ঢাকা ১৩ আগস্ট, ২০২৬
সংবাদ শিরোনাম
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন স্থগিত চেয়ে হাইকোর্টে রিট পে স্কেল বাস্তবায়নে নতুন গতি স্কুলছাত্রী অপহরণ মামলায় এনসিপি নেতাসহ গ্রেফতার ২ দেশের বাজারে ফের বাড়লো স্বর্ণের দাম রেমিট্যান্সে ভর করে ৩৭ বিলিয়ন ডলার ছাড়াল রিজার্ভ আইএফআইসি ব্যাংকের ঢাকা অঞ্চলের অর্ধ-বার্ষিক ব্যবসায়িক সম্মেলন-২০২৬ অনুষ্ঠিত গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট আরও এক সপ্তাহ চলতে পারে ২৩ বছর পর ইরাক ছাড়ছে সব মার্কিন সেনা যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়াতে সম্মত যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চিকিৎসা চালিয়ে যেতে আবারও লন্ডনে ইলিয়াস কাঞ্চন

ভারতীয় আম আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা জাপানের

#

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

১৩ আগস্ট, ২০২৬,  11:03 AM

news image

জাপানের বাজারে আম পাঠানোর সব প্রস্তুতি শেষ। রপ্তানিকারকদের গুদামে সাজানো ভারতের সেরা আলফানসো ও কেশর আম। কিন্তু ঠিক সেই সময়ই বড় ধাক্কা আসে। ভেপার হিট ট্রিটমেন্ট (ভিএইচটি) কেন্দ্র পরিদর্শনের পর ভারতীয় আমের জীবাণুমুক্তকরণ ও মান নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়ায় গুরুতর অনিয়মের প্রশ্ন তোলে জাপান। এরপরই দেশটি ভারত থেকে আম আমদানি সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়।


আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের উত্তর প্রদেশের লখনৌয়ের রেহমানপুর গ্রামের একটি ভিএইচটি কেন্দ্রে গত মার্চে আকস্মিক পরিদর্শন চালায় জাপানের কোয়ারেন্টাইন পরিদর্শক দল। ফল ও সবজি রপ্তানির আগে ক্ষতিকর পোকামাকড় ধ্বংস করতে এই কেন্দ্রে বাষ্পীয় তাপ প্রয়োগ করা হয়। পরিদর্শনের আগে অবশ্য সবকিছুই প্রস্তুত ছিল। রপ্তানির কাগজপত্রের অনুমোদন মিলেছিল, চালান পাঠানোর সময়ও নির্ধারিত ছিল। মহারাষ্ট্র ও গুজরাটের আমচাষিরাও জাপানের বাজারের জন্য আলফানসো ও কেশরসহ নির্দিষ্ট জাতের আম আলাদা করে রেখেছিলেন।


কিন্তু ভিএইচটি প্রক্রিয়া, জীবাণুমুক্তকরণ এবং মান নিয়ন্ত্রণের নথিপত্র যাচাইয়ের পর জাপানি পরিদর্শকরা কিছু গুরুতর অসঙ্গতি শনাক্ত করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ৩১ মার্চ ইয়োকোহামার প্ল্যান্ট প্রটেকশন অথরিটি ভারতকে চিঠি দিয়ে জানায়, ২৫ মার্চ বা তার পর ইস্যু করা সনদযুক্ত ভারতীয় আমের চালান জাপানে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। পরিদর্শকদের সন্তুষ্ট করার মতো উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে. প্রায় দুই দশকের ভারত-জাপান আম বাণিজ্যে এমন পরিস্থিতি নতুন নয়। ১৯৮৬ সালে ফলখেকো ক্ষতিকর পোকার আশঙ্কায় ভারতীয় আম আমদানি বন্ধ করেছিল জাপান। পরে ভিএইচটি সুবিধা স্থাপন, পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণে নজরদারি বাড়ানো এবং নিয়মিত পরিদর্শনের ব্যবস্থা চালুর পর ২০০৬ সালে সেই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়।


ছয় জাতের আম রপ্তানি ঝুঁকিতে


২০২৬ সালের এই স্থগিতাদেশের সরাসরি প্রভাব পড়েছে জাপানে অনুমোদিত ভারতের ছয় জাতের আমের ওপর। এগুলো হলো- আলফানসো, কেশর, ল্যাংড়া, বেগুনফুলি, চৌসা ও মল্লিকা। এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত এসব আমের প্রধান রপ্তানি মৌসুম।


