NL24 News
০৯ অক্টোবর, ২০২৫, 1:57 PM
ওমানের মরুভূমিতে নিভে গেলো পরিবারের সাত প্রদীপ
— চার মাসের মেয়েকে রেখে না ফেরার দেশে শাহাবুদ্দিন, দেড় বছরের সংসারে শেষ হলো স্বপ্ন
ওমানের দুকুম এলাকার নির্জন মরুভূমিতে ০৮ অক্টোবর সূর্য ডুবেছিল ঠিক আগের মতোই। কিন্তু সেই সূর্যাস্তের আগে নিভে গেল সাতটি প্রবাসী পরিবারের প্রদীপ। যে প্রদীপগুলো আলোকিত করত দেশের অর্থনীতি, আলোকিত করত বাপ-মা, ভাইবোন, স্ত্রী-সন্তানের মুখ। সেই সাত তরুণের ঘামে ভিজে ছিল বাংলাদেশের রেমিট্যান্স খাত, আর এখন তাদের রক্তে ভিজে আছে ওমানের এক নির্জন রাস্তা। সবাই সন্দ্বীপের সন্তান। গিয়েছিলেন ভাগ্য বদলের আশায়। ফেরার কথা ছিল ঘরে, প্রিয় মুখের হাসিতে। কিন্তু ফিরলেন না কেউ— ফিরল কেবল শোক, কান্না আর ভাঙা স্বপ্নের নিঃশেষ ধ্বনি। দুর্ঘটনার মুহূর্ত: মরুভূমির রাস্তায় রক্তে লেখা চিৎকার স্থানীয় সময় বিকেল সাড়ে ৩টা। দুকুমের সাগরপাড় সংলগ্ন ফাঁকা রাস্তায় মাছবাহী একটি ট্রাকের সঙ্গে তাদের মাইক্রোবাসের মুখোমুখি সংঘর্ষ। এক মুহূর্তে বিকট শব্দে সব শেষ— লোহা আর মাংসের গন্ধে ভারী হয়ে যায় মরুভূমির হাওয়া। মাইক্রোবাসটি দুমড়ে-মুচড়ে হয়ে যায় লাশের খাঁচা। সেই খাঁচার ভেতর থেকে কেউ চিৎকার করে ওঠেন— “আমারে বাঁচাও, আমি এখনো বাঁচি!” তিনি শাহাবুদ্দিন—
দেড় বছরের সংসারের স্বপ্নবাজ এক তরুণ, চার মাসের এক কন্যাশিশুর বাবা। কিন্তু কেউ এগিয়ে গেল না। ওমানের কঠোর আইনে CID না এলে আহত কাউকে ছোঁয়া যায় না। পুলিশ দাঁড়িয়ে ছিল চুপচাপ। আর শাহাবুদ্দিন তখন রাস্তার ধুলোয় পড়ে ফিসফিস করে বলছিলেন— “আমারে বাঁচাও...” কিছুক্ষণের মধ্যেই তার চোখের আলো নিভে গেল মরুভূমির হাওয়ায় মিলিয়ে গেল এক তরুণ বাবার শেষ নিঃশ্বাস। নিহতদের পরিচয়: আমিন সওদাগর (পিতা: আলী কব্বর সেরাং) – সারিকাইত ২নং ওয়ার্ড, রকি (পিতা: ইব্রাহীম মেস্তুরী) – সারিকাইত ২নং ওয়ার্ড, আরজু (পিতা: শহিদুল্লাহ) – সারিকাইত ৪নং ওয়ার্ড, বাবলু – সারিকাইত ইউনিয়ন, শাহাবুদ্দিন – সারিকাইত ইউনিয়ন, জুয়েল – মাইটভাঙ্গা ইউনিয়ন, রনি – রহমতপুর ইউনিয়ন, সাতটি নাম, সাতটি জীবন, সাতটি অগ্নিশিখা— আজ নিভে গেছে একই আগুনে।
চার মাসের শিশুর কোলে অনন্ত শূন্যতা: সারিকাইতের সেই ছোট্ট গ্রামে এখন শুধু কান্নার শব্দ।শাহাবুদ্দিনের ঘরে শোকের ছায়া নেমেছে এমনভাবে, যেন আকাশটাও কেঁদে ভিজে গেছে। স্ত্রী চার মাসের মেয়ে আছিয়াকে কোলে নিয়ে নির্বাক বসে আছেন—চোখে পানি নেই, আছে এক গভীর শূন্যতা।মাত্র ২৬ দিন আগে ওমানের পথে পা রেখেছিলেন শাহাবুদ্দিন। বেরোনোর সময় মেয়েকে কোলে নিয়ে বলেছিলেন
“ফিরে এসে ঘরটা নতুন করে বানাব।” আজ সেই ঘরই শূন্য, সেই মেয়েটির কোলেও নেই বাবার স্পর্শ। লাশ ফেরানোর লড়াই: শেষবারের মতো প্রিয়জনের মুখ ওমানের প্রবাসীরা এখন মরদেহ ফেরানোর দাবিতে একজোট।তারা বলছেন— “অন্তত শেষবারের মতো যেন আমরা আমাদের ভাইদের মুখ দেখতে পারি, তাদের মা-বাবা যেন মরদেহের গায়ে একফোঁটা পানি দিতে পারেন।” তাদের আহ্বান— বাংলাদেশ দূতাবাস ও সন্দ্বীপের জনপ্রতিনিধিরা যেন দ্রুত ব্যবস্থা নেন, ক্ষতিপূরণ ও আইনি সহায়তার প্রক্রিয়াও যেন নিশ্চিত হয়।
প্রবাসীদের রক্তে লেখা এক প্রশ্ন এই সাত তরুণ দেশের জন্য পাঠাতেন ডলার, পাঠাতেন আশার গল্প। তাদের ঘামেই বাঁচে দেশের অর্থনীতি। কিন্তু তাদের মৃত্যু যেন কারও চোখে জল আনে না, কারও ঘুম নষ্ট হয় না। বিদেশের মরুভূমিতে পড়ে থাকা ভাঙা গাড়ি, রক্তে ভেজা বালু—
আজ প্রশ্ন তোলে আমাদের বিবেককে। প্রশ্ন তোলে, বিদেশে কাজ করতে যাওয়া এসব প্রবাসীর জীবন কি এতই তুচ্ছ? আইনের ফাঁকে, অবহেলার ছায়ায়— তাদের জীবন কি শুধু “সংবাদ শিরোনাম” হয়ে মরে যাবে বারবার। সন্দ্বীপ আজ শোকাচ্ছন্ন। যেন প্রতিটি বাড়িতে নিভে গেছে একটি করে প্রদীপ।কিন্তু এই মৃত্যু যেন নতুন বোধ জাগায়— যেন আর কোনো শাহাবুদ্দিন রাস্তায় পড়ে থেকে মৃত্যুর আকুতি না জানায়,যেন কোনো মাকে চার মাসের সন্তান নিয়ে এমন অন্ধকারে একা না থাকতে হয়। ওমানের সেই মরুভূমিতে সূর্য ডুবেছিল সেদিন, কিন্তু সন্দ্বীপের আকাশে এখনো উঠেনি আলো।