ঢাকা ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
সংবাদ শিরোনাম
আমি কথা কম বলি কাজ বেশি করি: অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী সকলে মিলে সুন্দর সাতক্ষীরা গড়ে তুলবো: মুহাদ্দিস আব্দুল খালেক এমপি মা হারালেন ক্রিকেটার শেখ মেহেদী বিসিবি'র প্রধান নির্বাচকের দায়িত্ব পেলেন হাবিবুল বাশার নৌকায় তুলে বুড়িগঙ্গায় সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, ৪ জনের যাবজ্জীবন দুর্নীতি করব না, কাউকে করতেও দেবো না: শিক্ষামন্ত্রী ১৪ এপ্রিলের আগেই বগুড়া ও শেরপুরের উপনির্বাচন সচিবালয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদপুরে চুরি-ছিনতাই রোধে যে পদক্ষেপ নিচ্ছেন ববি হাজ্জাজ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌদি রাষ্ট্রদূতের সৌজন্য সাক্ষাৎ

ভেজাল উপাদানে তৈরি মাদকে নতুন আতঙ্ক

#

নিজস্ব প্রতিবেদক

২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬,  10:53 AM

news image

ভেজাল মাদকে মৃত্যু বাড়ছে। নতুন নামেও আসছে মাদক। সীমান্ত থেকে সব জায়গায় তৎপরতা।

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর কড়া নজরদারি ও সীমান্তে ব্যাপক অভিযানের পরও রমরমা মাদক ব্যবসার হেরফের নেই। দেশের বিভিন্ন স্থানে চলছে মাদক কারবারি ও ক্রেতার লেনদেন। এর মধ্যেই অধিক মুনাফার লোভে মাদক কারবারি কেউ কেউ নিজেরাই উৎপাদনে ঝুঁকছে, যা দেশের ভেতর মাদক ব্যবসা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। এ ক্ষেত্রে বেশির ভাগ মাদকদ্রব্য ভেজাল উপাদান দিয়ে তৈরি হচ্ছে বলে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) সূত্র জানিয়েছে। এর মধ্যে ভেজাল মদ পানে একাধিক মৃত্যুর ঘটনা এসেছে সংবাদমাধ্যমে।

প্রচলিত মাদকদ্রব্যের বাইরে গত কয়েক মাসের মধ্যে বেশ কয়েকটি নতুন মাদকদ্রব্য প্রবেশ করেছে। এর মধ্যে নতুন প্রজন্মের অপ্রচলিত মাদক ‘কুশ’ ও এমডিএমবির চালানসহ জড়িত কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। নতুন নামে আরো কয়েকটি মাদক দেশে ঢুকেছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।

বিত্তবান লোকদের কাছে এসব মাদকের চাহিদা বেশি। তবে ধরা না পর্যন্ত এসব মাদকদ্রব্যের নাম প্রকাশ করতে চাচ্ছে না সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, আগে বিদেশ থেকে ইয়াবা, হেরোইন বা সিনথেটিক মাদকদ্রব্য আনা  হতো বড় চালানে। কিন্তু সীমান্তে নজরদারি, প্রযুক্তি ব্যবহার ও গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ায় বড় চালান ধরা পড়ছে বেশি। এতে পাচারের ঝুঁকি ও ক্ষতির আশঙ্কা বেড়ে যাওয়ায় কারবারিরা বিকল্প পথ খুঁজছে। এই পরিস্থিতিতে কিছু চক্র গোপনে স্থানীয়ভাবে ছোট ল্যাবরেটরি স্থাপন করে মাদক তৈরি করছে বলে তথ্য মিলেছে।

সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার রাতে টঙ্গী থেকে এক আস্তানায় অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ ভেজাল উপাদানে তৈরি ইয়াবা ও  ভেজাল উপাদান উদ্ধার এবং একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর আগে গত ৭ জানুয়ারি  ভাটারা থানায় পৃথক দুটি অভিযানে ভেজাল মদের কারখানা ও উৎপাদনকারী চক্রের সন্ধান পেয়েছে ডিএনসি। একই দিন রাজধানীর ওয়ারী এলাকায় আধুনিক ল্যাবরেটরিতে নতুন প্রজন্মের অপ্রচলিত মাদক ‘কুশ’ তৈরির বিষয়টি উদঘাটন করা হয়।

ঘটনা দুটি আলাদা হলেও উভয় ক্ষেত্রে মাদকচক্রের পরিকল্পিত, সংগঠিত ও জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ কার্যক্রম সামনে এসেছে। অন্যদিকে গত ১১ ডিসেম্বর দেশে প্রথমবারের মতো নতুন ধরনের মাদক এমডিএমবির চালান জব্দ করা হয়। ভেপ ই-সিগারেটের মধ্যে গোপনে এই মাদক সরবরাহ করা হতো। মালয়েশিয়া থেকে সংগ্রহ করা এই মাদকদ্রব্যের চক্রের বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছে ডিএনসি।

যৌথ বাহিনীর দাবি, আন্তর্জাতিকচক্র অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও কুরিয়ার নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে নতুন প্রজন্মের সিনথেটিক মাদকদ্রব্য ছড়িয়ে দিচ্ছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সরবরাহের কৌশল বদলে যাওয়ায় অভিযান জোরদারের পাশাপাশি আইন, প্রযুক্তি ও জনস্বাস্থ্য সব ক্ষেত্রেই সমন্বিত পদক্ষেপ জরুরি।

তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, বাজারে এখন কয়েক ধরনের মাদক বেশি সক্রিয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, সিনথেটিক ড্রাগের রাসায়নিক গঠন দ্রুত বদলে ফেলার কারণে আইনগত তালিকাভুক্তি ও পরীক্ষাগারে শনাক্তকরণ জটিল হয়ে পড়ছে। অনেক সময় এগুলোকে ‘হারবাল’ বা ‘সেফ’ নামে প্রচার করে বিভ্রান্ত করা হয়। অভিযান অব্যাহত থাকলেও মাদকচক্র কৌশল বদলাচ্ছে দ্রুত। সীমান্ত থেকে ডিজিটাল মাধ্যমে সব জায়গায় সমন্বিত তৎপরতা, আইনের দ্রুত হালনাগাদ, আধুনিক ল্যাব সুবিধা এবং সচেতনতা ও পুনর্বাসন—এই চার ক্ষেত্রে টেকসই অগ্রগতি সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দমনমূলক অভিযান গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে দরকার প্রতিরোধ ও পুনর্বাসন। জনস্বাস্থ্যভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি ছাড়া স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।

অন্যদিকে সহজলভ্য ফেনসিডিল নামটি বেশি পরিচিত হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দৃষ্টি এড়াতে কৌশল পাল্টেছে কারবারিরা। চাহিদার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ভারত সীমান্তে গড়ে ওঠা বিভিন্ন ল্যাব ও কারখানায় এটি তৈরি হচ্ছে ভিন্ন ভিন্ন নামে। পরে সেগুলো মাদক কারবারিদের মাধ্যমে সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ফেনিসিডিল বিভিন্ন নামে দেশে প্রবেশ করতে শুরু করেছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর নজরে পড়লে নাম বদল করা হয়।

ডিএনসি, পুলিশ, বিজিবি, র‌্যাব ও কোস্ট গার্ডের পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪ সালে সারা দেশে পাঁচ লাখ ৭২ হাজার ৮৬৫ বোতল ও ৪১ লিটার ফেনসিডিল জব্দ করা হয়। গত বছর ১১ মাসে উদ্ধার করা হয় তিন লাখ ১২ হাজার ৫৫৫ বোতল ও ৮২ লিটার ফেনসিডিল।

ডিএনসির কর্মকর্তাদের দাবি, প্রচলিত ফেনসিডিলের সরবরাহ কমতে থাকায় উদ্ধারের পরিমাণও কমছে। তবে নাম বদল করে আসা ফেনসিডিলের চালান উদ্ধার বাড়ছে।

ডিএনসি ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, সম্প্রতি বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে ভাড়া বাসা, পরিত্যক্ত গুদাম, গ্রামাঞ্চলের নির্জন বাড়ি থেকে রাসায়নিক দ্রব্য, ট্যাবলেট তৈরির যন্ত্র এবং মাদক উৎপাদনের সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে এসব ল্যাব বাইরে থেকে সাধারণ বাসা বা ছোট কারখানা মনে হলেও ভেতরে চলত অবৈধ উৎপাদন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, স্থানীয়ভাবে মাদক উৎপাদনের পেছনে মূল কারণ তিনটি—পাচারের ঝুঁকি কমানো, কম খরচে বেশি লাভ ও দ্রুত বাজারে সরবরাহ সম্ভব। এ ছাড়া সিনথেটিক মাদক তৈরির কাঁচামাল অনেক সময় বৈধ শিল্প রাসায়নিক হিসেবে সহজেই সংগ্রহ করা যায়। ফলে নজরদারি এড়িয়ে উৎপাদন চালানো সহজ হয়ে যায়।

ডিএনসির গোয়েন্দা তথ্য বলছে, উৎপাদন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনলাইনভিত্তিক নেটওয়ার্কও সক্রিয় হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, মেসেজিং অ্যাপ ও গোপন ডেলিভারি ব্যবস্থার মাধ্যমে শহরের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া তরুণদের লক্ষ্য করে বাজার তৈরি করছে চক্রগুলো।

ডিএনসির ঢাকা বিভাগের গোয়েন্দা শাখার উপপরিচালক মো. মেহেদী হাসান বলেন, ‘মাদক উৎপাদন রোধে শুধু অভিযান নয়, জনসচেতনতা ও তথ্য সহযোগিতাও জরুরি। আমরা তথ্য পেলে তাৎক্ষণিক আইন মোতাবেক ব্যবস্থা নিচ্ছি।’

পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশের সর্বদা জিরো টলারেন্স নীতি অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে নতুন মাদকের প্রতিও কঠোর নজরদারি রেখে জড়িতদের বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

অপরাধ ও সমাজ বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী বলেন, দেশে মাদক উৎপাদন শুরু হলে মাদকের সহজলভ্যতা বাড়বে, দাম কমবে এবং নতুন ব্যবহারকারী তৈরি হবে, যা দীর্ঘ মেয়াদে অপরাধ, স্বাস্থ্যঝুঁকি ও সামাজিক অস্থিরতা বাড়াবে। ফলে এ ব্যাপারে অতি দ্রুত অভিযানের বিকল্প নাই। সূত্র: কালের কণ্ঠ

logo

সম্পাদক ও প্রকাশক : মো. নজরুল ইসলাম