ঢাকা ২৬ জুলাই, ২০২৬
সংবাদ শিরোনাম
পদ্মায় বিলীন শত শত বিঘা জমি আবার করোনা পাবনায় স্বাস্থ্যকর্মীসহ আক্রান্ত ৮ জন সিরিয়ায় দুই বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষ, নিহত অন্তত ৩৫ দেশের ১২ অঞ্চলে বজ্রবৃষ্টির আভাস, নদীবন্দরে সতর্কসংকেত গ্যাসসংকটে বন্ধ হচ্ছে কারখানা ইসরায়েলের বিরোধিতার মুখে আবার মানবাধিকার প্রধান হলেন ফলকার টুর্ক মাকে হারালেন অস্কারজয়ী অভিনেতা দুই ভাই সিটির সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে উজবেক ডিফেন্ডা পরপর দুই জরিপে এগিয়ে, ব্রাজিলের প্রেসিডেন্টের দৌড়ে শীর্ষে লুলা দাঁড়িয়ে থাকা বিকল ট্রাকে ধাক্কা, যাত্রীবাহী বাসের ১০ যাত্রী আহত

পদ্মায় বিলীন শত শত বিঘা জমি

#

নিজস্ব প্রতিনিধি

২৬ জুলাই, ২০২৬,  9:03 AM

news image

পদ্মা নদীর ভাঙনে কয়েক দফায় ১০ বিঘার মতো জমি হারিয়েছেন ইব্রাহিম আলী। বাকি ছিল ১০ শতকের মতো জমি। গত কয়েকদিনের ভাঙনে সেই জমিও গেছে। গতকাল শনিবার আফসোসের সুরে কথাগুলো বলছিলেন কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার কোলদিয়াড় গ্রামের ইব্রাহিম। এই চাষি এখন পুরোপুরি নিঃস্ব।


টানা বর্ষণ ও উজানের ঢলে দৌলতপুর দিয়ে প্রবাহিত পদ্মা নদীসহ মাথাভাঙ্গা ও হিসনা নদীর পানি বাড়ছে ক্রমাগত। সেই সঙ্গে নদীসংলগ্ন অন্তত চারটি জায়গায় দেখা দিয়েছে তীব্র ভাঙন। দুই সপ্তাহের ব্যবধানে উপজেলার মরিচা ইউনিয়নের ভূরকা-হাটখোলা, কোলদিয়াড়, মাজদিয়াড় ও ফয়জুল্লাহপুরসহ প্রায় দুই কিলোমিটার এলাকায় শত শত বিঘা জমি হারিয়েছেন চাষিরা। আরও শত শত বিঘা জমি নিয়ে ঝুঁকিতে আছেন তারা। দিশেহারা হয়ে পড়েছেন ইব্রাহিমের মতো হাজারো মানুষ।


স্থানীয় কৃষক ও প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, গত ১৫-২০ দিনের মধ্যে পদ্মার ভাঙনে কোলদিয়াড় থেকে পাশের ভেড়ামারা উপজেলার জুনিয়াদহ পর্যন্ত এলাকায় শতাধিক একরেরও বেশি আবাদি জমি নদীতে বিলীন হয়েছে। চলতি মৌসুমে বিস্তীর্ণ মাঠের পাট, আম-কাঁঠালের বাগানসহ নানা মৌসুমি ফসলসহ জমি হারিয়েছেন কয়েকশ কৃষক।


একসময় যাদের ছিল সুখের সংসার, ক্ষেতভরা ফসল আর গোলাভরা ধান, সর্বনাশা পদ্মা নদীর থাবায় তারা সর্বস্বান্ত। তাদের চোখে-মুখে শুধু বিষাদের ছায়া, অনিশ্চয়তার ছাপ। সবার মনে একটাই প্রশ্ন, ফসলি জমির মতো ভিটেমাটিও কি চলে যাবে নদীর পেটে?



কোলদিয়ার গ্রামের রফিকুল ইসলাম তাঁর দুর্দশার কথা জানিয়ে বলেন, ‘আমাদের মোট ৭ বিঘা জমি নদীতে তলিয়ে গেছে। গত দুই সপ্তাহের তাণ্ডবেই হারিয়েছি প্রায় এক বিঘা জমি।’ বাড়িটি ছাড়া এখন আর তাঁর কিছুই নেই। সেই বাড়িও ভাঙনের ঝুঁকিতে আছে। 


নদী ভাঙনে ২০ বিঘারও বেশি জমি হারানো ভূরকাপাড়া গ্রামের মহাবুল ইসলাম বলেন, এখন তাঁর শুধু মাথা গোঁজার শেষ সম্বল বসতবাড়িই অবশিষ্ট আছে। এভাবে ভাঙন চলতে থাকলে খুব শিগগির সেটিও হারিয়ে পথের ফকির হতে হবে তাঁকে। 


গতকাল শনিবার নদীতীরে দাঁড়িয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে মর্জিনা খাতুন বলেন, ‘অনেক কষ্ট করে এই মাঠে ১৪ বিঘা জমি করেছিলাম। পদ্মার গ্রাসে সব শেষ হয়ে গেল! আমার ঘরে কর্মক্ষম স্বামী ও তিন সন্তানসহ মোট পাঁচজনের সংসার। তীব্র অভাবে কষ্টের মধ্যে দিন কাটছে।’ সরকারের কাছে তাদের একটাই আকুতি, অন্তত বসতবাড়িটুকু রক্ষার ব্যবস্থা করা হোক।


