ঢাকা ০১ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
সংবাদ শিরোনাম
নুরের ওপর হামলার দায় সরকারকেই নিতে হবে : উপদেষ্টা আসিফ গণমাধ্যমের সংস্কারের দায়িত্ব সাংবাদিকদেরই নিতে হবে: আলী রীয়াজ খালেদা জিয়াকে সাজা দেয়া বিচারপতি ড. আখতারুজ্জামান পদত্যাগ করেছেন চবি ও আশপাশের এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি বাংলাদেশ একটা দুর্ঘটনার ‘ডিপো’: স্বাস্থ্য উপদেষ্টা ঢাকা-ময়মনসিংহ রেল যোগাযোগ বন্ধ চবিতে ফের সংঘর্ষ, উপ-উপাচার্যসহ আহত ২০ পুলিশ অ্যাকটিভ হলে সবাই বলে বেশি করে ফেলেছে: স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জমি নিয়ে দুপক্ষের সংঘর্ষে ইউপি সদস্যসহ নিহত ৩ এশিয়া কাপের সূচিতে পরিবর্তন

জমানো টাকা পাচ্ছেন না পাঁচ ব্যাংকের গ্রাহক

#

নিজস্ব প্রতিবেদক

৩১ আগস্ট, ২০২৫,  10:34 AM

news image

আ.লীগের লুটের খেসারত আর্থিক খাতে

ধৈর্য ধরার পরামর্শ শাখা ব্যবস্থাপকদের * মার্জারের আগে সব ধরনের সহায়তা বন্ধ

আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ব্যাংক ও আর্থিক খাতে ব্যাপক লুটপাটের খেসারত দিতে হচ্ছে এখন গ্রাহকদের। কেন্দ্রীয় ব্যাংক অনেকটা বাধ্য হয়ে এসব ব্যাংককে আর্থিক সহায়তা দিয়ে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করে। তবে সেই প্রক্রিয়াও এখন থেমে আছে। ফলে বেসরকারি পাঁচটি ব্যাংক শুধু নামেই টিকে আছে। এর মধ্যে এক্সিম ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক একীভূত হতে রাজি না হওয়ায় ওই পাঁচ ব্যাংকের সব ধরনের অর্থ সহায়তা বন্ধ করে দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। লুটপাট ও ঋণের নামে ব্যাংক থেকে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার ফলে এসব ব্যাংকের গ্রাহকরা পড়েছেন বড় বিপদে। ব্যাংকগুলো তাদের আমানতকারীদের কোনো টাকা ফেরত দিতে পারছে না। এই তালিকায় অপর তিনটি ব্যাংক হলো-ইউনিয়ন, গ্লোবাল ও ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক। এসব ব্যাংক গ্রাহকের জমাকৃত অর্থ ফেরত দিতে পারছে না। ক্ষেত্রবিশেষ কয়েক হাজার টাকা তুলতে গিয়েও অনেক গ্রাহক চরম বিরক্ত হয়ে ফেরত আসছেন। তারা এই দুর্ভোগ আর কষ্টের কথা কাকে বললে সমাধান হবে তাও জানেন না। অনেক ব্যাংকের শাখা প্রধানের সঙ্গে তারা যোগাযোগ করলেও কোনো সমাধান পাচ্ছেন না। অনেকে ব্যাংকে গিয়ে হয়রান হয়ে কান্নাকাটি করেও ফেরত আসছেন। অনেকে গচ্ছিত টাকা ফেরত না পেয়ে ধারদেনা করে আর্থিক সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছেন।

