তদন্তের জালে বিসিএসআইআর স্কুলের সাবেক প্রধান শিক্ষক ইদ্রিস আলী
০৫ অক্টোবর, ২০২৬, 4:53 PM
NL24 News
০৫ অক্টোবর, ২০২৬, 4:53 PM
তদন্তের জালে বিসিএসআইআর স্কুলের সাবেক প্রধান শিক্ষক ইদ্রিস আলী
> বাঁচতে মরিয়া তদবির, স্ব-পদে ফিরতে বিভিন্ন দফতরে দৌড়ঝাঁপ
> স্বৈরাচারী আওয়ামীলীগের চিহ্নিত দোসর হয়েও রয়েছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে
> ভুয়া বিল ভাউচারে অর্থ আত্মসাৎ করে গড়ে তুলেছেন অবৈধ সম্পদের পাহাড়
উজ্জল হোসেন: বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (বিসিএসআইআর) স্কুল অ্যান্ড কলেজের সাবেক দুর্নীতিবাজ প্রধান শিক্ষক মো. ইদ্রিস আলীর বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতি, অনিয়ম, আওয়ামীলীগ সরকারের প্রভাব খাটিয়ে একক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, বিভিন্ন ফান্ড পরিচালনায় স্বচ্ছতার অভাব, নিয়োগ ও ভর্তি বাণিজ্যে, বিসিএসআইআর-এর তৎকালীন চেয়ারম্যানের সাথে যোগসাজশে সাধারণ
শিক্ষকদের বাদ দিয়ে নিজের ইচ্ছেমতো ম্যানেজিং কমিটি গঠন এবং ভুয়া বিল ভাউচার করে অর্থ আত্মসাৎ করার মাধ্যমে রাজধানী ঢাকায় একাধিক বিলাস বহুল ফ্ল্যাট, প্লট, বিভিন্ন ব্যাংকে বিপুল পরিমান অর্থ গচ্ছিত বা এফডিআর এবং গ্রামের বাড়ি যশোরে বহুতল বাড়ি, জমিসহ কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ গড়ে তোলার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
এছাড়াও পতিত সরকারের পতনের পরে তিনি শত দুর্নীতি এবং অনিয়মের দ্বায়ে ১৭/০৯/২০২৪ ইং তারিখ বরখাস্ত হলেও পুনরায় স্বপদে ফিরতে বিভিন্ন মহলে জোর তদবির চালিয়ে যাচ্ছেন বলে বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত উঠে এসেছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) সাবেক মেয়র এবং আওয়ামী লীগ নেতা ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপসের অত্যন্ত বিশ্বস্ত ও ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে একাধিক মামলা এবং গ্রেপ্তারের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
৫ আগস্ট ২০২৪-এ শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর তাপসের বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী অনুসারী ও বিশেষ প্রতিনিধি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জালে ধরাও পড়েছেন। কিন্তু ধরাছোঁয়ার বাহিরে রয়ে গিয়েছেন বঙ্গবন্ধু প্রজন্ম লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি এবং বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (বিসিএসআইআর) স্কুল অ্যান্ড কলেজের সাবেক দুর্নীতিগ্রস্ত প্রধান শিক্ষক মো. ইদ্রিস আলী।
যিনি প্রকাশ্য দিবালোকে চাকুরী প্রবিধান ভঙ্গ করে শেখ ফজলে নূর তাপসের বিভিন্ন নির্বাচনী প্রচারনায় সম্মুখ সাড়িতে থেকে নেতৃত্ব প্রদান করেছেন যার প্রমানাদি প্রতিবেদকের নিকট সংরক্ষিত রয়েছে। বিগত প্রায় ১৬ বছরের ফ্যাসীবাদী, স্বৈরাচারি ও মাফিয়াতান্ত্রিক শাসনামলে রাষ্ট্রাচারের সকল ক্ষেত্রে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হয়েছে। রাষ্ট্রের সকল সেক্টরকে নির্লজ্জভাবে দলীয়করণ ও দুর্নীতি এবং লুটপাটের অভয়ারণ্যে পরিণত করা হয়েছে।
পতিত আওয়ামী সরকারের আমলে সবচেয়ে বেশি ষড়যন্ত্র করা হয়েছে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে। আর এ তালিকায় সবার উপরে রয়েছে রাজধানীর এক সময়ের স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিসিএসআইআর স্কুল ও কলেজ যার নেপথ্যে রয়েছেন স্বৈরাচারের অন্যতম দোসর এবং মহা দুর্নীতিবাজ বিসিএসআইআর স্কুল এন্ড কলেজের সাবেক প্রধান শিক্ষক মো. ইদ্রিস আলী। তিনি মুলত শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধির পরিবর্তে অবকাঠামো নির্মাণেই বেশি অর্থ ব্যয় করেছেন।
