টেকসই নগরায়ণে সাশ্রয়ী আবাসনই বড় চ্যালেঞ্জ
নিজস্ব প্রতিবেদক
০৮ অক্টোবর, ২০২৬, 11:36 AM
নিজস্ব প্রতিবেদক
০৮ অক্টোবর, ২০২৬, 11:36 AM
টেকসই নগরায়ণে সাশ্রয়ী আবাসনই বড় চ্যালেঞ্জ
মোহাম্মদ ফয়েজ উল্লাহ
গত ৫০-৬০ বছরে যুদ্ধবিধ্বস্ত জাপান কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে, কিংবা সিউল ও সিঙ্গাপুর কীভাবে শূন্য থেকে আজকের অবস্থানে এসেছে মাত্র পাঁচ-ছয় দশকে—এসব আমাদের জন্য বড় ধরনের মোটিভেশন বা ইন্সপিরেশন হতে পারে। সেই প্রেক্ষাপট মাথায় রেখে বাংলাদেশ, ঢাকা কিংবা অন্যান্য শহরের কথা চিন্তা করতে হবে। তবে আমাদের রিসোর্স লিমিটেশন আছে, অর্থনীতির বাস্তবতাও আছে। সেখান থেকেই আমাদের যুক্তিসংগত হতে হবে।
আমরা কী করতে চাই? স্মার্ট আবাসন, টেকসই নগরায়ণ—এসব নিয়ে আমরা দশকের পর দশক কথা বলে চলেছি। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, আমরা যেখানে ছিলাম, অনেক ক্ষেত্রে সেখানেই আছি; বরং কোথাও কোথাও পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়েছে।
আমাদের স্মার্ট সিটি ও নগরায়ণের ক্ষেত্রে বড় একটি স্ট্রাকচারাল চ্যালেঞ্জ হচ্ছে আবাসন। ঢাকার মেজর ক্রাইসিসও আবাসন। ওয়ার্ল্ড ব্যাংক ডেটাও বলে যে প্রতি বছর প্রায় আড়াই লাখ থেকে তিন লাখ হাউজিং ব্যাকলগ যুক্ত হচ্ছে। এ ব্যাকলগ কীভাবে কমানো এবং আবাসনকে স্মার্ট করা যায়—সেটা পরের বিষয়। প্রথমত আমাদের পর্যাপ্ত সাপ্লাই নিশ্চিত করতে হবে, তারপর সেটাকে স্মার্ট করতে হবে।
সেই জায়গায় আমি দুটো তথ্য বলতে চাই। আমাদের দেশে উৎপাদিত এনার্জির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ রেসিডেনশিয়াল সেক্টরে কনজিউম হয়। তার মানে রেসিডেনশিয়াল সেক্টরকে যদি আমরা স্মার্ট ও গ্রিন করতে পারি, তাহলে এনার্জিতে বড় ধরনের সাশ্রয় সম্ভব।
আরেকটা বিষয় হচ্ছে ফাইন্যান্স। স্মার্ট সিটির সঙ্গে ফাইন্যান্সের সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের দেশের অবস্থাটা বোঝাতে একটা ডেটাই যথেষ্ট। জিডিপির মাত্র ২ শতাংশ, অর্থাৎ ১ দশমিক ৮৯৮ শতাংশ, মর্টগেজ ফাইন্যান্স হয় বাংলাদেশে। চীনে এ হার ৩০ শতাংশ, আর মালয়েশিয়ায় ৫০ শতাংশের বেশি।
তার মানে সিটি ও আবাসনকে টেকসই বা স্মার্ট করার সঙ্গে ফাইন্যান্সের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। কিন্তু আমরা সেটা উপলব্ধি করি না। এখান থেকে উত্তরণে আমাদের ফাইন্যান্সের বিষয়টিকে সিরিয়াসলি চিন্তা করতে হবে।
