মঙ্গলের বায়ুমণ্ডল থেকে রকেটের জ্বালানি তৈরির শক্তিশালী অনুঘটক উদ্ভাবন চীনা বিজ্ঞানীদের
আইটি ডেস্ক
২৮ অক্টোবর, ২০২৬, 11:32 AM
আইটি ডেস্ক
২৮ অক্টোবর, ২০২৬, 11:32 AM
মঙ্গলের বায়ুমণ্ডল থেকে রকেটের জ্বালানি তৈরির শক্তিশালী অনুঘটক উদ্ভাবন চীনা বিজ্ঞানীদের
ভবিষ্যতে মঙ্গলে যাওয়া নভোচারীরা যেন সেখানকার বায়ুমণ্ডল থেকেই নিজেদের জ্বালানি তৈরি করতে পারেন, সে লক্ষ্যে কাজ করছেন চীনা মহাকাশবিজ্ঞানীরা। একদিন মানুষকে মঙ্গলে পাঠানোর ব্যাপারে বেইজিং যে গুরুত্বের সঙ্গে এগোচ্ছে, এ উদ্যোগ তারই ইঙ্গিত।
চীনের হেফেই শহরে অবস্থিত রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে পরিচালিত ডিপ স্পেস এক্সপ্লোরেশন ল্যাবরেটরির একটি দল এমন একটি অনুঘটক উদ্ভাবন করেছে, যা কার্বন ডাই-অক্সাইডকে মিথানল নামের তরল জ্বালানিতে রূপান্তর করতে পারে। মঙ্গলের বায়ুমণ্ডলের ৯৫ শতাংশেরও বেশি কার্বন ডাই-অক্সাইড।
মহাকাশসম্পদবিষয়ক বিজ্ঞানী ঝাং ঝে ও তার সহকর্মীরা জার্নাল অব ডিপ স্পেস এক্সপ্লোরেশন সাময়িকীতে অনলাইনে প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে লিখেছেন, 'মিথানল থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা, তাপ সরবরাহ করা এবং মঙ্গলে চলাচলকারী রোভার চালানো সম্ভব। এ ছাড়া অ্যান্টিফ্রিজ, নির্মাণসামগ্রী ও অন্যান্য পণ্য তৈরির রাসায়নিক উপাদান হিসেবেও এটি ব্যবহার করা যায়।'
গবেষকেরা লিখেছেন, ভবিষ্যতে মানুষ নিয়ে মঙ্গলে অভিযান এবং সেখানে দীর্ঘ সময় অবস্থানের জন্য গ্রহটিকে গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
তাদের মতে, মঙ্গলে ব্যবহারযোগ্য বায়ু, বরফ হিসেবে জমা পানি এবং খনিজ সম্পদ থাকতে পারে। সেখানে জ্বালানি ও প্রয়োজনীয় রাসায়নিক পদার্থ তৈরি করা গেলে পৃথিবী থেকে অনেক কম উপকরণ পাঠাতে হবে। এতে খরচ কমবে এবং ভবিষ্যতের মঙ্গলঘাঁটি আরও স্বনির্ভর হয়ে উঠবে।
এই অনুঘটকে স্পঞ্জের মতো গঠনবিশিষ্ট একটি স্ফটিকের সঙ্গে তামা ও সোডিয়াম যুক্ত করা হয়েছে। এটি কার্বন ডাই-অক্সাইডের সঙ্গে হাইড্রোজেনের বিক্রিয়ায় সহায়তা করে মিথানল তৈরি করে। এর ফলে মঙ্গলের বরফ থেকে হাইড্রোজেন উৎপাদন করা সম্ভব হতে পারে।
পৃথিবীতে পরীক্ষাগারে চালানো পরীক্ষায় দেখা গেছে, শুধু তামা ব্যবহার করার তুলনায় এই অনুঘটক ১১ গুণ বেশি মিথানল উৎপাদন করেছে এবং অনাকাঙ্ক্ষিত উপজাতের পরিমাণ কমিয়েছে।
গবেষক দলটি লিখেছে, 'এই গবেষণা আরও দেখায়, কার্যত মঙ্গলের বায়ুমণ্ডলের কার্বন ডাই-অক্সাইড থেকে সেখানে বসেই একটি নির্দিষ্ট মাত্রায় মিথানল উৎপাদন করা সম্ভব।'
যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা দীর্ঘদিন ধরে মঙ্গলে নভোচারী পাঠানোর পরিকল্পনার কথা বলে আসছে, যদিও এ জন্য এখনও নির্দিষ্ট কোনো তারিখ ঠিক করা হয়নি।
সংস্থাটির টোস্টারের আকারের মক্সি যন্ত্রটি পারসিভিয়ারেন্স রোভারে স্থাপন করা হয়েছিল। ২০২১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে যন্ত্রটি সফলভাবে মঙ্গলের বায়ুমণ্ডল থেকে অক্সিজেন তৈরি করে।
নাসা ও স্পেসএক্স মূলত মঙ্গলের কার্বন ডাই-অক্সাইড থেকে মিথেন তৈরি করে তা দিয়ে পৃথিবীতে ফেরার রকেট চালানোর বিষয়টি নিয়ে কাজ করেছে।
তবে চীনা গবেষক দলটি মিথেনের পরিবর্তে মিথানল বেছে নিয়েছে। মিথেনকে অত্যন্ত কম তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করতে হয়।
অন্যদিকে, মিথানল স্বাভাবিক কক্ষ তাপমাত্রায় তরল থাকে। ফলে এটি সংরক্ষণ করা সহজ এবং নানা কাজে ব্যবহার করা যায়।
গবেষক দলের পরীক্ষায় দেখা গেছে, পটাশিয়াম ও সিজিয়ামের তুলনায় সোডিয়াম ভালো ফল দিয়েছে। এটি অনুঘটককে কার্বন ডাই-অক্সাইড আকর্ষণ করতে এবং সেটিকে তামার কাছাকাছি ধরে রাখতে সহায়তা করে।
প্রতি কেজি অনুঘটক দিয়ে প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ২৪৫ গ্রাম মিথানল উৎপাদন করা গেছে। এ ছাড়া ১২ ঘণ্টার পরীক্ষাজুড়েই অনুঘটকটি ধারাবাহিকভাবে কার্যকর ছিল।
পৃথিবীর সঙ্গে সবচেয়ে বেশি সাদৃশ্যপূর্ণ গ্রহ মঙ্গল দীর্ঘদিন ধরেই মহাকাশ গবেষণায় অগ্রসর দেশগুলোর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। একদিন সেখানে মানুষ পাঠানোর আশায় প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে এসব দেশ।
২০২১ সালে তিয়ানওয়েন-১ মঙ্গলে অবতরণের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে চীনই একমাত্র দেশ হিসেবে সফলভাবে মঙ্গলে চালকবিহীন মহাকাশযান অবতরণ করানোর কৃতিত্ব অর্জন করে।
২০২৮ সালের দিকে চীনের তিয়ানওয়েন-৩ অভিযান উৎক্ষেপণের পরিকল্পনা রয়েছে। এ অভিযানের লক্ষ্য, ২০৩১ সালের দিকে মঙ্গল থেকে অন্তত ৫০০ গ্রাম নমুনা পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনা।
অভিযানের প্রধান নকশাবিদ লিউ জিঝং বলেছেন, এই অভিযান মানবজাতির ইতিহাসে প্রথমবারের মতো মঙ্গল থেকে নমুনা পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনার সাফল্য অর্জন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তবে আপাতত ঝাং ও তার সহকর্মীরা বলেছেন, এ বিষয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
তথ্যসূত্র: সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট