বিশ্বকাপে নাটকীয় লড়াইয়ে নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে ড্র করল ইরান
স্পোর্টস ডেস্ক
১৬ জুন, ২০২৬, 10:57 AM
স্পোর্টস ডেস্ক
১৬ জুন, ২০২৬, 10:57 AM
বিশ্বকাপে নাটকীয় লড়াইয়ে নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে ড্র করল ইরান
ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর গ্রুপ জি’র ম্যাচে যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসে দারুণ এক উত্তেজনাপূর্ণ লড়াইয়ে মুখোমুখি হয় ইরান ও নিউজিল্যান্ড। ম্যাচটি শেষ হয়েছে ২-২ গোলে ড্র হয়ে, যেখানে দুইবার পিছিয়ে পড়েও অসাধারণভাবে ঘুরে দাঁড়ায় ইরান। এর ফলে গ্রুপ 'জি'-এর দুইটি ম্যাচই ড্র হলো, এতে এই গ্রুপের চার দলই সমান ১ পয়েন্ট করে পেয়েছে।
এদিন লস অ্যাঞ্জেলস স্টেডিয়ামে ম্যাচ শুরুর আগেই ফুটবলের সঙ্গে মিশে গিয়েছিল রাজনীতি। শুরু হয় প্রতিবাদও। অন্যদিকে গ্যালারিতে উড়ছিল নানা পতাকা, জাতীয় সংগীতে শোনা গেছে দুয়ো ও সমর্থনের মিশ্র সুর। সেই উত্তপ্ত আবহের মধ্যেই মাঠে রোমাঞ্চ ছড়াল ইরান ও নিউজিল্যান্ড। দুইবার পিছিয়ে পড়েও হার মানেনি ইরান। এলিজাহ জাস্টের জোড়া গোলে দুবার এগিয়ে গিয়েছিল নিউজিল্যান্ড।
কিন্তু রামিন রেজাইয়ান ও মোহাম্মদ মোহেব্বির গোলে দুবারই ম্যাচে ফিরে আসে ইরান। শেষ পর্যন্ত গ্রুপ ‘জি’র ম্যাচ শেষ হয় ২-২ গোলে।
ম্যাচের আগে থেকেই নজর ছিল গ্যালারিতে। ইরানি সমর্থকদের মধ্যে দেখা যায় তিন ধরনের পতাকা, ইরানের বর্তমান সরকারি পতাকা, প্রাক-বিপ্লবী ‘সান অ্যান্ড লায়ন’ পতাকা এবং প্রতীকবিহীন সবুজ-সাদা-লাল পতাকা। ফিলিস্তিনি পতাকাও দেখা গেছে গ্যালারির এক পাশে।
ইরানের জাতীয় সংগীত বাজতেই স্টেডিয়ামের এক অংশ থেকে দুয়ো ভেসে আসে। আবার অনেকেই খেলোয়াড়দের সঙ্গে কণ্ঠ মেলান। মাঠের বাইরে প্রতিবাদ থাকলেও মাঠে ইরান শুরু করে দারুণ উদ্দীপনায়। কিক-অফের পরপরই উচ্চ প্রেসে নিউজিল্যান্ডকে চাপে ফেলে তারা।
কিন্তু খেলার ধারার বিপরীতে ৭ মিনিটেই এগিয়ে যায় নিউজিল্যান্ড। নিজেদের অর্ধ থেকে আসা লম্বা বল ধরে রাখেন ক্রিস উড। এরপর ডান পাশে থাকা এলিজাহ জাস্টকে পাস দেন তিনি। জায়গা বের করে ডান পায়ের শটে বল জালে পাঠান জাস্ট। শুরুতে ভালো খেলেও পিছিয়ে পড়ে ইরান।
গোলের পরও ম্যাচের গতি কমেনি অবশ্য। ১২ মিনিটে বাঁ দিক দিয়ে বক্সে ঢুকে নিচু শট নেন সারপ্রিত সিং, তবে সেটি লক্ষ্যে ছিল না। ১৫ মিনিটে নিউজিল্যান্ড কর্নার পায়। ছোট পাস থেকে তৈরি হওয়া আক্রমণে উড দ্রুত ঘুরে শট নেওয়ার চেষ্টা করেন, কিন্তু ইরানের রক্ষণ সেটি আটকে দেয়।
১৭ মিনিটের পর থেকে ম্যাচ আরও খোলা হয়ে ওঠে। দুই দলই দ্রুত আক্রমণে উঠছিল। ১৯ মিনিটে দূর থেকে শট নেন সারপ্রিত সিং, তবে বেইরানভান্দ সহজেই বল ধরেন। ২৩ মিনিটে ইরান পায় বড় সুযোগ। মাঝপথ দিয়ে উঠে দূরপাল্লার শট নেন তারেমি। ক্রোকম্বকে হারালেও বল ডান পোস্টে লেগে ফিরে আসে।
