ঢাকা ২৭ এপ্রিল, ২০২৬
সংবাদ শিরোনাম
রাজধানীর শতকরা নব্বই শতাংশ স্ট্রিট ফুডই অনিরাপদ দেশের ৮ বিমানবন্দরে সর্বোচ্চ সতর্কতা হাম উপসর্গ নিয়ে আরও ৫ শিশুর মৃত্যু টঙ্গীতে বাবা-ছেলে খুনের ঘটনায় নতুন মোড়, বেরিয়ে এলো চাঞ্চল্যকর তথ্য এনসিপির মনিরা শারমিনের মনোনয়ন বাতিল বহাল ড. ইউনূসের ‘অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি’র মর্যাদা ৬ মাস কমাল সরকার ৭ বিভাগে কালবৈশাখী ঝড়ের শঙ্কা ঢাকার যে ১১ ফিলিং স্টেশনে ফুয়েল পাশ বাধ্যতামূলক হাম আক্রান্ত শিশুদের দ্রুত ভ্যাকসিন দেওয়ার নির্দেশ হাইকোর্টের পঞ্চাশ বছর পর পাশপাশি বাবা-ছেলের নামফলক

রাজধানীর শতকরা নব্বই শতাংশ স্ট্রিট ফুডই অনিরাপদ

#

২৭ এপ্রিল, ২০২৬,  4:42 PM

news image

ছবিটি গুলিস্তান গোলাপ শাহ'র মাজার থেকে তোলা -ছবি : আশরাফুল হক


এক প্লেট চটপটিতে রয়েছে ৭ কোটির বেশি ই-কোলাই ব্যাকটেরিয়া, যা মূলত: মানুষের মলমূত্র থেকে ছড়ায়

মো. জাহিদুর রহমান: মানহীন ও অনিরাপদ খাদ্য গ্রহণ স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে ফেলছে নগর মহানগরগুলোর বেশীরভাগ মানুষের।  নভেম্বর-এর ২০২৫ সালের জাতিসংঘের ওয়ার্ল্ড আরবানাইজেশন প্রস্পেক্টস অনুযায়ী, ঢাকা মহানগরীর বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় ৩ কোটি ৬৬ লাখ। এটি বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ার দ্বিতীয় এবং বিশ্বের অন্যতম জনবহুল মেগাসিটি, যার জনসংখ্যা দ্রুত বেড়ে চলেছে এবং ২০৫০ সাল নাগাদ বিশ্বের শীর্ষ জনবহুল শহর হওয়ার পূর্বাভাস রয়েছে। এই শহরের মোট জনসংখ্যার শতকরা ৩৫ ভাগ বস্তিতে বসবাস করে। ৫০ হাজারের বেশি লোক রাস্তা ও ফুটপাতে ঘুমায়। বস্তিবাসী ও নিন্ম আয়ের লোকদের জন্য স্বাস্থ্য সুরক্ষার কোন ব্যবস্থা নেই। নেই পানি ও জলের ব্যবস্থা। এমনকি নেই পর্যাপ্ত টয়লেট ও গোসলখানা।

এরা মাসের পর মাস রাস্তায় গড়ে ওঠা অনিরাপদ স্ট্রিট হোটেলের খাবার খায়। যেসব খাদ্যের নেই কোন মান নেই নিরাপদ খাদ্যের নিশ্চয়তা। এসব স্ট্রিটে খাবার পানি বলতে ওয়াসার লাইন থেকে তুলে আনা নোংরা ও জীবাণু যুক্ত পানি। যা পান করে নগরীর মানুষগুলো প্রচন্ড স্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যে দিনাতিপাত করছে।  অপরিকল্পিত নগরায়নের ফলে দিন দিন ঘিঞ্জি হয়ে উঠছে, বাড়ছে তাপমাত্রা। তাই গরম আর যানজটের ক্লান্তিতে পথের ধারের শরবত, ফুচকা বা চটপটি অনেকের কাছেই স্বস্তির খাবার। তবে এই আকর্ষণীয় খাবারের আড়ালেই লুকিয়ে আছে ভয়ংকর স্বাস্থ্যঝুঁকি। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখাগিয়েছে, এক প্লেট চটপটিতেই রয়েছে ৭ কোটির বেশি ই-কোলাই ব্যাকটেরিয়া, যা মূলত মানব মলমূত্র থেকে ছড়ায়। বিভিন্ন সমীক্ষা দেখা গিয়েছে, রাজধানীর প্রায় ৯০ শতাংশ স্ট্রিট ফুডই অনিরাপদ।

