ঢাকা ২৮ জানুয়ারি, ২০২৬
সংবাদ শিরোনাম
আসন্ন নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান স্পষ্ট করলেন নতুন মার্কিন রাষ্ট্রদূত কেউ উসকানিমূলক কথাবার্তা ও কর্মকাণ্ডে পা দেবেন না : মির্জা আব্বাস ৭ম গগণবিজ্ঞপ্তিতে সুপারিশপ্রাপ্তদের ১১ দফা নির্দেশনা দিলো এনটিআরসিএ জুলাই আন্দোলনকারীরাই একদিন বিশ্বে নেতৃত্ব দেবে: প্রধান উপদেষ্টা খালেদা জিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা জানাবে ভারতের রাজ্যসভা ৫০তম বিসিএসের প্রিলিমিনারি পরীক্ষা স্থগিত চেয়ে রিট দেশের ৮ জেলায় বৃষ্টির আভাস গোপালগঞ্জে বাসু হত্যা: ৫ জনের মৃত্যুদণ্ড, ৪ জনের আমৃত্যু কারাদণ্ড মিরসরাইয়ে ট্রাক-সিএনজি সংঘর্ষে নিহত ২ পথচারী ইউক্রেনে যাত্রীবাহী ট্রেনে রাশিয়ার হামলা, নিহত ১২

নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি: আস্থা পেতে মিথ্যা আশ্বাস নয়

#

২৭ জানুয়ারি, ২০২৬,  10:59 AM

news image

ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, যা মানুষের ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনের প্রতিটি দিককে সুশৃঙ্খল ও নৈতিকতার আলোকে পরিচালিত করার নির্দেশনা দেয়। ইসলামের অন্যতম মৌলিক নীতি হলো সত্যবাদিতা। সত্য শুধু নৈতিক গুণ নয়, বরং এটি ঈমানের অপরিহার্য অংশ। এর বিপরীতে মিথ্যা বলা, প্রতারণা করা ও জেনেশুনে মিথ্যা আশ্বাস দেওয়া ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।

বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায়, বিশেষত নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক নেতাদের পক্ষ থেকে জনগণকে দেওয়া মিথ্যা ও অবাস্তব প্রতিশ্রুতির বিষয়টি শরিয়তের দৃষ্টিতে অত্যন্ত গুরুতর পাপ হিসেবে বিবেচিত।

ইসলামে সত্যবাদিতার গুরুত্ব

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বহু স্থানে সত্য বলার নির্দেশ দিয়েছেন এবং মিথ্যাবাদীদের নিন্দা করেছেন। আল্লাাহ বলেন, ‘হে মুমিনরা! আল্লাহকে ভয় করো এবং সত্যবাদীদের সঙ্গে থাকো।’ (সুরা : তাওবা, আয়াত : ১১৯)

এই আয়াত স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে সত্যবাদিতা শুধু ব্যক্তিগত গুণ নয়, বরং এটি একটি সম্মিলিত সামাজিক দায়িত্ব।

রাজনীতি যেহেতু সমাজ পরিচালনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম, তাই সেখানে সত্যের গুরুত্ব আরো বেশি।

আরেক আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘মিথ্যা রটনা তো তারাই করে, যারা আল্লাহর আয়াতগুলোতে বিশ্বাস করে না।’

(সুরা : নাহল, আয়াত : ১০৫)

আয়াত থেকে বোঝা যায়, মিথ্যা বলা ঈমানের দুর্বলতার পরিচায়ক।

প্রতিশ্রুতি আমানত

ইসলামে প্রতিশ্রুতি দেওয়া এবং তা রক্ষা করা আমানততুল্য।

তাই কোনো প্রতিশ্রুতি দিলে তা রক্ষা করা আবশ্যক। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর তোমরা অঙ্গীকার পূর্ণ কোরো; নিশ্চয়ই অঙ্গীকার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।’ (সুরা : বনি ইসরাঈল, আয়াত : ৩৪)

নির্বাচনের সময় রাজনৈতিক নেতারা জনগণের কাছে যেসব প্রতিশ্রুতি দেন তা শুধু কথার কথা নয়, বরং তা একটি অঙ্গীকার, যার জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে জবাবদিহি করতে হবে।

