বিশ্বনবী (সা.)-এর শাফাআত কী ও কার জন্য
১৮ আগস্ট, ২০২৬, 11:25 AM
NL24 News
১৮ আগস্ট, ২০২৬, 11:25 AM
বিশ্বনবী (সা.)-এর শাফাআত কী ও কার জন্য
শাফাআত শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো কোনো একক বিষয়কে অন্য কিছুর সঙ্গে যুক্ত করে জোড়া বানানো।
পারিভাষিক অর্থে শাফাআত হলো অন্য কারো জন্য কোনো উপকার লাভ করে দেওয়া অথবা কোনো ক্ষতি দূর করার উদ্দেশ্যে সুপারিশ বা মধ্যস্থতা করা।
এ অর্থের সঙ্গে ‘শাফাআত’ শব্দের সম্পর্কও স্পষ্ট। কারণ আপনি যখন কারো জন্য সুপারিশ করেন, তখন মূলত তার সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করে তার পক্ষে দাঁড়ান। যেমন—
ক. ক্ষতি দূর করার শাফাআত : কিয়ামতের ময়দানে রাসুলুল্লাহ (সা.) মানুষের জন্য আল্লাহর কাছে সুপারিশ করবেন, যাতে তাদের হিসাব-নিকাশের ফয়সালা করা হয়। এটিই শাফাআতে কুবরা বা মহাশাফাআতের অন্তর্ভুক্ত।
খ. উপকার লাভের শাফাআত : রাসুলুল্লাহ (সা.) জান্নাতবাসীদের জন্য সুপারিশ করবেন, যাতে তারা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারে।
ইসলামী শরিয়তসম্মত শাফাআতের জন্য মূলত তিনটি শর্ত আছে—
প্রথম শর্ত : শাফাআতকারীর প্রতি আল্লাহর সন্তুষ্ট হতে হবে।
দ্বিতীয় শর্ত : যার জন্য শাফাআত করা হবে, তার প্রতিও আল্লাহর সন্তুষ্ট হতে হবে।
তবে কিয়ামতের ময়দানের মহাশাফাআত সাধারণ মানুষের জন্য হবে—এটি বিশেষ একটি বিষয়।
তৃতীয় শর্ত : মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে শাফাআত করার অনুমতি লাভ করতে হবে। পবিত্র কোরআনে এসেছে, ‘আকাশে কত ফেরেশতা আছে, তাদের সুপারিশ কোনো কাজে আসবে না, যতক্ষণ না আল্লাহ যাকে ইচ্ছা তার জন্য অনুমতি দেন এবং সন্তুষ্ট হন।’ (সুরা : নাজম, আয়াত : ২৬
মহান আল্লাহ আরো বলেন, ‘সেদিন সুপারিশ কোনো কাজে আসবে না, তবে তার জন্য, যাকে পরম দয়াময় অনুমতি দেবেন এবং যার কথায় তিনি সন্তুষ্ট হবেন।’ (সুরা : ত্বহা, আয়াত : ১০৯)
এই আয়াতগুলো থেকে বোঝা যায় যে শাফাআত স্বাধীনভাবে কারো ক্ষমতায় নেই; বরং সব শাফাআত আল্লাহর অনুমতি ও সন্তুষ্টির অধীন। আর শাফাআতের প্রকৃত মালিক আল্লাহ।
আয়াতুল কুরসিতে আল্লাহ বলেন, ‘কে আছে যে তাঁর অনুমতি ছাড়া তাঁর কাছে সুপারিশ করতে পারে?’
(সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ২৫৫)
অর্থাৎ কোনো নবী, ফেরেশতা বা অন্য কেউ নিজস্ব স্বাধীন ক্ষমতায় শাফাআত করতে পারেন না। আল্লাহ যার জন্য এবং যেভাবে অনুমতি দেবেন, সেভাবেই শাফাআত হবে।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শাফাআতের প্রকারভেদ
১. মহাশাফাআত বা শাফাআতে কুবরা : এটি কিয়ামতের দিনের সবচেয়ে বড় শাফাআত।
সেদিন মানুষ দীর্ঘ সময় কিয়ামতের ময়দানে অবস্থান করবে। প্রচণ্ড কষ্ট ও উদ্বেগের মধ্যে তারা এমন একজনকে খুঁজবে, যিনি আল্লাহর কাছে সুপারিশ করে হিসাব শুরু করার ব্যবস্থা করতে পারেন।
মানুষ প্রথমে আদম (আ.)-এর কাছে যাবে, এরপর নুহ (আ.), ইবরাহিম (আ.), মুসা (আ.) ও ঈসা (আ.)-এর কাছে যাবে। শেষ পর্যন্ত তারা মুহাম্মদ (সা.)-এর কাছে আসবে। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) আল্লাহর আরশের নিচে সিজদায় পড়বেন এবং আল্লাহ তাঁর জন্য বিশেষ প্রশংসা ও দোয়ার দরজা খুলে দেবেন। এরপর তাঁকে বলা হবে—‘হে মুহাম্মদ (সা.)! মাথা ওঠান, প্রার্থনা করুন—আপনাকে দেওয়া হবে; সুপারিশ করুন—আপনার সুপারিশ গ্রহণ করা হবে।’ (বুখারি, হাদিস : ৪৭১২)
এটাই শাফাআতে কুবরা।
২. জাহান্নামে প্রবেশকারী কিছু তাওহিদবাদীকে বের করে আনার
শাফাআত : রাসুলুল্লাহ (সা.) এমন কিছু মানুষ সম্পর্কে সুপারিশ করবেন, যারা ঈমানের কারণে শেষ পর্যন্ত জাহান্নাম থেকে বের হবে।
হাদিসে এসেছে, বলা হবে—‘যার অন্তরে অণু পরিমাণ ঈমান রয়েছে, তাকে জাহান্নাম থেকে বের করে দাও।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৫১)
অর্থাৎ ঈমানদারদের মধ্যে যারা নিজেদের গুনাহের কারণে জাহান্নামে প্রবেশ করেছে, আল্লাহর অনুমতিতে তাদের জন্য শাফাআত করা হবে।
৩. যাদের নেকি ও গুনাহ সমান : কিছু মানুষের নেক আমল ও গুনাহ সমান হয়ে গেলে তাদের ব্যাপারেও রাসুলুল্লাহ (সা.) শাফাআত করবেন, যাতে তারা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারে।
এ ছাড়া যাদের জাহান্নামে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তাদের মধ্যেও কিছু মানুষের জন্য শাফাআত করা হবে, যাতে তারা জাহান্নামে প্রবেশ না করে।
৪. জান্নাতে মুমিনদের মর্যাদা বৃদ্ধি : রাসুলুল্লাহ (সা.) কিছু মুমিনের জন্য শাফাআত করবেন, যাতে জান্নাতে তাদের মর্যাদা ও স্তর আরো বৃদ্ধি পায়।
৫. বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশকারীদের জন্য শাফাআত : কিছু মানুষ হিসাব ছাড়াই জান্নাতে প্রবেশ করবে। উক্কাশা ইবনু মুহসিন (রা.)-এর ঘটনা এখানে স্মরণীয়। তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে দোয়া চাইলে নবী (সা.) তাঁর জন্য দোয়া করেন, যাতে তিনি সেই ৭০ হাজার ব্যক্তির অন্তর্ভুক্ত হন, যারা বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করবে।
