নিজস্ব প্রতিবেদক
২৫ মে, ২০২৬, 12:47 PM
ঈদযাত্রা: নৌপথে ভিড় বাড়ছে ঘরমুখী মানুষের
ঈদুল আজহায় নৌপথে ঘরমুখী মানুষের ভিড় বাড়ছে। রাজধানীর সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল থেকে ১৭২টি লঞ্চে যাত্রীদের গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ লঞ্চ সার্ভিসে লঞ্চ সংখ্যা দ্বিগুণ বাড়িয়ে গতকাল রোববার থেকে যাত্রী পরিবহনের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে। ভাড়া কমিয়ে নির্বিঘ্নে যাত্রীদের গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে বলে দাবি করছেন লঞ্চ মালিকরা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এবারের ঈদে যাত্রীর চাপ সামাল দিতে বেশ আগেই প্রস্তুতি নিয়েছিল নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে সদরঘাট টার্মিনালে ১৭২টি লঞ্চ প্রস্তুত রাখা হয়। এই টার্মিনাল থেকে দক্ষিণবঙ্গের ২১টি জেলার সাধারণ সময়ে যেখানে ৫০ থেকে ৫৫টি লঞ্চ চলাচল করে, সেখানে ঈদের সময় অতিরিক্ত লঞ্চ যুক্ত করা হয়েছে।
গতকাল সরেজমিন সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল ঘুরে দেখা যায়, ঈদে সরকারি ছুটি শুরুর আগের দিন সকাল থেকেই সেখানে যাত্রীরা আসতে শুরু করেন। বিভিন্ন লঞ্চে করে তারা নিজ নিজ গন্তব্যে রওনা হন। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যার পর যাত্রীদের আনাগোনাও বাড়ছিল। আজ সোমবার থেকে এই ভিড় আরও বাড়বে। ঈদের আগের দিন ২৭ মে পর্যন্ত ঘরমুখী মানুষের ভিড় থাকবে বলে জানায় কর্তৃপক্ষ।
স্বজনের সঙ্গে ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে সন্ধ্যায় সপরিবারে লঞ্চযোগে ভোলার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেন গুলিস্তানের বাসিন্দা বেসরকারি চাকরিজীবী মনোয়ার হোসেন। সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল থেকে ভোলার ইলিশাগামী ‘এমভি টিপু-৬’ লঞ্চে উঠেছেন তিনি ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা। লঞ্চেই সদরঘাট হয়ে ইলিশা পর্যন্ত যাবেন তারা।
ঢাকা-বরিশাল-ঢাকা রুটে চলাচলকারী পারাবত-২ লঞ্চের ম্যানেজার মোহাম্মদ সুমন বলেন, যাত্রীদের সুবিধার্থে সরকার নির্ধারিত ভাড়ার চেয়েও ভাড়া কম নেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে কেবিন ভাড়া অনেক কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। একটি সিঙ্গেল কেবিনের সরকার নির্ধারিত ভাড়া এক হাজার ৭১৬ টাকা হলেও তা এক হাজার ২০০ টাকায় দেওয়া হচ্ছে।
এদিকে ঘরমুখী মানুষের সর্বাত্মক সুবিধা নিশ্চিতে সতর্ক দেখা গেছে বিআইডব্লিউটিএ কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও। গত ঈদুল ফিতরে দুটি অনাকাঙ্ক্ষিত লঞ্চ দুর্ঘটনার কারণে এবার কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত ছিল– চলন্ত বা নোঙর করা লঞ্চে নৌকা কিংবা ট্রলার থেকে যাত্রী ওঠানামা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে। এদিকে, নৌপথে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পন্টুনের আশপাশ থেকে নৌকা চলাচল নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পাশাপাশি পন্টুন এলাকায় নৌ পুলিশের টহল জোরদার করা হয়েছে। সদরঘাটের ১ থেকে ২৫ নম্বর পন্টুন পর্যন্ত নৌ পুলিশের চারটি টহল টিম দায়িত্ব পালন করছেন। নৌকা যাতে টহল ভেঙে প্রবেশ করতে না পারে, সে জন্য বিশেষ নজরদারি চালানো হচ্ছে।