রাজধানীর সদরঘাট, গুলিস্তান, মতিঝিল,পল্টন, মিরপুর, গাবতলী, ফার্মগেট, সায়দাবাদ, যাত্রাবাড়ী, খিলগাঁও, পুরান ঢাকাসহ বিভিন্ন বাস ও রেলওয়ে স্টেশন এলাকায় ফুটপাতের খাবারের দোকানগুলোতে স্বাস্থ্যবিধির চরম অবহেলা চোখে পড়ে। ময়লা পানিতে প্লেট ধোয়া, খোলা খাবারে ধুলা-ধোঁয়ার সংস্পর্শ, বিক্রেতার অস্বাস্থ্যকর হাত সব মিলিয়ে খাবার হয়ে উঠছে জীবাণুর আঁতুড়ঘর। অনেক ক্ষেত্রে একই তেল বারবার ব্যবহার করে ভাজা হচ্ছে খাবার, যা ট্রান্সফ্যাটে পরিণত হয়। শরবত বা আখের রসে ব্যবহৃত বরফের বড় অংশই আসে মাছ সংরক্ষণের কারখানা থেকে, যা মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর।

নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ রাজধানীর ৩৭টি স্থান থেকে সংগ্রহ করা ৪৫০টি নমুনা পরীক্ষা করে চটপটি, ছোলা-মুড়ি, স্যান্ডউইচ, আখের রসসহ বিভিন্ন খাবারে ই-কোলাই, সালমোনেলা ও ভিব্রিও জীবাণুর উপস্থিতি পেয়েছে। চটপটিতেই জীবাণুর মাত্রা সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে। প্রতি প্লেট চটপটিতেই মিলেছে ৭ কোটি ২০ লাখ ই-কোলাই, ৭৫০ সালমোনেলা ও ৭৫০ ভিব্রিও ব্যাকটেরিয়া। অন্যান্য খাদ্যে একই জীবাণু বিভিন্ন মাত্রায় পাওয়া গেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব জীবাণু ডায়রিয়া, পেটের রোগসহ দীর্ঘমেয়াদি জটিল অসুস্থতার কারণ হতে পারে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, অস্বাস্থ্যকর খাবার এখন নীরব ঘাতকে পরিণত হয়েছে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও বড় হুমকি।তাদের মতে, আইন থাকলেও তার প্রয়োগ দুর্বল। নিয়মিত তদারকি ও কঠোর শাস্তি ছাড়া এই পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব নয়। সচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ থাকলেও নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।