ফলে শিক্ষাক্ষেত্রে বহিরাবরণ দৃষ্টিনন্দন হলেও তা ক্ষমতাসীনদের দুর্নীতি ও লুটপাট করার মোক্ষম সুযোগ সৃষ্টি করে নিয়েছেলেন। ফলশ্রুতিতে উপেক্ষিত থেকেছে বিসিএসআইআর স্কুল এন্ড কলেজের মূল শিক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। মূলত পতিত সরকারের এই দোসর শিক্ষার মানোন্নয়ন না করে অপ-রাজনীতি, দুর্নীতি, লুটপাট ও নিয়োগ বাণিজ্য নিয়ে ব্যস্ত ছিলো। যা বিসিএসআইআর স্কুল ও কলেজের পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার ওপরই বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিগত সরকারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত প্রধান শিক্ষক ও গভর্নিং বডির সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, শিক্ষকদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ এবং প্রশাসনের রদবদলের কারণে অনেক স্কুলেই অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।
দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিসিএসআইআর স্কুল এন্ড কলেজের বিতর্কিত ও দুর্নীতিগ্রস্ত সাবেক প্রধান শিক্ষক মো. ইদ্রিস আলীর বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগগুলো নিয়েও নতুন করে তদন্ত এবং আইনি ব্যবস্থার দাবি উঠেছে বিভিন্ন শিক্ষক এবং অভিবাবকদের নিকট থেকে।
অনুসন্ধান সূত্রে জানা যায়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির সাবেক প্রধান শিক্ষক মো. ইদ্রিস আলী রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সীমাহীন দুর্নীতি ও অপকর্মে জড়িত থাকার কারনে গত ২০২৪ সালের ১৫ আগস্ট রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকার বিসিএসআইআর স্কুল ও কলেজের প্রধান শিক্ষক মো. ইদ্রিস আলীকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেন অত্র প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা। নানা অনিয়ম, নিয়োগ-বাণিজ্য ও দুর্নীতির অভিযোগ এনে অনতিবিলম্বে তাঁর পদত্যাগসহ তদন্ত সাপেক্ষে কঠোরতম শাস্তির দাবি জানান তারা। অনুসন্ধানের গভীরে গিয়ে মো. ইদ্রিস আলীর বিরুদ্ধে আরও ভয়ানক দুর্নীতির তথ্য উপাত্ত বেড় হয়ে আসে।
জানা যায়, এমপিও স্থগিতের আদেশ, আর্থিক অনিয়মের প্রশ্ন, কোনোটিই যেন থামাতে পারেনি বিসিএসআইআর স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রশাসনিক ক্ষমতার বলয়। প্রতিষ্ঠানের সাবেক প্রধান শিক্ষক এমন এক প্রভাবশালী বলয় তৈরি করে রেখেছিলেন যেখানে পদ-পদবি, নিয়োগ, বেতন-ভাতা ও প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন আর্থিক কার্যক্রমের দুর্নীতি আর অনিয়ম যেন ন্যায় আর নিয়মে পরিণত করেছিলেন। ভর্তি ফি, পরীক্ষাসহ নানা খাতের অর্থ, ভর্তি কার্যক্রম, ডায়েরি, আইডি কার্ড, পোশাক, ক্যান্টিন, গাইড বই, অভ্যন্তরীণ পরীক্ষা এবং ম্যানেজিং কমিটির বিভিন্ন অর্থ ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম এবং প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য সরাঞ্জামাদি এবং গ্রন্থাগারের জন্য বই ক্রয় দেখিয়ে যৌথ অ্যাকাউন্ট না করে প্রধান শিক্ষকের নামে অ্যাকাউন্ট করে ভুয়া বিল ভাউচার করে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন।