বুধবার ইউনিয়ন ব্যাংকের হাটখোলা শাখায় সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, সনসান নীরবতা। কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মন মরা হয়ে বসে আছেন। শাখা ব্যবস্থাপক অনুপস্থিত থাকায় অপর একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, মার্জারের আগে বাংলাদেশ ব্যাংক সব ধরনের সহায়তা বন্ধ রাখছে। তাই এক মাস ধরে কাউকে (গ্রাহক) কোনো টাকা ফেরত দিতে পারিনি। প্রতিদিন গড়ে ২০-৩০ জন গ্রাহক জমানো টাকা চেয়ে খালি হাতে ফেরত যাচ্ছেন। এমনকি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পাওনা বেতনের ৫ হাজার টাকা যে হাতে তুলে দেব, সে ব্যবস্থাও নেই। গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের মতিঝিল শাখায় গিয়েও দেখা যায় প্রায় অভিন্ন চিত্র। শাখার কর্মকর্তারা যুগান্তরকে বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক সহায়তা বন্ধ হওয়ার পর একদম ফেঁসে গেছি। শুরুতে কিছু টাকা ফেরত দিতে পারলেও বর্তমানে পিঠ একদম দেয়ালে ঠেকে গেছে। কথা বলতে গিয়ে এক পর্যায়ে ভারাক্রান্ত হয়ে পড়েন তিনি। বলেন, আজ একজন গ্রাহক টাকা না পেয়ে যে ভাষায় গালাগাল করেছেন, তা সহ্য করার মতো নয়।

দুর্বল ব্যাংক সংস্কার ও তারল্য সহায়তার পরও গ্রাহকের জমা অর্থ ফেরত দিতে না পারায় দীর্ঘদিন থেকে অপেক্ষায় থাকা গ্রাহকরা হতাশায় ভুগছেন। স্কুল-শিক্ষক আবদুল কাদের এক লাখ ২৭ হাজার টাকা তুলতে ১৮ বার ইউনিয়ন ব্যাংকে গিয়েও এক হাজার টাকা হাতে পাননি। সাদ্দাম হোসেন দীর্ঘদিন ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে পাওনা টাকা চেয়ে এক টাকাও পাননি। তিনি এখন হতাশ। এই চিত্র শুধু সাদ্দাম বা কাদেরের নয়, এটি এখন লাখ লাখ গ্রাহকের। ব্যাংকগুলোর ওপর তাদের আস্থায় চিড় ধরেছে। এ চিত্র শুধু ঢাকা নয়, সারা দেশের। গ্রাহকরা বলছেন, দিনের পর দিন লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার পরও টাকা পাচ্ছেন না; বরং প্রতিনিয়ত তাদের ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে নানা অজুহাতে। এই সংকট এখন আর শুধু আর্থিক নয়, এটি মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিয়েছে। চিকিৎসা, সন্তানের স্কুলের বেতন কিংবা ব্যবসার জরুরি প্রয়োজনেও টাকা না পেয়ে গ্রাহকদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। অনেক শাখায় গ্রাহক ও ব্যাংক কর্মকর্তাদের মধ্যে বাগবিতণ্ডা ও হাতাহাতির মতো অপ্রীতিকর ঘটনাও ঘটছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয় ৮ আগস্ট। এর পরই আর্থিক খাতকে স্থিতিশীল করতে নানা পদক্ষেপ নেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। দুর্বল ব্যাংকগুলোর ১৪টি পর্ষদ বিলুপ্ত করা হয়, প্রায় ৫২ হাজার কোটি টাকা নতুন করে ছাপিয়ে ব্যাংকগুলোকে তারল্য সহায়তা দেওয়া হয়। সবল ব্যাংক থেকে টাকা ধারের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুপারিশ ও ঋণাত্মক কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ব্যালান্স ডিমান্ড লোনে পরিবর্তন করা হয়। এসব পদক্ষেপের ফলে ছোট অঙ্কের আমানতকারীরা প্রথমদিকে কিছু অর্থ তুলতে পারলেও বড় অঙ্কের সঞ্চয় ফেরত পাওয়া গ্রাহকের জন্য এখন দুঃস্বপ্ন হয়ে পড়েছে। দুর্বল ব্যাংকগুলো মাসে পাঁচ হাজার টাকাও দিতে পারছে না, তবে গ্রাহকদের ধৈর্য ধরার পরামর্শ দিচ্ছেন শাখা ব্যবস্থাপকরা।