স্মার্ট সিটি বা স্মার্ট আবাসন মানেই সোফিস্টিকেটেড টেকনোলজি, সোলার রুফ বা নানা ধরনের গ্যাজেট নয়। স্মার্ট আবাসন হচ্ছে এমন ব্যবস্থা, যেখানে প্রাকৃতিকভাবেই আলো-বাতাসের প্রবাহ নিশ্চিত হয়, জ্বালানি ও পানির ব্যবহার কমে এবং জীবনচক্রে ব্যয় কম থাকে।
সোলার, এনার্জি অডিট এবং লোয়ার এনার্জি বিল ও লোয়ার ওয়াটার ডিমান্ডের দিকে যেতে হবে। এসব কিছু ক্ষেত্রে আমরা খুব সহজেই করতে পারি এবং এর জন্য কিছু প্র্যাগমেটিক স্টেপ নিতে হবে।
এর সঙ্গে হাউজিংয়ের লোকেশনও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ভবন পরিবেশবান্ধব হলেও সেটি যদি প্রয়োজনীয় সেবা ও কর্মস্থল থেকে দূরবর্তী হয় এবং বাসিন্দাদের দীর্ঘ পথ যাতায়াত করতে হয়, তাহলে পরিবহনজনিত কার্বন নিঃসরণ বাড়বে। তাই স্মার্ট আবাসনের সঙ্গে পরিবহন ব্যয় ও যাতায়াতের বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে।
ট্রান্সপোর্টেশন ও ইনফ্রাস্ট্রাকচারের সঙ্গেও হাউজিংয়ের বড় সম্পর্ক অছে। প্রয়োজনীয় সবকিছু কতটা কাছাকাছি এবং আমি শহরে হেঁটে চলাচল করতে পারছি কিনা—এ সুবিধাগুলোও স্মার্ট আবাসনের অংশ।
সিউল, জাপান বা সিঙ্গাপুরকে দেখেন—তারা পলিসি ও কিছু প্র্যাগমেটিক স্টেপের মাধ্যমে শহরকে আরো বাসযোগ্য করেছে। এর জন্য সবসময় অনেক বেশি রিসোর্স মোবিলাইজ করতে হয়নি। আমাদের পলিসি আছে। আমি শুধু দুই-তিনটি বিষয় কনটেক্সট হিসেবে বলতে চেয়েছি—একটি হচ্ছে ফাইন্যান্সের সঙ্গে সিটি ডেভেলপমেন্ট ও হাউজিংয়ের সম্পর্ক, আরেকটি হচ্ছে কিছু কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে এনার্জি কীভাবে সাশ্রয় করা যায়। তাই শুরু থেকেই আমাদের স্ট্র্যাটেজিক হতে হবে।
প্র্যাগমেটিক স্টেপ হচ্ছে—রাজউক বা যেকোনো ডেভেলপমেন্ট অথরিটি ও প্রফেশনালদের দায়িত্ব হবে, বাড়িতে যেন ন্যাচারাল ভেন্টিলেশন নিশ্চিত হয় এবং ভবনের ওরিয়েন্টেশন ঠিক থাকে। এগুলো মূলত প্যাসিভ ডিজাইন স্ট্র্যাটেজি, যেগুলো ম্যান্ডেটরি করা সম্ভব।
আমাদের বিএনবিসি গাইডলাইন আছে, স্রেডার মতো প্রতিষ্ঠান আছে, এনডিসির আওতায় গ্রিনিংয়ের কৌশলও রয়েছে। অর্থাৎ মাপার, পরিকল্পনা করার এবং স্কেল করার মতো স্ট্র্যাটেজি আমাদের আছে। কিন্তু মূল সমস্যা হচ্ছে ইমপ্লিমেন্টেশন, স্কেলিং ও ফাইন্যান্সিং।
এ জায়গাগুলো আমরা যদি বুঝতে পারি এবং কার্যকরভাবে করতে পারি, তাহলে স্মার্ট ও টেকসই আবাসনের পথে অনেক দূর এগোনো সম্ভব।
লেখক : এমডি, স্পেসজিরো লিমিটেড
সৌজন্যে বণিক বার্তা