২৫ মিনিটে প্রথম কুলিং ব্রেক হয়। বিরতির পরও ইরানের চাপ চলতে থাকে। ২৯ মিনিটে তারেমির চাপের মুখে ক্রোকম্ব বল থেকে দূরে সরে যান। সুযোগ দেখে সামান ঘোদ্দোস দূর থেকে ভলিতে গোলের চেষ্টা করেন, কিন্তু শট ঠিকমতো জমেনি।
অবশেষে ৩২ মিনিটে সমতায় ফেরে ইরান। একের পর এক আক্রমণে নিউজিল্যান্ড রক্ষণকে চাপে রাখছিল তারা। ঘোদ্দোস সামনে পাস দেওয়ার চেষ্টা করেন, মোগানলু পড়ে যান। কাছেই থাকা রেজাইয়ান দ্রুত প্রতিক্রিয়ায় ডান পায়ে বল জালে পাঠান। ক্রোকম্বকে ফাঁকি দিয়ে বল যায় নিচের বাঁ কোণে। স্কোরলাইন হয় ১-১।
ইরানের সমতার পর গ্যালারির এক অংশ থেকে দুয়ো শোনা যায়। তবে একই সঙ্গে ইরানি সমর্থকদের উল্লাসও বাড়তে থাকে। শেষ ১০ মিনিটে তাদের সমর্থন আরও জোরালো হয়।
৩৮ মিনিটে নিউজিল্যান্ড খেলার গতি কিছুটা কমিয়ে পেছন থেকে ধৈর্য ধরে আক্রমণ গড়ার চেষ্টা করে। ৪৪ মিনিটে ইরানি রক্ষণ কাকাচেকে ফাউল করলে বক্সের বাইরে থেকে ফ্রি-কিক পায় নিউজিল্যান্ড। ৪৫ মিনিটে উডের নিচু শট সরাসরি বেইরানভান্দের হাতে যায়।
প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে আরও কয়েকটি ঘটনা ঘটে। ৪৫+১ মিনিটে দূর থেকে শট নেন ম্যাককোয়াট, তবে সেটি ছিল দুর্বল। ৪৫+৩ মিনিটে লং থ্রো থেকে পেছন ঘুরে ফ্লিক করার চেষ্টা করেন মোগানলু, বল জালের ওপর দিয়ে যায়। ৪৫+৫ মিনিটে প্রায় এগিয়ে গিয়েছিল ইরান। প্রায় ৪০ মিটার দূর থেকে নেওয়া ফ্রি-কিকে হেড করেন নেমাতি। বল জালে গেলেও অফসাইডের পতাকায় থেমে যায় ইরানের উদযাপন।
প্রথমার্ধ শেষ হয় ১-১ সমতায়। শুরুতে ইরানের উচ্চ প্রেস, নিউজিল্যান্ডের পাল্টা আঘাত এবং পরে রেজাইয়ানের গোলে ম্যাচ তখনই জমে ওঠে।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেও আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণ চলতে থাকে। ৪৬ মিনিটে তারেমির দিকে পাঠানো লম্বা বল দারুণভাবে ক্লিয়ার করেন ফিন সারম্যান। ৪৭ মিনিটে দূর থেকে শট নেন উড, তবে বল পোস্টের বাইরে দিয়ে যায়। ৪৯ মিনিটে রেজাইয়ানের কর্নার হেড করে ফেরান সারম্যান। ফিরতি আক্রমণে ঘায়েদির শটও আটকে যায়।
৫১ মিনিটে ডান দিক থেকে বাঁ পায়ের কার্লিং শট নেন মোগানলু, কিন্তু বল দূরের পোস্টের বাইরে দিয়ে যায়। ৫৩ মিনিটে প্রথম পরিবর্তন আনে ইরান। মোগানলুর জায়গায় নামেন আলি আলিপুর।
এর এক মিনিট পরই আবার এগিয়ে যায় নিউজিল্যান্ড। ৫৪ মিনিটে দ্রুত পাল্টা আক্রমণে উডের পাস ধরে ডান দিক দিয়ে বক্সে ঢোকেন জাস্ট। সামনে এগিয়ে আসা বেইরানভান্দের ওপর দিয়ে তুলে দেন বল। সেটি জালে জড়ালে ম্যাচে নিজের দ্বিতীয় গোল পান জাস্ট, আর নিউজিল্যান্ড এগিয়ে যায় ২-১ ব্যবধানে।