২০২৫-২৬ অর্থবছরে জাপান ভারত থেকে প্রায় ১৫ লাখ ৪০ হাজার ডলার মূল্যের তাজা ও প্রক্রিয়াজাত আম আমদানি করেছিল। পরিমাণের বিচারে এটি ভারতের সবচেয়ে বড় বাজার না হলেও জাপানের গুরুত্ব অন্য জায়গায়। দেশটির ক্রেতারা উচ্চমূল্যে আম কেনেন এবং জাপানের বাজারে প্রবেশের অনুমোদনকে আন্তর্জাতিক মানের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি হিসেবে দেখা হয়।


মুম্বাইয়ের ব্যবসায়ী বিক্রম শাহ গত বছর জাপানে প্রায় আড়াই টন আম পাঠিয়েছিলেন। তার মতে, জাপান হয়তো বিক্রির পরিমাণে সবচেয়ে বড় বাজার নয়, কিন্তু সেখানে ব্যবসা করতে পারা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করে।


জাপানি আমদানিকারকদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়তে তাকে প্রায় ছয় বছর কাজ করতে হয়েছে। তিনি দুবার ওসাকা গিয়ে আমদানিকারকদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন এবং তাদের সংরক্ষণ ব্যবস্থা ও আমের মানের চাহিদা সরেজমিনে দেখেছেন। হঠাৎ একটি মৌসুমের জটিলতায় দীর্ঘদিনের সেই সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা করছেন তিনি।


এর মধ্যেই ভারতীয় আমচাষিরা আরও কয়েকটি সমস্যার মুখোমুখি। কঙ্কন অঞ্চলে তীব্র তাপপ্রবাহে মহারাষ্ট্রের আলফানসো আমের বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক অস্থিরতায় সমুদ্র ও আকাশপথে পণ্য পরিবহনের ব্যয়ও বেড়েছে। জাপানের অর্ডার বাতিল হওয়ায় রপ্তানির জন্য প্রস্তুত করা আম পচে নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে।


আমের পর চালেও চীনের বাধা


ভারতের কৃষিপণ্য রপ্তানি ব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়ে প্রশ্নটি অবশ্য শুধু আমেই সীমাবদ্ধ নেই। এর আগে চীনের কাস্টমস কর্তৃপক্ষ ভারতীয় চালের কয়েকটি চালানে জেনেটিক্যালি মডিফায়েড অর্গানিজম (জিএমও) থাকার অভিযোগ তোলে এবং সেগুলো ফেরত পাঠায়। পরে ১৭ এপ্রিল তিন ভারতীয় চাল রপ্তানিকারকের লাইসেন্স বাতিল করা হয়।


রপ্তানিকারকরা অবশ্য অভিযোগ অস্বীকার করে জানান, চীনে পাঠানোর আগেই চালের জিএমও-মুক্ত সনদ নেওয়া হয়েছিল। ভারত সরকারও বলে আসছে, দেশটির কোনো ধান বা চালের জাত জেনেটিক পরিবর্তনের মাধ্যমে উৎপাদিত নয়। চালের ক্ষেত্রে সমস্যাটি ভারতের জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির মোট কৃষিপণ্য রপ্তানির ২০ শতাংশের বেশি আসে চাল থেকে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভারত রেকর্ড ১২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের চাল রপ্তানি করেছে। ফলে চীনের বাজারে প্রবেশের বাধা শুধু সংশ্লিষ্ট তিন রপ্তানিকারক নয়, পুরো খাতের জন্যই উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।


ভারতের বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন অ্যাগ্রিকালচারাল অ্যান্ড প্রসেসড ফুড প্রোডাক্টস এক্সপোর্ট ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (এপিডা) বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের চিঠি দেয়। পরে ৮ জুন চীনে চাল পাঠানোর আগে জিএমও পরীক্ষার জন্য অনুমোদিত পরীক্ষাগারের তালিকাও প্রকাশ করা হয়।