শুধুমাত্র ২০২৩ ও ২০২৪ সালের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনিয়মিত ব্যয় দেখিয়ে যথাক্রমে ৩০ লাখ ৩৬ হাজার ৭৬৩ টাকা ও ১৮ লাখ ৭১ হাজার ১৭৫ টাকা এবং বিদ্যালয়ের বিভিন্ন তহবিলের অর্থ (আংশিক) অনিয়মিত খরচ এবং তছরুপ করে ১৪ লাখ ১৮ হাজার ৪৮৫ টাকা সহ সর্বমোট ৬৩ লাখ ২৬ হাজার ৪২৩ টাকা আত্মসাৎ করেছেন। যা বিসিএসআইআর এর তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে প্রমাণিত হয়েছে। আত্মসাৎকৃত অর্থ ফেরত প্রদানের সর্বশেষ তারিখ ছিল ১৯/০৩/২০২৫ যা এখন পর্যন্ত তিনি পরিশোধ করেননি।
তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, ঢাকা আরবিট্রেশন জন্য ফাইল প্রেরণ করা হয়েছে যা এখন তদন্তাধীন আছে। এ ছাড়াও এমপিওভুক্তি, টাইম স্কেল, বি.এড স্কেলসহ বিভিন্ন প্রাপ্তির ক্ষেত্রে ইদ্রিস আলী অনৈতিকভাবে ঘুষ প্রদানে সুবিধাভোগীদের বাধ্য করেছেন এবং দারোয়ান ও পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিয়োগেও বিপুল সংখ্যক অর্থ গ্রহণ করেছেন।
আর এভাবেই অবৈধ পথে অর্জিত অর্থের মাধ্যমে তিনি ঢাকার পরিবাগের ভাদুরি টাওয়ারে ক্রয় করেছেন ৩ কোটি টাকা মূল্যর অত্যাধুনিক ফ্ল্যাট, বেড়িবাঁধ হাজারী মার্কেট সংলগ্ন হাজারীবাগ ঢাকাতে সপ্তডাঙ্গার ১০ নং ভবনে ক্রয় করেছেন ২ কোটি টাকা মূল্যর একটি ফ্ল্যাট এবং হাজারীবাগে ড্রিম টাওয়ারে আনুমানিক প্রায় ১.৫ কোটি টাকা মূল্যর অন্য একটি ফ্ল্যাট। লালবাগ থানার অন্তর্গত ১৭৬৮ নং খতিয়ানের ৩১৭ নং দাগে নিজের নামে ২ কোটি টাকা মূল্যর ৫ শতাংশ জমিও ক্রয় করেছেন। এ ছাড়াও নিজ গ্রাম যশোরের মণিরামপুর উপজেলায় কয়েক কোটি খরচ করে তৈরি করেছেন অথিতি ভবন নামে রাজকীয় বহুতল ভবন।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, সাবেক প্রধান শিক্ষক ইদ্রিস আলী ২০২৪ সালের মে মাসে নিজের ছেলে আরাফাত সিয়াম মোহাম্মাদ মুসাকে উচ্চতর শিক্ষা অর্জনের উদ্দেশ্য কানাডার সড়হপঃড়হ ভষরমযঃ পড়ষষবমব প্রায় ৫০ লাখ টাকা খরচ করে ভর্তি করান এবং ছেলের মাধ্যমে বিপুল পরিমান অর্থও পাচার করেছেন। এছাড়াও অনুসন্ধানে বিসিএসআইআর স্কুল এন্ড কলেজের সাবেক প্রধান শিক্ষক মো. ইদ্রিস আলীর বিভিন্ন ব্যাংকে নিজের এবং পরিবারের বিভিন্ন জনের নামে কোটি কোটি টাকা এফডিআরসহ সঞ্চয়ী হিসাব ও বিপুল পরিমাণ অর্থের তথ্য উঠে আসে।
জানা যায়, মো. ইদ্রিস আলী আই এফ আই সি ব্যাংক এলিফ্যান্ট রোড একাউন্ট নাম্বার -১৭০৩ ৫২৬৯৬-২০০ ও ০১৭০৩৫২৫৯৬-৮১১, এফডিআরের পরিমান ৫০ লক্ষ টাকা, মার্কেনটাইল ব্যাংক নবাবপুর রোড ব্রাঞ্চ এফডিআর একাউন্ট-০৩২২১৭৩, এফডিআরের পরিমান ৫০ লক্ষ টাকা, সাউথইস্ট ব্যাংক নিউ এলিফ্যান্ট রোড শাখা, এফডিআর একাউন্ট-২৪৫০ ০০০৯৭৫২, এফডিআরের পরিমান ১০৮.৩৯ লক্ষ টাকা, ডাচ বাংলা ব্যাংক এলিফ্যান্ট রোড শাখা, একাউন্ট নাম্বার-০২০০০০০৬২২৪০৫, এফডিআরের পরিমান ২৪ লক্ষ টাকা, মার্কেন্টাইল ব্যাংক, আটিবাজার শাখা, অ্যাকাউন্ট নাম্বার-১১৮৭১২১০০৪২৩২৭২,
এফডিআরের পরিমান ৫০ লক্ষ টাকা, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক, এলিফ্যান্ট রোড শাখা, একাউন্ট নাম্বার-৪০ ৫৮১৩১০০০০৩৪ তে বিপুল পরিমান অর্থ এফডিআর করে রেখেছেন। বিসিএসআইআর স্কুল ও কলেজের সাবেক প্রধান শিক্ষক মো. ইদ্রিস আলীর নিকট বিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনিয়ম, দুর্নীতি, ভুয়া বিল ভাউচারে অর্থ আত্মসাৎ, বিভিন্ন ব্যাংক গচ্ছিত বিপুল পরিমান অর্থ, জ্ঞাত আয় বহির্ভূত কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের বিষয়ে মতামত জানতে তাঁর মুঠো ফোনে কল দিলে তিনি সদুত্তর না দিয়ে প্রতিবেদককে বুঝে শুনে একজন শিক্ষকের নামে সংবাদ প্রকাশ করতে বলেন ।