টাকা ফেরত না পাওয়া ফার্স্ট সিকিউরিটি, ইউনিয়ন ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী, এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের মতো বেশ কয়েকটি বেসরকারি ব্যাংকের কয়েক লাখ গ্রাহকের প্রতিদিনের বাস্তবতা। গত বছর ৫ আগস্টের পর এসব ব্যাংকে আমানত তোলার হিড়িক পড়েছিল। সেই চাপ এখনো সামলে উঠতে পারেনি ব্যাংকগুলো।

ব্যাংক খাত বিশ্লেষকদের মতে, কিছু ব্যাংকের অনিয়ম-দুর্নীতি, দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও মার্জার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার কারণে গ্রাহকের আস্থা ফিরে আসেনি। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, তারা ধাপে ধাপে সমস্যাগুলো সমাধান করছে। তবে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে আরও সময় লাগবে।

গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ নুরুল আমিন জানান, গত জুলাই ও চলতি আগস্টে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে কোনো সহায়তা পাননি। সে কারণে সংকট বেশি দেখা যাচ্ছে। মার্জার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ায় সংকট কিছুটা কমবে বলে আশা তার।

এদিকে অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে দুর্বল হয়ে পড়া একাধিক বেসরকারি ব্যাংককে একীভূত (মার্জার) করার উদ্যোগে কঠোর হচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, মুখের কথায় বা অযৌক্তিক আবদারে মার্জার ঠেকানো যাবে না। ক্যামেলস রেটিং, খেলাপি আদায়, এডিআর, ধার পরিশোধসহ যারা ব্যাংকের বিভিন্ন আর্থিক সূচকে দৃশ্যমান উন্নতি ঘটাতে পারবে না, তাদের বাধ্যতামূলকভাবে একীভূত করা হবে। ধার করে টিকে থাকা এবং আগের ধারও পরিশোধে ব্যর্থ ব্যাংকগুলোকে আর কোনো তারল্য সহায়তা দেওয়া হবে না। শুধু এই পাঁচ ব্যাংক নয়, আরও ডজনখানেক ব্যাংকের অবস্থা খুবই নাজুক। পদ্মা ব্যাংকসহ রাজনৈতিক বিবেচনায় অনুমোদন পাওয়া ও অসুস্থ রাজনীতির শিকার একাধিক ব্যাংকের লাখ লাখ গ্রাহক এখন প্রায় নিঃস্ব।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মার্জ হতে যাওয়া পাঁচ ব্যাংকের মোট আমানত ১ লাখ ৪৭ হাজার ৩৬৮ কোটি টাকা এবং বিতরণকৃত ঋণ ১ লাখ ৯০ হাজার ৪৮৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১ লাখ ৪৬ হাজার ৯১৮ কোটি টাকা খেলাপি। যা বিতরণ করা ঋণের ৭৭ শতাংশ। মূলধনে ঘাটতি ৪৫ হাজার ২০৩ কোটি টাকা, গ্রাহক সংখ্যা ৯২ লাখ এবং কর্মকর্তা-কর্মচারী ১৫ হাজারের বেশি।

সম্প্রতি অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের বক্তব্য এই সংকটকে আরও স্পষ্ট করে তোলে। তিনি বলেছেন, ‘ব্যাংক খাতের ৮০ শতাংশ অর্থ নিয়ে যাওয়া হয়েছে, যা পুনর্গঠনের জন্য ৩৫ বিলিয়ন ডলার লাগবে বলে জানিয়েছে আইএমএফ।’ এই পরিস্থিতিতে ‘ব্যাংকে জমা রাখা টাকা নিয়ে দুশ্চিন্তার কিছু নেই’ বাংলাদেশ ব্যাংকের এই বার্তা গ্রাহকদের কাছে রীতিমতো হাস্যরস ছাড়া আর কিছুই নয়।

সূত্র : দৈনিক যুগান্তর

logo

সম্পাদক ও প্রকাশক : মো. নজরুল ইসলাম