্তু তা না করে এটি সংসদ নির্বাচনের আইনের সঙ্গে এক করে দেওয়া হয়েছে। এই অবস্থায় বিদ্যমান আইন অনুসারে কোনো সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী গণভোটের কোনো পক্ষেই প্রচার চালাতে পারবেন না। নির্বাচন কমিশনের উচিত ছিল আইনের এই বাধ্যবাধকতা আগেই সবাইকে জানিয়ে দেওয়া।
চারটি বিষয়ে গণভোট, এক উত্তর ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ : গণভোট অনুষ্ঠিত হবে চারটি বিষয়ে। এই চারটি বিষয়ের ওপর একটিমাত্র প্রশ্নে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দিয়ে জনগণকে মতামত জানাতে হবে।
বিষয়গুলো হচ্ছে—ক. নির্বাচনের সময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে গঠন করা হবে। খ. আগামী সংসদ হবে দুই কক্ষবিশিষ্ট। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ সদস্যবিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হবে এবং সংবিধান সংশোধন করতে হলে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন দরকার হবে। গ. সংসদে নারী প্রতিনিধি বৃদ্ধি, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিতকরণ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও স্থানীয় সরকারসহ বিভিন্ন বিষয়ে যে ৩০টি প্রস্তাবে জুলাই জাতীয় সনদে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়নে আগামী নির্বাচনে বিজয়ী দলগুলো বাধ্য থাকবে। ঘ. জুলাই সনদে বর্ণিত অন্যান্য সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাস্তবায়ন করা হবে। গণভোটের দিন এই চারটি বিষয়ের ওপর একটিমাত্র প্রশ্নে গোপন ব্যালটের মাধ্যমে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দিয়ে মতামত জানাতে হবে। সূত্র : কালের কণ্ঠ।