মিথ্যা আশ্বাসের ভয়াবহতা

রাসুলুল্লাহ (সা.) মিথ্যা বলা ও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করাকে মুনাফিকির সুস্পষ্ট আলামত হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘মুনাফিকের লক্ষণ তিনটি : যখন কথা বলে মিথ্যা বলে, যখন প্রতিশ্রুতি দেয় তা ভঙ্গ করে এবং যখন আমানত রাখা হয় খিয়ানত করে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩৪)

হাদিস অনুসারে নির্বাচনের আগে জেনেশুনে মিথ্যা আশ্বাস দেওয়া একজন মুসলিমের চরিত্রের সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক। এতে মিথ্যা বলা ও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করার গুনাহ হয়।

অন্য হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করল, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৯৪)

জনগণের ভোট লাভের জন্য মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেওয়া নিঃসন্দেহে প্রতারণার অন্তর্ভুক্ত।

নেতৃত্ব ও ক্ষমতার জবাবদিহি

ইসলামে রাজনৈতিক নেতৃত্ব কোনো সম্মান বা ভোগের বস্তু নয়, বরং এটি একটি কঠিন দায়িত্ব ও আমানত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা অতি সত্বর নেতৃত্বের লোভ করবে। (স্মরণ রেখো) এটি কিয়ামতের দিন অনুতাপের কারণ হবে। সুতরাং (পার্থিব জীবনে) তা কত উত্তম ও (পরকালে) নিকৃষ্ট বিষয়!’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৭১৪৮)

অতএব, নেতৃত্ব লাভের উদ্দেশ্যে যদি কেউ মিথ্যা আশ্বাস দেয়, তাহলে সে পরকালে লজ্জিত হবে।

মিথ্যা প্রতিশ্রুতির রাজনৈতিক ক্ষতি

রাজনৈতিক মিথ্যা আশ্বাস শুধু ব্যক্তিগত গুনাহ নয়, বরং এর সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষতিও ব্যাপক। কেননা এর ফলে—

১. জনগণের মধ্যে নেতৃত্বের ওপর আস্থা নষ্ট হয়।

২. ন্যায় ও ইনসাফের পরিবর্তে প্রতারণার সংস্কৃতি গড়ে ওঠে।

৩. সমাজে হতাশা ও অবিশ্বাস বৃদ্ধি পায়।

৪. রাজনীতিকে মানুষ গুনাহের পেশা মনে করতে শুরু করে।

আর ইসলাম কখনোই এমন সমাজব্যবস্থা সমর্থন করে না, যেখানে মিথ্যা ও প্রতারণা স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হয়।

শরিয়তের দৃষ্টিতে নির্বাচনী মিথ্যা আশ্বাস

ওপরের আলোচনা থেকে প্রমাণিত হয় যে যদি কোনো রাজনৈতিক নেতার অন্তরে এই বিশ্বাস থাকে যে তিনি তাঁর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করবেন না অথবা করার সক্ষমতা ও ইচ্ছা নেই, তবু যদি তিনি তা জনগণের আস্থা অর্জন করতে এবং ভোট পেতে মিথ্যা আশ্বাস দেন, তবে শরিয়তের দৃষ্টিতে তা স্পষ্ট হারাম। কেননা এটি মিথ্যা, প্রতারণা, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ ও আমানতের খিয়ানত ইত্যাদি গুনাহের পরিমণ্ডিত। তবে যদি কেউ সদিচ্ছা নিয়ে, বাস্তব সক্ষমতার ভিত্তিতে প্রতিশ্রুতি দেন এবং পরে অনিচ্ছাকৃত বাধার কারণে তা পূরণ করতে না পারেন তাহলে তাঁর গুনাহ হবে না।

একজন মুসলিম রাজনীতিবিদের উচিত সত্যবাদিতা, স্বচ্ছতা ও বাস্তবতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া। ইসলাম এমন নেতৃত্ব চায়, যারা কম কথা বলবে, কিন্তু সত্য বলবে; যারা প্রতিশ্রুতি কম দেবে, কিন্তু তা রক্ষা করবে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সত্যের ওপর অবিচল থাকার এবং আমানত সঠিকভাবে আদায়ের তাওফিক দান করুন। আমিন।

logo

সম্পাদক ও প্রকাশক : মো. নজরুল ইসলাম