কৃষিঋণের সুবিধাভোগীর তালিকায় এগিয়ে নারীরা
নিজস্ব প্রতিবেদক
৩০ আগস্ট, ২০২৬, 11:02 AM
নিজস্ব প্রতিবেদক
৩০ আগস্ট, ২০২৬, 11:02 AM
কৃষিঋণের সুবিধাভোগীর তালিকায় এগিয়ে নারীরা
কৃষির মাঠে নারীর শ্রমের উপস্থিতি এখন আর আড়ালে নেই। দিন দিন সেই উপস্থিতির ছাপ পড়ছে অর্থায়নেও। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, সর্বশেষ পাঁচ অর্থবছরে মোট কৃষিঋণ সুবিধাভোগীর ৫০ শতাংশের বেশি ছিলেন নারী। এ সময় ৯৩ লাখের অধিক নারী কৃষিঋণের সুবিধা পেয়েছেন। অর্থাৎ কৃষির মাঠে নারীর শ্রম যেমন বড়, তেমনি কৃষির অর্থনীতিতে ঋণগ্রহীতা হিসেবেও তাদের উপস্থিতি এখন স্পষ্ট।
কৃষি মানেই শুধু পুরুষের কাজ- এমন ধারণা বদলে গেছে। জমি প্রস্তুত থেকে শুরু করে বীজ বোনা, চারা রোপণ, আগাছা পরিষ্কার, ফসল কাটা, মাড়াই, সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ- কৃষির নানা ধাপে নারীর সক্রিয় অংশগ্রহণ এখন বাস্তবতা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২৪ সালের শ্রমশক্তি জরিপের তথ্যানুযায়ী, দেশে কৃষিতে নিয়োজিত নারীর সংখ্যা ১ কোটি ৭২ লাখ ৫০ হাজার। বিপরীতে একই খাতে পুরুষের সংখ্যা ১ কোটি ৩৬ লাখ ২০ হাজার।
শুধু শ্রমশক্তির হিসাবেই নয়, কৃষির কাজের বৈচিত্র্যেও নারীর অংশগ্রহণ বিস্তৃত। ক্যাম্পেইন ফর সাসটেইনেবল লাইভলিহুডসের (সিএসআরএল) উপাত্ত বলছে, বাংলাদেশে কৃষি খাতের ২১ ধরনের কাজের মধ্যে ১৭ ধরনের কাজেই গ্রামীণ নারীরা অংশগ্রহণ করেন। অর্থাৎ কৃষির উৎপাদন ব্যবস্থায় নারীরা শুধু সহায়ক ভূমিকা পালন করছেন না; বরং কৃষির বড় একটি অংশের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২১-২২ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত মোট ১ কোটি ৮৪ লাখ ৬১ হাজার ২২৬ জন কৃষি ও পল্লী ঋণ পেয়েছেন। এর মধ্যে নারী ঋণগ্রহীতার সংখ্যা ৯৩ লাখ ২০ হাজার ৫১৫ জন, যা মোট ঋণগ্রহীতার ৫০ দশমিক ৪৯ শতাংশ।
কোন অর্থবছরে কত সুবিধাভোগী : প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, ২০২১-২২ অর্থবছরে মোট ৩৩ লাখ ৪ হাজার ৮১১ জন কৃষি ও পল্লী ঋণ পেয়েছেন। এর মধ্যে নারী ছিলেন ১৭ লাখ ৯৭ হাজার ৫২ জন। অর্থাৎ মোট ঋণগ্রহীতার প্রায় ৫৪ দশমিক ৪৫ শতাংশই নারী। ২০২২-২৩ অর্থবছরে মোট ৩৮ লাখ ১৮ হাজার ৫৪৫ জন কৃষক ঋণ পেয়েছেন। এর মধ্যে নারী ঋণগ্রহীতার সংখ্যা ছিল ১৮ লাখ ৮১ হাজার ৯০০ জন, যা মোটের প্রায় ৪৯ দশমিক ২৯ শতাংশ। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আবারও নারী ঋণগ্রহীতার সংখ্যা পুরুষকে ছাড়িয়ে যায়। মোট ৩৭ লাখ ৪১ হাজার ৮৬ জন কৃষক ঋণ পেলেও নারী ছিলেন ১৯ লাখ ২১ হাজার ৪২৪ জন।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে অবশ্য চিত্র কিছুটা বদলে যায়। ওই বছর মোট ৩৮ লাখ ১৯ হাজার ৫৫১ জন কৃষক কৃষি ও পল্লী ঋণ পেয়েছেন। এর মধ্যে নারী ছিলেন ১৮ লাখ ২ হাজার ৭৩৭ জন, যা মোটের প্রায় ৪৭ দশমিক ১৯ শতাংশ। বিপরীতে পুরুষ ঋণগ্রহীতার সংখ্যা ছিল প্রায় ২০ লাখ ১৬ হাজার ৮১৪ জন। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আবারও নারী ঋণগ্রহীতার সংখ্যা পুরুষকে ছাড়িয়ে যায়। ওই বছর মোট ৩৭ লাখ ৭৭ হাজার ২৩৩ জন কৃষি ও পল্লী ঋণ পেয়েছেন। এর মধ্যে নারী ১৯ লাখ ১৭ হাজার ৪০২ জন, যা মোটের ৫০ দশমিক ৭৭ শতাংশ। পুরুষ ঋণগ্রহীতার সংখ্যা ছিল প্রায় ১৮ লাখ ৫৯ হাজার ৮৩১ জন।
নারীদের ঋণের অঙ্কও বাড়ছে : তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, নারীদের মধ্যে বিতরণ করা ঋণের অঙ্কও ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে যেখানে নারী কৃষকদের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছিল প্রায় ১০ হাজার ৮২৯ কোটি টাকা, সেখানে ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা বেড়ে হয় ১২ হাজার ৭৫২ কোটি টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১৩ হাজার ১৫৬ কোটি টাকা, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৪ হাজার ২০৫ কোটি টাকা এবং সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রায় ১৬ হাজার ৬৩ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ পাঁচ বছরের ব্যবধানে নারী কৃষকদের জন্য বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ৫ হাজার ২৩৪ কোটি টাকা।
ঋণের অঙ্কে এগিয়ে পুরুষ : তবে নারী ঋণগ্রহীতার সংখ্যা বেশি হলেও ঋণের মোট অঙ্কে পুরুষরাই এগিয়ে রয়েছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২১-২২ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত ব্যাংকগুলো মোট ১ লাখ ৭৮ হাজার ৬৪৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা কৃষি ও পল্লী ঋণ বিতরণ করেছে। এর মধ্যে নারীদের দেওয়া হয়েছে প্রায় ৬৭ হাজার ৬ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। ফলে নারীদের ঋণের অঙ্ক বাদ দিলে পুরুষসহ অন্যান্য ঋণগ্রহীতাদের জন্য বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১ লাখ ১১ হাজার ৬৩৯ কোটি ২৮ লাখ টাকা। অর্থাৎ ঋণগ্রহীতার সংখ্যায় নারীরা ৫০ দশমিক ৪৯ শতাংশ হলেও ঋণের অঙ্কে তাদের অংশ প্রায় ৩৭ দশমিক ৫২ শতাংশ; বিপরীতে পুরুষদের অংশ প্রায় ৬২ দশমিক ৪৮ শতাংশ।
বাড়ছে কৃষিঋণের পরিমাণ : নারীদের ঋণপ্রাপ্তির চিত্রকে সামগ্রিক কৃষিঋণের সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে পরিবর্তনের মাত্রা আরও স্পষ্ট হয়। ২০২১-২২ অর্থবছরে ব্যাংকগুলো ২৮ হাজার ৮৩৪ কোটি ২১ লাখ টাকা কৃষি ও পল্লী ঋণ বিতরণ করে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা বেড়ে হয় ৩২ হাজার ৮২৯ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৩৭ হাজার ১৫০ কোটি ৯০ লাখ টাকা এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩৭ হাজার ২৬ কোটি ৫২ লাখ টাকা বিতরণ করা হয়। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪২ হাজার ৮০৪ কোটি ১৬ লাখ টাকা।
সুবিধাভোগীর তালিকায় এগিয়ে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক : কৃষিঋণের বড় একটি অংশ যাচ্ছে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের কাছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে ২৪ লাখ ৯৯ হাজার ৯৪৫ জন ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষি প্রায় ২০ হাজার ১৬২ কোটি টাকা কৃষিঋণ পেয়েছেন। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ২৭ লাখ ৩৬ হাজার ৮৭ জন পেয়েছেন প্রায় ২২ হাজার ৪০২ কোটি ১৫ লাখ টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ২৮ লাখ ২৩ হাজার ৫৩০ জন পেয়েছেন প্রায় ২৪ হাজার ৮৪৪ কোটি ৯১ লাখ টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২৯ লাখ ১৯ হাজার কৃষক পেয়েছেন প্রায় ২৫ হাজার ৯২৭ কোটি ৬২ লাখ টাকা। আর সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ২৮ লাখ ৪২ হাজার ১৭৫ জন ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষির মধ্যে প্রায় ৩০ হাজার ২০০ কোটি ৭৭ লাখ টাকা কৃষিঋণ বিতরণ করা হয়েছে।
১০ টাকায় হিসাব খোলার সুযোগ : কৃষকদের ব্যাংকিং ব্যবস্থার আওতায় আনতে মাত্র ১০ টাকায় হিসাব খোলার উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ২০২২ সালের মার্চে এমন হিসাব ছিল ৯৯ লাখ ৩ হাজার ২০০টি। ২০২৩ সালের মার্চে তা বেড়ে হয় ১ কোটি ২২ হাজার ৯৭০টি। ২০২৪ সালের মার্চে ১ কোটি ৪ লাখ ২ হাজার ৪৫৭টি, ২০২৫ সালের মার্চে ১ কোটি ৪ লাখ ১০ হাজার ৪৫২টি এবং ২০২৬ সালের মার্চে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ কোটি ৬ লাখ ৮৫ হাজার ৬৪৬টি। সূত্র : দৈনিক আমাদের সময়