দ্রুত এগোনোর প্রতিযোগিতায় নিরাপত্তা উপেক্ষা, ওপেনএআইকে নিয়ে নতুন উদ্বেগ
স্পোর্টস ডেস্ক
০৪ নভেম্বর, ২০২৬, 11:19 AM
স্পোর্টস ডেস্ক
০৪ নভেম্বর, ২০২৬, 11:19 AM
দ্রুত এগোনোর প্রতিযোগিতায় নিরাপত্তা উপেক্ষা, ওপেনএআইকে নিয়ে নতুন উদ্বেগ
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠান ওপেনএআইয়ের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়ে বহু বছর ধরেই উদ্বেগ জানিয়ে আসছিলেন প্রতিষ্ঠানটির কর্মীরা। তাদের আশঙ্কা ছিল, দুর্বল নিয়ন্ত্রণের সুযোগ নিয়ে বিদেশি সরকারসহ বাইরের পক্ষগুলো সহজেই প্রতিষ্ঠানটির গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত তথ্য হাতিয়ে নিতে পারে।
তবে কর্মীদের অভিযোগ, প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দ্রুত এগিয়ে যাওয়ার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়ায় নিরাপত্তার বিষয়টি দীর্ঘদিন যথাযথ গুরুত্ব পায়নি। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে পাঁচটি সূত্রের বরাত দিয়ে এসব তথ্য জানানো হয়েছে। সূত্রগুলো ওপেনএআইয়ের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাব্যবস্থা সম্পর্কে অবগত। তাদের ভাষ্য, চ্যাটজিপিটি চালুর আগেই কর্মীরা প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নেতৃত্ব ও পরিচালনা পর্ষদের কাছে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওপেনএআইয়ের অধিকাংশ কোড একটি বড় সংগ্রহশালায় রাখা হতো, প্রযুক্তি খাতে যাকে ‘মনোরেপো’ বলা হয়। প্রতিষ্ঠানের কোডে প্রবেশাধিকার থাকা কর্মীরা নিজেদের কাজের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়- এমন অনেক প্রকল্পের প্রযুক্তিগত বিবরণও দেখতে পারতেন। গবেষণাসংক্রান্ত নথির বড় অংশ গিটহাব ও স্ল্যাকের মতো প্ল্যাটফর্মে সংরক্ষিত থাকায় সেগুলো থেকেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বের করে নেওয়ার আশঙ্কা ছিল।
কর্মীদের উদ্বেগ ছিল, অতীতে বিপুল পরিমাণ কোড ও নথি মানুষের পক্ষে ঘেঁটে দেখা কঠিন হলেও এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা বা এআই এজেন্ট দ্রুত এসব তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারে। ফলে অভ্যন্তরীণ তথ্যের বিস্তৃত প্রবেশাধিকার নতুন ধরনের নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি করছে।
তবে ওপেনএআই বলেছে, তাদের সবচেয়ে সংবেদনশীল কাজের বড় অংশ আলাদা কোড সংগ্রহশালায় রাখা হয় এবং সেখানে কঠোর প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। মনোরেপোতে প্রতিষ্ঠানের সব কোড কিংবা মডেল পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, যেমন মডেল ওয়েটস, সংরক্ষিত নেই বলেও জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পর্যালোচনার ঘাটতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কর্মীরা। তিনটি সূত্রের ভাষ্য, গবেষকেরা নতুন মডেল পরীক্ষা করার জন্য যেসব অভ্যন্তরীণ পরিবেশ বা স্যান্ডবক্স ব্যবহার করতেন, সেগুলোর নিয়মিত নিরাপত্তা পর্যালোচনা করা হতো না। কর্মীরা নিজেদের প্রয়োজনে এসব ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনলেও সেগুলো সব সময় নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে পরীক্ষা করা হতো না। এতে বাইরের পক্ষের আক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হতে পারত।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে নিরাপত্তা জোরদারে পদক্ষেপ নিয়েছে ওপেনএআই। পণ্য উন্নয়ন বিভাগের জ্যেষ্ঠ নির্বাহী থিবো সোতিও সম্প্রতি অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা উদ্যোগের দায়িত্ব নিয়েছেন। রয়টার্সের এক সূত্রের দাবি, গত আগস্টে তিনি প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন প্রকৌশলীদের প্রায় এক-চতুর্থাংশকে নিরাপত্তা অবকাঠামো উন্নয়নের কাজে পুনর্বিন্যাস করেন। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, এখন তাদের অভ্যন্তরীণ প্রযুক্তি সরঞ্জাম নিয়মিত নিরাপত্তা পর্যালোচনার আওতায় আনা হচ্ছে।