বিআইডব্লিউটির ঢাকা নদী বন্দরের যুগ্ম পরিচালক মোবারক হোসেন জানান, গত ঈদের মতো এবারের ঈদেও ঘরমুখী যাত্রীদের নির্বিঘ্ন যাত্রা নিশ্চিত করতে মন্ত্রণালয়ের নির্দশনাগুলো বাস্তবায়নে সদরঘাটে সব অংশীদারের সঙ্গে বৈঠক করেছেন তারা। এখান থেকে নৌপথের বিদ্যমান ৩৮টি রুটেই লঞ্চ চালানোর সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। এবারের ঈদযাত্রা ঘিরে ১৭৫টি লঞ্চের সময়সীমা ঠিক করা হয়েছে।
শুরু হলো বিশেষ লঞ্চ সার্ভিসও
গতকাল থেকে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বছিলা লঞ্চঘাট (ল্যান্ডিং স্টেশন) এবং নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের পূর্বাচল কাঞ্চন ব্রিজসংলগ্ন শিমুলিয়া ট্যুরিস্ট ঘাট থেকেই বিশেষ লঞ্চ সার্ভিস শুরু হয়। এই বিশেষ লঞ্চ সার্ভিস চলবে ঈদের আগের দিন পর্যন্ত।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গত ঈদুল ফিতরে এই দুটি নতুন ঘাট থেকে বিশেষ লঞ্চ সার্ভিস চালু হয়েছিল। যাত্রী চাহিদা থাকায় এবারও সেটা অব্যাহত রাখা হয়েছে। এ ছাড়া গত ঈদুল ফিতরে বছিলা ঘাট থেকে ছয়টি নৌপথে ছয়টি লঞ্চ দিয়ে বিশেষ লঞ্চ সার্ভিস পরিচালনা করা হলেও এবার ১২টি লঞ্চ দিয়ে এই কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। তবে শিমুলিয়া ঘাট থেকে আগের মতো দুটি লঞ্চ ও একটি ফেরি চলাচল করবে। এ ছাড়া বছিলা লঞ্চঘাট থেকে কেবল ঈদের সময় নয়, সারাবছর দুটি লঞ্চের চলাচল অব্যাহত রাখার পদক্ষেপও নেওয়া হয়েছে।
বছিলা লঞ্চঘাট ঘুরে যাত্রীদের পাশাপাশি এলাকার মানুষের মধ্যে উচ্ছ্বাস দেখা গেল। ঈদুল ফিতরের মতো এবারও বিশেষ লঞ্চ সার্ভিস শুরুর প্রথম দিনে যাত্রীর ভিড় তেমন একটা ছিল না। লঞ্চঘাটের পন্টুনে বিশেষ লঞ্চ সার্ভিসের লঞ্চগুলো নোঙর করে যাত্রীদের ওঠানো হচ্ছিল। প্রবেশমুখে কন্ট্রোল রুম এবং যাত্রী বিশ্রামাগারকে ঘিরেও নিরাপত্তা ও সুশৃঙ্খল পরিবেশ বজায় রাখতে পুলিশ ও বিআইডব্লিউটিএর স্টাফ মোতায়েন করা হয়েছে।
বিআইডব্লিউটিএর শুল্ক আদায়কারী কর্মকর্তা ইনসানুর রহমান জানান, সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালের ওপর চাপ কমাতেই ঈদুল ফিতরে বছিলায় নতুন এই ঘাট চালু করা হয়েছিল। এবারও সেই সুবিধা অব্যাহত রাখা হয়েছে। মোহাম্মদপুর, বছিলা, ধানমন্ডি, গাবতলী, আশুলিয়া ও সাভার এলাকার যাত্রীরা সদরঘাট না গিয়ে এই ঘাট দিয়ে নৌপথে গন্তব্যে পৌঁছতে পারবেন।
বিআইডব্লিউটিএর জরুরি সমন্বয় সভা
নদীপথে ঘরমুখী মানুষের যাত্রা নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন করার লক্ষ্যে কঠোর নির্দেশনা দিয়েছে বিআইডব্লিউটিএ। গতকাল রাজধানীর মতিঝিলে বিআইডব্লিউটিএর প্রধান কার্যালয়ের মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতি মিলনায়তনে এক জরুরি সমন্বয় সভায় এ নির্দেশনা দেওয়া হয়। বিআইডব্লিউটিএর সব নদী বন্দরের ঈদ ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম সুচারুরূপে সম্পাদনের লক্ষ্যে এই সভা হয়। এতে বক্তব্য দেন বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল আরিফ আহমেদ মোস্তফা, পরিচালক (বন্দর ও পরিবহন বিভাগ) এ কে এম আরিফ উদ্দিন এবং পরিচালক (নৌ নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বিভাগ) আলমগীর কবির। বিভিন্ন ঘাট, লঞ্চঘাট, পন্টুন, কন্ট্রোল রুম ও ওয়াচ টাওয়ারে নিয়োজিত সব পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী সভায় অংশ নেন। সূত্র : দৈনিক সমকাল