৬. আবু তালিবের শাস্তি হালকা করার শাফাআত : রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর চাচা আবু তালিবের জন্য শাফাআত করবেন। তবে এই শাফাআতের ফলে আবু তালিব জাহান্নাম থেকে বের হয়ে জান্নাতে যাবেন না; বরং তাঁর শাস্তি কিছুটা হালকা করা হবে। হাদিসে এসেছে, তিনি জাহান্নামের আগুনের অপেক্ষাকৃত অগভীর স্তরে থাকবেন।
লক্ষণীয় যে সব শাফাআতের ফল এক নয়। কোনো শাফাআতের মাধ্যমে কাউকে জাহান্নাম থেকে বের করা হবে, আবার কোনো শাফাআতের মাধ্যমে শুধু শাস্তি হালকা করা হবে।
৭. কবিরা গুনাহকারী মুসলিমদের জন্য শাফাআত : যেসব মুসলিম কবিরা গুনাহ করেছে এবং তাদের গুনাহের কারণে জাহান্নামে প্রবেশ করেছে, তাদের জন্যও রাসুলুল্লাহ (সা.) শাফাআত করবেন। আল্লাহর অনুমতিতে তারা জাহান্নাম থেকে বের হয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবে। হাদিসে এসেছে—‘আমার শাফাআত আমার উম্মতের বড় গুনাহকারীদের জন্য।’
(আবু দাউদ, হাদিস : ৪৭৩৯)
এ ধরনের শাফাআতে শুধু রাসুলুল্লাহ (সা.) নন, ফেরেশতা, নবী-রাসুল এবং মুমিনদের মধ্যে থেকেও যাঁদের আল্লাহ অনুমতি দেবেন, তাঁরা শাফাআত করবেন।
প্রিয় নবী (সা.)-এর শাফাআত লাভের দুটি আমল
আজান শেষে দোয়া পড়া : প্রিয় নবী (সা.)-এর সুপারিশ লাভের গুরুত্বপূর্ণ আমল হচ্ছে আজান শেষে হাদিসে বর্ণিত দোয়া পাঠ করা। সাহাবি জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি আজান শুনে এই দোয়া করে—‘আল্লাহুম্মা রব্বা হাজিহিদ দাওয়াতিত তাম্মাহ, ওয়াস সালাতিল ক্বা-ইমাহ, আ-তি মুহাম্মাদানিল ওয়াসিলাতা ওয়াল ফাদিলাহ, ওয়াব আছহু মাক্বামাম মাহমুদা নিল্লাজি ওয়াআদতাহ।’
অর্থ : হে আল্লাহ, এ পরিপূর্ণ আহবান ও প্রতিষ্ঠিত নামাজের মালিক, মুহাম্মাদ (সা.)-কে অসিলা ও সর্বোচ্চ মর্যাদার অধিকারী করুন এবং তাঁকে সে মাকামে মাহমুদে পৌঁছে দিন, যার অঙ্গীকার আপনি করেছেন।’ [রাসুল (সা.) বলেন] কিয়ামতের দিন ওই ব্যক্তি আমার শাফাআত লাভের অধিকারী হবে। (বুখারি, হাদিস : ৬১৪)
বেশি বেশি নফল নামাজ পড়া
একবার আল্লাহর রাসুল তাঁর খাদেমকে বলেন, আমার কাছে কি তোমার কিছু চাওয়ার আছে? তখন খাদেম বলেন, হে আল্লাহর রাসুল, আমার একমাত্র চাওয়া হচ্ছে আপনি কিয়ামতের দিন আমার জন্য সুপারিশ করবেন! তখন নবীজি (সা.) বলেন, আমি কি তোমাকে বলে দেব কিভাবে তুমি আমার সুপারিশ লাভ করতে পারবে? জবাবে বলেন, জি, হে আল্লাহর রাসুল, সে সম্পর্কে আমাকে একটু বলুন, নবীজি (সা.) বলেন, বেশি বেশি নামাজ পড়ো। এর মাধ্যমে কিয়ামতের দিন তুমি আমার সুপারিশ লাভ করবে। (মুসনাদে আহমদ, হাদিস : ১৬০৭৬; মুসলিম, হাদিস : ২০৮৭)