পরীক্ষাগারের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন


নয়াদিল্লির কৃষিবিজ্ঞানী এস কে সিংয়ের মতে, আম ও চালের ঘটনাগুলো ভারতের কৃষিপণ্য পরীক্ষাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা সামনে এনেছে। তার ভাষ্য, দেশের অধিকাংশ পরীক্ষাগার এত দিন কীটনাশক ও অ্যাফলাটক্সিন পরীক্ষাকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা বাড়লেও জিএমও শনাক্তকরণের মতো বিশেষ পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও অবকাঠামো এখনো পর্যাপ্ত নয়।


দেশে সরকার অনুমোদিত পরীক্ষাগার থাকলেও সেগুলোর সক্ষমতা সমান নয়। চালের প্রোটিন পরীক্ষা করার মতো প্রযুক্তি হাতে গোনা কয়েকটি ল্যাবে রয়েছে, যার বেশির ভাগ দিল্লি ও তেলেঙ্গানার হায়দরাবাদে। ফলে পাঞ্জাব ও হরিয়ানার মতো উত্তরাঞ্চলের রপ্তানিকারকদের নমুনা পরীক্ষার জন্য অনেক দূরে পাঠাতে হয়।


বিচ্ছিন্ন সরবরাহ ব্যবস্থাই বড় দুর্বলতা


ভারতের কৃষিপণ্য রপ্তানিতে মান নিয়ন্ত্রণের সংকটের পেছনে সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতাকেও দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। সম্প্রতি কীটনাশকের উপস্থিতি পাওয়ার পর হংকং ভারতের কয়েকটি মসলা পণ্যের বিক্রি বন্ধ করে দেয়। পরীক্ষায় প্রায় ১২ শতাংশ নমুনায় মানের ঘাটতি পাওয়া যায়।


২০২৪ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নের র‌্যাপিড অ্যালার্ট সিস্টেমে ভারতীয় মসলা নিয়ে ৩১২টি সতর্কবার্তা জারি হয়। এর পরের বছর জানুয়ারি থেকে ভারতীয় জিরার চালানে পরীক্ষার হার বাড়িয়ে ৩০ শতাংশ করে ইইউ।


কেরালার কোচির খাদ্য নিরাপত্তা বিজ্ঞানী অনন্যা বসুর মতে, ভারতের সরবরাহ ব্যবস্থার বড় সমস্যা হলো উৎপাদন থেকে রপ্তানি পর্যন্ত পণ্যের গতিপথের ধারাবাহিক হিসাব না থাকা। কৃষকের কাছ থেকে মধ্যস্বত্বভোগী, এরপর ব্যবসায়ী এবং পরে প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানের হাতে পণ্য পৌঁছানোর সময় একাধিকবার হাতবদল হয়। ফলে কোন কৃষক কী ধরনের কীটনাশক ব্যবহার করেছেন, সেই তথ্য অনেক ক্ষেত্রেই আর খুঁজে পাওয়া যায় না।


এদিকে প্রতিযোগী দেশগুলো এ জায়গায় দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। থাইল্যান্ড দেশজুড়ে খাদ্যের উৎস শনাক্ত করার ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। ভিয়েতনাম কৃষকদের প্রশিক্ষণে বিনিয়োগ করছে। ব্রাজিল ও চিলি আধুনিক কোল্ড-চেইন অবকাঠামো উন্নয়নে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করছে।


কৃষিপণ্য উৎপাদনে বিশ্বে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক কৃষিপণ্য রপ্তানিতে ভারতের অংশ মাত্র ২ দশমিক ৪ শতাংশ। দেশটির মোট কৃষিপণ্য রপ্তানিতে প্রক্রিয়াজাত পণ্যের অংশও প্রায় ১৭ শতাংশে আটকে আছে। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রে এই হার ২৫ শতাংশ এবং চীনে ৫০ শতাংশ।


জাপানের আম নিষেধাজ্ঞা তাই শুধু একটি নির্দিষ্ট ফলের রপ্তানি সংকট নয়; বরং আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতের কৃষিপণ্যের মান, পরীক্ষাব্যবস্থা, সরবরাহের স্বচ্ছতা ও অবকাঠামোগত সক্ষমতা নিয়ে দীর্ঘদিনের কিছু প্রশ্নকেই নতুন করে সামনে এনেছে।


তথ্য সূত্র- আল জাজিরা।

logo

সম্পাদক ও প্রকাশক : মো. নজরুল ইসলাম