গোলের পর কিছুটা ধাক্কা খেলেও দ্রুত আক্রমণে ফেরে ইরান। ৫৭ মিনিটে বাঁ দিক থেকে ক্রস পেয়ে হেড নেন তারেমি। ক্রোকম্ব এগিয়ে এসে প্রথম হেড ঠেকান। বল কাছেই থাকা মোহেব্বির দিকে যাচ্ছিল, কিন্তু আবারও ঝাঁপিয়ে বিপদ দূর করেন নিউজিল্যান্ড গোলরক্ষক। পরে অফসাইডের বাঁশি বাজে।
৬০ মিনিটের পর ম্যাচ আরও উন্মুক্ত হয়ে যায়। নিউজিল্যান্ড তখন বল ছাড়া অপেক্ষা করে দ্রুত আক্রমণে যাওয়ার কৌশল নেয়। ইরান বারবার চাপ বাড়াতে থাকে। ৬৪ মিনিটে সেই চাপের ফল পায় তারা। ডান দিক থেকে রেজাইয়ানের ক্রসে দারুণ হেড করেন মোহেব্বি। বল যায় গোলের নিচের বাঁ কোণে। স্কোরলাইন ২-২।
গোলের পর ইরানি সমর্থকেরা আবারও গর্জে ওঠেন। ৬৫ মিনিটে ঘোদ্দোসের জায়গায় এহসান হাজসাফিকে নামায় ইরান। ৬৯ মিনিটে ক্রোকম্বের চিকিৎসার সময় কুলিং ব্রেক হয়। নিউজিল্যান্ডও তখন পরিবর্তনের প্রস্তুতি নেয়।
শেষ ২০ মিনিটে ম্যাচে শারীরিক লড়াই বাড়তে থাকে। ৭৫ মিনিটের দিকে ইরান আক্রমণে ঝাঁপিয়ে পড়ছিল, আর নিউজিল্যান্ড তুলনামূলক ধৈর্য ধরে শেষ তৃতীয়াংশে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিচ্ছিল। ৭৮ মিনিটে টিম পেইনের জায়গায় কালান এলিয়টকে নামায় নিউজিল্যান্ড।
৮০ মিনিটে ডান দিক থেকে আসা ক্রসে হেড করেন তারেমি, কিন্তু বল অনেক ওপর দিয়ে যায়। এরপরই তাকে তুলে নিয়ে আমিরহোসেইন হোসেইনজাদেহকে নামায় ইরান।
৮৩ মিনিটে উডের সঙ্গে সংঘর্ষে মুখে আঘাত পান খালিলজাদে। ৮৫ মিনিটে বক্সের বাইরে থেকে শট নেন এজাতোলাহি, কিন্তু বল ক্রসবারের অনেক ওপর দিয়ে যায়। ৮৭ মিনিটে বাঁ দিক থেকে কার্লিং শট নেন মোহেব্বি, তবে সেটি সরাসরি ক্রোকম্বের হাতে যায়।
৮৯ মিনিটে খারাপ ফাউলের জন্য হলুদ কার্ড দেখেন হাজসাফি। একই মিনিটে কর্নার পায় ইরান। বাঁ দিক থেকে আসা কর্নারের পর বল বক্সের ডান পাশে পড়ে, কিন্তু শেষ শটটি ঠিকমতো নিতে পারেনি তারা। দ্রুত বল ক্লিয়ার করে পাল্টা আক্রমণের চেষ্টা করে নিউজিল্যান্ড।
যোগ করা সময় ছিল পাঁচ মিনিট। ৯০+৩ মিনিটে বাঁ দিক থেকে ক্রস পেয়ে বল লক্ষ্যে পাঠানোর চেষ্টা করেন উড। তবে তার চেষ্টা সহজেই ধরে ফেলেন বেইরানভান্দ। ৯০+৪ মিনিটে শেষবারের মতো কর্নার পায় ইরান। বাঁ দিক থেকে উড়ে আসা বলে দূরের পোস্টে হেড করেন একজন ইরানি খেলোয়াড়। বল আবার গোলমুখে ফিরছিল, কিন্তু থমাস পেছনের দিকে হেড করে বিপদ সরিয়ে দেন। আর কোনো ইরানি খেলোয়াড় বল ছুঁতে পারেননি।
যোগ করা সময়ের ষষ্ঠ মিনিটে শেষ বাঁশি বাজে। ২-২ ড্র নিয়েই শেষ হয় ইরান-নিউজিল্যান্ডের রোমাঞ্চকর লড়াই।
উল্লেখ্য, ম্যাচের আগে ফর্মে এগিয়ে ছিল ইরান। শেষ পাঁচ ম্যাচে তাদের ফর্ম ছিল জয়-জয়-জয়-হার-ড্র। মালি, গাম্বিয়া ও কোস্টারিকার বিপক্ষে শেষ তিন প্রীতি ম্যাচ জিতেছিল তারা। অন্যদিকে নিউজিল্যান্ডের ফর্ম ছিল হার-হার-হার-হার-ড্র। ২০২৫ সালের জুনে আইভরি কোস্টের বিপক্ষে ১-০ গোলে জয়ের পর আর কোনো ম্যাচ জেতেনি তারা।