NL24 News
১১ মার্চ, ২০২৬, 10:50 AM
গুনাহ মাফের দিন শুরু
আমরা সবাই মৃত্যুর দিকে এগোচ্ছি। আর মৃত্যুর পর মুখোমুখি হতে হবে অনন্ত পরকালের। সেখানে খোলা হবে আমলনামা তথা আমাদের জীবনের হিসাবের খাতা। ছোট-বড়, জানা-অজানা সব গুনাহের হিসাব মিলবে। সেই কঠিন হিসাবের খাতা থেকে গুনাহগুলোকে পুড়িয়ে ফেলতেই এই রমজান। রমজান শব্দের আভিধানিক অর্থই ‘উত্তাপ’, ‘তাপের উচ্চমাত্রা’ বা ‘পুড়িয়ে দেওয়া’। ‘রমদ’ ধাতু থেকে এসেছে এই নাম। এ মাস মুমিন বান্দার গুনাহগুলোকে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে মুছে দেওয়ার উপলক্ষ।
হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি ইমানের সঙ্গে এবং সওয়াবের আশায় রমজানের রোজা পালন করবে, তার পূর্বের গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে। (সহিহ বুখারি: ৩৮; সহিহ মুসলিম: ৭৬০)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তিন শ্রেণির মানুষের জন্য ধ্বংস। তার এক শ্রেণি যারা রমজান পেল, কিন্তু এই মাসে নিজেদের গুনাহগুলো মাফ করাতে পারল না।
রমজানকে তাই বলা যায়, গুনাহগার বান্দাদের গুনাহ পুড়িয়ে শুদ্ধ করার মাস। শেষ দশক এখানে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে। রাসুলুল্লাহ (সা.) শেষ দশকে ইতিকাফ করতেন। প্রয়োজন ছাড়া মসজিদ থেকে বের হতেন না। রাতের ইবাদতে এত শ্রম দিতেন, যা অন্য সময় দেখা যেত না। (মুসলিম: ১১৭৫)
রাসুল (সা.) পুরো রাত ইবাদতেই কাটাতেন। কারণ, এই দশকে লুকিয়ে আছে লাইলাতুল কদর। লাইলাতুল কদরের মহিমা কোরআনে বলা হয়েছে, ‘কদরের রাত হাজার মাসের চেয়েও শ্রেষ্ঠ।’ (সুরা কদর, আয়াত: ৩)
এই রাতে একবার ইবাদত করলে কমপক্ষে ৮৩ বছর চার মাসের ইবাদতের সমান সওয়াব লাভ হয়। মুসলিমের জন্য এটি জীবনের শ্রেষ্ঠ সুযোগ। পবিত্র এই মাসে পুরোনো গুনাহগারের জন্য গুনাহ মাফের শেষ হাতিয়ার। একটি হাদিসে বলা হয়েছে, লাইলাতুল কদর রমজানের শেষ ১০ দিনের বিজোড় রাতগুলোর মধ্যে লুকিয়ে থাকে। তাই নবী (সা.) শেষ দশকে কঠোর পরিশ্রম করতেন।
ইতিকাফের গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে ইবনে ওমর (রা.) বলেন, নবীজি (সা.) রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফ করতেন। (মুসলিম, হাদিস: ১১৭২)
ইতিকাফ মানে মসজিদে অবস্থান করে আল্লাহর ইবাদতে মগ্ন থাকা। প্রয়োজন ছাড়া বের না হওয়া। এতে গুনাহ থেকে দূরে থাকা সহজ হয়। অন্তর শুদ্ধ হয়। লাইলাতুল কদর খোঁজার সবচেয়ে বড় মাধ্যম ইতিকাফ।
রমজানে গুনাহ থেকে বাঁচার চেষ্টা রমজান শুধু রোজা রাখা নয়; গুনাহ থেকে বাঁচারও মাস। শিরক, রিয়া, নামাজে অবহেলা, গিবত, পরনিন্দা, অহংকার, মানুষের হক নষ্ট করা, সুদ-ঘুষ-অশ্লীলতা ইত্যাদি সব গুনাহ থেকে বাঁচার চেষ্টা সবচেয়ে জরুরি। আল্লাহতায়ালা বলেছেন, ‘প্রকাশ্য ও গোপন গুনাহ পরিত্যাগ করো।’ (সুরা আনআম, আয়াত: ১২০)
রমজানে গুনাহ থেকে বাঁচলে আল্লাহ গুনাহ পুড়িয়ে দেন। রমজানের শেষে পয়লা শাওয়াল ঈদুল ফিতর। শাওয়ালের চাঁদরাত ঈদের রাত। ইসলামে যে রাতগুলো ইবাদত ও ফজিলতে পরিপূর্ণ, এর অন্যতম এই রাত। নবীজি (সা.) ও সাহাবায়ে কেরাম (রা.) এ রাতে গুরুত্বসহকারে ইবাদত করতেন। চাঁদ দেখা সুন্নত। চাঁদ দেখলে বা সংবাদ নিশ্চিত হলে দোয়া পড়া সুন্নত। (তিরমিজি: ৩৪৫১)
রমজান কেবল একটি মাস নয়; এটি গুনাহের আগুন নিভিয়ে ফেলার মাস। অন্তর শুদ্ধ করার মাস। আল্লাহর কাছে ফিরে যাওয়ার মাস। নেক আমল যেমন দরকার, গুনাহ থেকে বাঁচাও তেমনি জরুরি। শেষ দশকের রাত জাগরণ, ইতিকাফ, লাইলাতুল কদর– এসবের মাধ্যমে গুনাহ মাফের শেষ সুযোগ। আল্লাহ আমাদের এই রমজানে গুনাহ মাফের তৌফিক দিন। আমাদের অন্তরকে শুদ্ধ করুন। আমাদের জীবনকে নেক আমলে ভরিয়ে দিন।
লেখক: খতিব, বিয়াম ফাউন্ডেশনসংলগ্ন মসজিদ, ঢাকা; অধ্যক্ষ, জামিআ ইসলামিয়া ঢাকা