নিজস্ব প্রতিবেদক
২১ জানুয়ারি, ২০২৬, 11:13 AM
মাদক পাচার রোধে সীমান্তের ৩২ জেলায় রেড অ্যালার্ট
জাতীয় সংসদ নির্বাচন এলেই মাদকের চাহিদা বেড়ে যায়। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখেও সারাদেশে বিভিন্ন ধরনের মাদকের বাজার রমরমা হয়ে উঠেছে। এই সুযোগে বেশি উপার্জনের আশায় মাদক কারবারিরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে মাদক পাচারে। তারা প্রতিদিনই নানা কৌশলে সীমান্ত দিয়ে ইয়াবা, ফেনসিডিল, গাঁজাসহ নানা ধরনের মাদকের চালান দেশে নিয়ে আসছে। এরপর সেই চালান সারাদেশে ছড়িয়ে দিচ্ছে। এমন প্রেক্ষাপটে মাদক চোরাচালান ঠেকাতে ভারত ও মিয়ানমার সীমান্তবর্তী ৩২টি জেলায় রেড অ্যালার্ট জারি করেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। এ ব্যাপারে মাদক বিভাগের সব বিভাগীয় ও জেলা কার্যালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে।
ওই চিঠিতে মাঠ পর্যায়ের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বিনা অনুমতিতে কর্মস্থল ত্যাগ না করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অবৈধ মাদকদ্রব্য ক্রয়-বিক্রয়, অপব্যবহার, পাচার ও বিস্তাররোধসহ মাদক সংক্রান্ত উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কোনো অবস্থাতেই আইনশৃঙ্খলার যেন অবনতি না হয়, সে লক্ষ্যে অধিকতর সতর্কতা অবলম্বন করে মাদকবিরোধী নিয়মিত অভিযান জোরদার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে চিঠিতে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলেছে, সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে সব সময় অস্ত্র ও মাদকের চোরাচালান বেড়ে যায়। অস্ত্র ব্যবহার হয় পেশিশক্তি প্রদর্শনে। এ সময় মাদকসেবনও বেড়ে যায় সারাদেশে। ভোটের সময় কালো টাকারও ছড়াছড়ি হয়। সেই টাকায় মাদক বিকিকিনি ও সেবন বেড়ে যায়। রমরমা হয়ে ওঠে মাদকের বাজার। এ বিষয়টি মাথায় রেখেই মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সক্রিয় হয়ে উঠেছে সারাদেশে। এর মধ্যে সীমান্তবর্তী ৩২ জেলার ৯৬টি থানা এলাকায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে বিশেষ টহল এবং নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। বসানো হচ্ছে চেকপোস্ট। যাতে সীমান্তের ফাঁক গলে মাদকের চালান দেশে ঢুকতে না পারে।
একাধিক সূত্রে জানা গেছে, ভারত ও মিয়ানমার সীমান্তের ৩৮৬টি পয়েন্ট দিয়ে মাদকদ্রব্যের চালান দেশে প্রবেশ করে। এর মধ্যে ফেনসিডিল, হেরোইন ও গাঁজার সিংহভাগ চালান আসে ভারত থেকে। আর ইয়াবার চালান আসছে মিয়ানমার থেকে। ইতোমধ্যে রাজধানীসহ সারাদেশেই ইয়াবার চাহিদা বেড়ে গেছে বলে পুলিশ ও গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে। কক্সবাজার ও সংলগ্ন সীমান্ত এলাকা
দিয়ে ঢুকছে বড় বড় ইয়াবার চালান। মিয়ানমারের সাবাইগন, তমব্রু, মংডুর মতো ১৫টি পয়েন্ট দিয়ে এবং টেকনাফের সেন্টমার্টিন, শাহপরীর দ্বীপ, ধুমধুমিয়া, কক্সবাজার হাইওয়ে, উখিয়া, কাটাপাহাড়, বালুখালী, বান্দরবানের ঘুমধুম, দমদমিয়া, জেলেপাড়ার মতো পয়েন্ট দিয়ে ইয়াবা ঢুকছে বাংলাদেশে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের টেকনাফের বিশেষ জোনের সহকারী পরিচালক কাজী দিদারুল আলম বলেন, সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে যাতে ইয়াবার চালান ঢুকতে না পারে এ জন্য নিয়মিত অভিযান ও টহল অব্যাহত রয়েছে। বিভিন্ন পয়েন্টে চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি করা হচ্ছে। জোরদার করা হয়েছে গোয়েন্দা নজরদারি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সাতক্ষীরা, যশোর, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, জয়পুরহাট ও দিনাজপুর সীমান্ত দিয়ে মাদক ঢুকছে। এ ছাড়া ভারতের আসাম ও মেঘালয়ের বাংলাদেশ-ঘেঁষা চারটি জেলা দিয়ে মাদকের চালান প্রবেশ করছে। বাংলাদেশের পূর্ব সীমান্তে ভারতের আসাম, ত্রিপুরা ও মিজোরামের চারটি পয়েন্ট হয়ে মাদক আসছে সিলেট, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা ও ফেনী দিয়ে। সীমান্তবর্তী অন্যান্য জেলা দিয়েও প্রতিনিয়ত মাদকের চালান আসছে।
কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা, যশোর, সাতক্ষীরা, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, ময়মনসিংহ, ঝিনাইদহ, রাজশাহী, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ দিয়ে বেশি আসছে ফেনসিডিল। আর ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নওগাঁ, ময়মনসিংহ, শেরপুর, নেত্রকোনা, জামালপুর, সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও সুনামগঞ্জ জেলার সীমান্ত পথ দিয়ে আসছে গাঁজা।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালে সংস্থাটি ৯১ হাজার ৩৮৪টি অভিযান পরিচালনা করে। এ সময় ২৫ লাখ ৭৪ হাজার ৯৮১ পিস ইয়াবা, ১৯ কেজি ৬২১ গ্রাম হেরোইন, ৭ হাজার ৭৩০ কেজি গাঁজা, ৬৯৮টি গাঁজা গাছ এবং ২৭ হাজার ৪৩৬ বোতল ফেনসিডিল উদ্ধার করে। ২০২৪ সালে মোট মামলা হয় ২১ হাজার ৯১৩টি। অন্যদিকে ২০২৫ সালে এক লাখ ৪ হাজার ৮৪৩টি অভিযান পরিচালনা করে মাদক বিভাগ। এ সময় ২৮ হাজার ৪০৯টি মামলা দায়ের করা হয়। ২০২৫ সালে মোট ৪৭ লাখ ৭২ হাজার ১২২ পিস ইয়াবা, ১৮ কেজি ১০৪ গ্রাম হেরোইন, ৬ হাজার ৯৩৮ কেজি গাঁজা এবং ১২ হাজার ২১৯ বোতল ফেনসিডিল উদ্ধার করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। সূত্র : আমাদের সময়