ওপেনএআইয়ের মুখপাত্র এলানা উইডম্যান বলেন, প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বের সবচেয়ে বেশি লক্ষ্যবস্তু হওয়া সংস্থাগুলোর একটি। অভ্যন্তরীণ ব্যক্তি, সাইবার অপরাধী এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রের সম্ভাব্য হামলা মোকাবিলায় তারা নিরাপত্তা কর্মসূচিতে ব্যাপক বিনিয়োগ করছে। প্রযুক্তি, তথ্য ও কর্মীদের সুরক্ষা তাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
সম্প্রতি ওপেনএআইয়ের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে একটি গোপন রেকর্ডিং যন্ত্র উদ্ধারের ঘটনায়। গত ১৩ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ জানায়, প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী কর্মকর্তাদের একটি সম্মেলনকক্ষে গোপনে অডিও ধারণের যন্ত্র বসানোর অভিযোগে ৩৫ বছর বয়সী সৌদি নাগরিক আবদুর রহমান আলফোজানকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনি ওই সময় ওপেনএআইয়ের প্রকৌশলী ছিলেন।
আদালতের নথি অনুযায়ী, আলফোজান ওপেনএআইয়ের কর্মীদের জন্য তৈরি একটি এআই সরঞ্জাম ব্যবহার করে সৌদি আরব সফরে যাওয়া প্রতিষ্ঠানের নির্বাহীদের বিষয়ে অভ্যন্তরীণ নথি খুঁজেছিলেন। সৌদি মন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠকে কোন কর্মকর্তারা অংশ নিতে পারেন, সে তথ্যও অনুসন্ধান করেছিলেন তিনি। সৌদি আরবে নতুন একটি এআই উদ্যোগে যোগ দেওয়ার জন্য দেশটির রাজপরিবারের একজন সদস্যের সঙ্গে তাঁর নিয়মিত যোগাযোগ ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া ২০২৩ সালে ওপেনএআইয়ের তৎকালীন এক গবেষক লিওপোল্ড আশেনব্রেনার চীনের পক্ষ থেকে প্রতিষ্ঠানটিতে অনুপ্রবেশের আশঙ্কা নিয়ে একটি অভ্যন্তরীণ স্মারকলিপি লিখেছিলেন। ওই বছরই এক বহিরাগত ব্যক্তি ওপেনএআইয়ের স্ল্যাক চ্যানেলে প্রবেশ করে জিপিটি-৪ মডেলসংক্রান্ত কিছু তথ্য হাতিয়ে নিয়েছিলেন। তবে প্রতিষ্ঠানটির দাবি, ওই ব্যক্তি কেবল সবার জন্য উন্মুক্ত অভ্যন্তরীণ চ্যানেলগুলোতে প্রবেশ করতে পেরেছিলেন।
চলতি বছরের গ্রীষ্মে ওপেনএআইয়ের পরীক্ষাধীন এআই এজেন্টগুলো এআই প্ল্যাটফর্ম হাগিং ফেসের ব্যবস্থায় অনুপ্রবেশ করেছিল। ঘটনাটি যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্তৃপক্ষের নজর কাড়ে। জুলাইয়ে সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান হ্যাকট্রন এআইয়ের তিন গবেষক প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিকের একটি এআই মডেল ব্যবহার করে ওপেনএআইয়ের কয়েকজন কর্মীর চ্যাটজিপিটি অ্যাকাউন্টে প্রবেশের দাবি করেন। তাঁদের দাবি, এর মাধ্যমে ওপেনএআইয়ের কিছু অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার পাওয়া গিয়েছিল।
অন্যদিকে অক্টোবরের শেষ দিকে সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান ক্যাথেড্রাল সিস্টেমস অ্যানথ্রপিকের ব্যবস্থায় অনুপ্রবেশ করে কর্মীদের স্ল্যাক চ্যানেলে প্রবেশের দাবি করে। প্রতিষ্ঠানটির মুখপাত্র জানান, সেখানে কিছু গ্রাহক ও অংশীদারের ব্যবসায়িক যোগাযোগের তথ্য এবং ব্যবহারকারীর মৌলিক অ্যাকাউন্টসংক্রান্ত নথি ছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, এআই খাতে গবেষণার উন্মুক্ত পরিবেশ নতুন উদ্ভাবন ও দক্ষ কর্মী আকর্ষণে সহায়ক হলেও অতিরিক্ত তথ্যপ্রবাহ নিরাপত্তার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। বিশেষ করে এআই এজেন্টের সক্ষমতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অভ্যন্তরীণ তথ্যের বিস্তৃত প্রবেশাধিকার বড় দুর্বলতায় পরিণত হতে পারে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনের বিষয়ে জানতে চাওয়ার পর ওপেনএআই জানায়, নিরাপত্তা জোরদারে তারা নতুন অভ্যন্তরীণ কর্মসূচি শুরু করার পরিকল্পনা করছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, সাম্প্রতিক পদক্ষেপের মাধ্যমে ঝুঁকি শনাক্ত ও প্রতিরোধের সক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে।
তথ্য সূত্র- রয়টার্স