গবেষক মো. লোকমান হেকিমের একটি সাক্ষাৎলগকারে  বলেন, ই-কোলাই মানুষের মলে থাকা একটি জীবাণু। ঢাকা শহরে খাওয়ার পানির প্রধান উৎস ওয়াসা। শহরের পানির পাইপ ও পয়ঃনিষ্কাশনের লাইন বহু জায়গায় একাকার হয়ে গেছে। রাসায়নিক ব্যবহার করেও একে পূর্ণমাত্রায় বিশুদ্ধ করা যায় না। কিন্তু ফুটপাতের বিক্রেতারা সরাসরি এ পানি ব্যবহার করছেন। ফলে খাদ্যের পাত্র জীবাণুমুক্ত রাখার নিয়ম তারা জানেন না। প্লেট, গামছা, এমনকি তাদের হাতও পরিষ্কার থাকে না। এ কারণে মলের জীবাণুসহ আরও বিভিন্ন ক্ষতিকারক জীবাণু মানুষের পেটে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের (বিএআরসি) ২০১৯ সালের এক গবেষণায় দেখা যায়, রাজধানীর রাস্তার খাবারে বিপজ্জনক মাত্রায় টোটাল কলিফর্মস ও ই-কোলাই ব্যাকটেরিয়া রয়েছে। এই ব্যাকটেরিয়া মূলত প্রাণীদের মলমূত্রে থাকে। ঢাকার পথে বিক্রি হওয়া ঝালমুড়ি, পানিপুরি, ভেলপুরি, চটপটি, নুডলস, ফলের রস, তেঁতুল-কাঁচাকলা-জলপাই-ধনেপাতা ও মসলা দিয়ে তৈরি মিশ্র ফলের ভর্তা, কতবেল ভর্তা ও জলপাই ভর্তা পরীক্ষা করে এই ফলাফল পায় সংস্থাটি।জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. শামীম আহমেদ বলেন, ভেজাল ও অস্বাস্থ্যকর খাবার এখন নীরব ঘাতকে পরিণত হয়েছে। সবকিছু চোখের সামনেই হচ্ছে। অথচ প্রতিকার নেই। কঠোর শাস্তির অভাবে অস্বাস্থ্যকর খাবার ও ভেজাল রোধ করা যাচ্ছে না। এভাবে চলতে থাকলে দেশের জনস্বাস্থ্য এক সময় বিপন্ন হয়ে পড়বে।

কিন্তু এ ব্যাপারে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ নামক একটি প্রতিষ্ঠান থাকলেও তা যেন কাগুজে কলমে। আরও রয়েছে ভাক্তা-অধিকার ও সংরক্ষণ অধিদপ্তর। ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ মাঝে মাঝে দেশের বাজার ব্যবস্থার অনিয়ম, হোটেল-রেস্তোরার পরিবেশ ও দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে কাজ করলেও। স্ট্রিটে গড়ে ওঠা এইসব টংদোকান ও হোটেল নিয়ে কোন রকম পদক্ষেপ কিংবা অভিযান পরিচালনা করছেনা। প্রশ্ন হলো সু-স্বাস্থ্য বলতে কি উচ্চশ্রেণি ও মধ্যম শ্রেণির স্বাস্থ্য রক্ষা বুঝায়। নিন্মবিত্তের মানুষগুলো কি এসবের মধ্যে পড়েনা? ঢাকা  মহনগরীর এমন করুনদশা দেখার কেউ কি নেই? নেই কোন তদারকি যে যার ইচ্ছেমতো স্ট্রিটে বিভিন্ন মুখরোচক খাবারের পসরা সাজিয়ে বসে থাকে ক্ষুধার্ত মানুষগুলো তা অবলীলায় খেয়ে যাচ্ছে। ফলে একদিকে যেমন বাড়ছে স্বাস্থ ঝুঁকি অন্য দিকে বিভিন্ন রোগ-ব্যাধি বাসা বাধছে। এ থেকে উত্তরণের কোন কি উপায় নেই। যথাযথ কর্তৃপক্ষ কি কোনই খেয়াল রাখবেন না? নাকি জীবন বাঁচানোর তাগিদে আয় রোজগার করতে এসে লোকগুলো একএকটি রোগের কারখানা নিয়ে বাঁচবে? দিন গুনতে থাকবে কখন পরপারের ডাক আসবে এই ভরসায়। তাই সরকার তথা প্রশাসনের এ ব্যাপারে সজাগ দৃষ্টি কামনা করছি।

logo

সম্পাদক ও প্রকাশক : মো. নজরুল ইসলাম