একইভাবে নদীতীরে এসে অসহায়ের মতো আকুতি জানাচ্ছিলেন বিউটি খাতুন, শুকরুন্নেসা, তবারক হোসেন ও আব্দুল রশিদসহ অনেকে। এদের কারও ভেঙেছে ২৫ বিঘা, কেউ কেউ হারিয়েছেন ১০ বিঘা, কারও গেছে ৪-৫ বিঘা জমি। 


ভূরকাপাড়া গ্রামের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক আতর আলী বলেন, প্রতিদিন চোখের সামনেই নদীতে বিলীন হচ্ছে জমি। শত শত কৃষক আজ পথে বসেছেন। তাই তারা সাময়িক দয়া নয়, নদীভাঙন থেকে এলাকা রক্ষায় সিমেন্টের স্থায়ী ব্লকের বাঁধ চান।


একই এলাকার জাকির হোসেন বলেন, ভূরকাপাড়ার সামান্য একটি অংশে বালিভর্তি জিও ব্যাগ ফেলায় সেখানে ভাঙন কিছুটা কম। কিন্তু কোলদিয়াড়, হাটখোলাপাড়া হয়ে রায়টা পর্যন্ত বিশাল এলাকা সম্পূর্ণ অরক্ষিত। প্রতিদিন জমি ভেঙে নদীতে তলিয়ে যাচ্ছে।


বিদ্যুৎলাইনও ঝুঁকিতে

পদ্মার তীব্র ভাঙনে জাতীয় ও স্থানীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ একাধিক অবকাঠামো ভয়াবহ ঝুঁকিতে পড়েছে। নদীভাঙনের সীমানার মাত্র ৫০০ ফুট দূরে রয়েছে ভারত থেকে আসা ৫০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার জাতীয় বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন। যে কোনো সময় সঞ্চালন টাওয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে বড় বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ ছাড়া নদীর ঢেউ সরাসরি আঘাত হানছে ঐতিহ্যবাহী রায়টা-মহিষকুণ্ডি বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ওপর। ঝুঁকির মুখে রয়েছে নদী ভরাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ভূরকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কোলদিয়াড় কান্দিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কোলদিয়াড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কোলদিয়াড় মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও জুনিয়াদহ মাধ্যমিক বিদ্যালয়। একই সঙ্গে হাটখোলাপাড়া জামে মসজিদ, জুনিয়াদহ বাজার এবং ভূরকা, কোলদিয়াড়, জুনিয়াদহ ও কোলদিয়াড় পূর্বপাড়াসহ কয়েকটি পুরো গ্রামের বাসিন্দারা সব হারানোর ঝুঁকিতে আছেন।


মরিচা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সাবেক চেয়ারম্যান সাইদুর রহমানের ভাষ্য, পদ্মা এখন আর ফসলের মাঠে সীমাবদ্ধ নেই, এটি সরাসরি বাঁধের নিচে চলে এসেছে। এখনই জরুরি পদক্ষেপ না নিলে বিস্তীর্ণ গ্রাম ও শত শত ঘরবাড়ি রক্ষা করা সম্ভব হবে না।


সাম্প্রতিক ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত জমির প্রকৃত তথ্য নেই পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) কাছে। কুষ্টিয়া পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদুর ইসলাম বলেন, পাউবোর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সম্প্রতি ভাঙনকবলিত অঞ্চল পরিদর্শন করেছেন। ভাঙন ঠেকাতে জরুরি আপৎকালীন কাজ ও ভবিষ্যতে নদীর গতিপথ স্থায়ীভাবে নিয়ন্ত্রণে প্রাক্কলন তৈরি করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। প্রশাসনিক অনুমোদন ও বাজেট পাওয়া মাত্রই কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


পরিদর্শনে এমপি, সচিবকে ফোন

এদিকে পদ্মাতীরে ভাঙনের তথ্য পেয়ে গতকাল শনিবার বেলা ১১টার দিকে পরিদর্শনে যান কুষ্টিয়া-১ (দৌলতপুর) আসনের সংসদ সদস্য রেজা আহমেদ বাচ্চু মোল্লা। এ সময় ভূরকা, কোলদিয়াড়সহ নদীপারের শত শত নারী-পুরুষ তাদের দুর্ভোগের কথা জানান। সেখান থেকেই পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিবের নম্বরে কল করেন সংসদ সদস্য। তিনি ভাঙনের ভয়াবহতা তুলে ধরে আপৎকালীন জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানান। পাশাপাশি সাময়িকভাবে জিও ব্যাগ ও টিউব ফেলার জন্য বিশেষ বরাদ্দের আহ্বান জানান।


সংসদ সদস্য রেজা আহমেদ বাচ্চু মোল্লা বলেন, দৌলতপুর অঞ্চলে পদ্মা নদীর ভাঙন রোধে স্থায়ী প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণে প্রস্তাবনা তৈরি করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর সঙ্গে কয়েক দফায় কথা হয়েছে। তিনি আশ্বস্তও করেছেন। বর্তমান জরুরি পরিস্থিতিতে আড়াই-তিন কোটি টাকার বাজেট চেয়েছেন। টেকসই নদী শাসনের মাধ্যমে স্থায়ী সমাধানের দাবি সরকারের উচ্চপর্যায়ে তুলে ধরছেন। সূত্র : দৈনিক সমকাল


logo

সম্পাদক ও প্রকাশক : মো. নজরুল ইসলাম