ইউরোপীয় ঘরানা নাকি লাতিন ছন্দের জয়
স্পোর্টস ডেস্ক
১৯ জুলাই, ২০২৬, 11:02 AM
স্পোর্টস ডেস্ক
১৯ জুলাই, ২০২৬, 11:02 AM
ইউরোপীয় ঘরানা নাকি লাতিন ছন্দের জয়
রোববার নিউইয়র্কের মেটলাইফ স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপ ফাইনাল ফুটবলের কোন ঘরানার ফুটবলের জয়োৎসব দেখতে চলেছে, সেটি আগেভাগেই বলে দেওয়াটা জ্যোতিষশাস্ত্র চর্চার মতো বিষয় হবে। এখনকার ফলকেন্দ্রিক বিশ্বফুটবলে নির্দিষ্ট কোনো স্টাইল মাথা উঁচু করে সদম্ভে জয়ের ঘোষণা দিতে পারে বলে মনে হয় না।
এই বিশ্বকাপে সব স্টাইল, সব ঘরানা মিলেমিশে একাকার। লাতিন আমেরিকান ফুটবলের অলস সৌন্দর্য, মুগ্ধতা জাগানো ড্রিবলিং হারিয়ে গেছে; যা একটু আছে সুইচ টেপা আর বৈদ্যুতিক বাতির আলো জ্বলে ওঠার মাঝখানকার সময়ের মতোই যেন তার স্থায়িত্ব। আর্জেন্টিনার ফুটবল স্টাইল লা নুয়েস্ত্রাও কি আছে লা নুয়েস্ত্রাতে? ফলের চেয়ে সুন্দর ফুটবলের উপহারে দর্শককে বিনোদিত করার সেই রোমান্টিসিজমে আর বিশ্বাস নেই লিওনেল স্কালোনি বা লিওনেল মেসিদের। এখন চলছে লা স্কালোনিতা যুগ। দরকার হলে পাসের পর পাস খেল, শারীরিক ফুটবল খেল, প্রতিপক্ষের আক্রমণ যেকোনো মূল্যে নস্যাৎ করো। ম্যাচ শেষে স্কোরলাইনটা যেন আমাদের হয়েই কথা বলে।
লা স্কালোনিতার সাফল্য নিয়ে আপনার বিতর্ক করারও কিছু নেই। এই ফুটবলই তো গত পাঁচটি বছর ধরে সাফল্যের সুন্দরতম ফসল ফলাচ্ছে মাঠে। ২০২১ কোপা আমেরিকা জিতে লা ফিনালিসিমায় জয়ের হাসি। ক’মাস পরই ৩৬ বছরের হাহাকার ঘুচিয়ে বিশ্বকাপ জয়। দু’বছরের মাথায় আবার কোপা আমেরিকা জয়। তার দুই বছর পর আবারও বিশ্বকাপ ফাইনালের মঞ্চে। সুতরাং মেসি যদি বলে থাকেন গত পাঁচ বছরে তারাই পৃথিবীর সুন্দরতম ফুটবল খেলছেন, ভুল তো কিছু বলেননি।
এই ফুটবলের রেসিপিটা হলো দলের মধ্যে দৃঢ়বদ্ধ ঐক্য ধরে রাখা। মাঠে নেমে সর্বস্ব উজাড় করে দেওয়া। ম্যাচের পরিস্থিতি বুঝে কৌশল প্রয়োগ। আর সবচেয়ে প্রয়োজনের মুহূর্তে ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের সর্বোত্তম প্রদর্শন। এরই যোগফল ৪ জুলাই মায়ামিতে কেপ ভার্দের দুর্মর লড়াইয়ের বিপক্ষে মেসিদের অবিশ্বাস্য জয়। এটিই তিন দিন পর মিসরের বিপক্ষে রূপকথার মতো প্রত্যাবর্তনের গল্প লিখে আর্জেন্টিনাকে পেরিয়ে দিয়েছে শেষ ষোলোর বাধা। এই মন্ত্রই ৭ জুলাই কানসাস সিটিতে অনমনীয় সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে শেষ আটে বিজয়ী করেছে লা আলবিসেলেস্তিকে। এই দর্শনেই আটলান্টার মার্সিডিস বেঞ্জে ইংলিশদের দ্বিতীয় শিরোপা জয়ের আর্তিকে ৬০ থেকে ৬৪ বছরে ঠেলে দিয়ে নিজেদের চতুর্থ আর টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়ের শেষ লড়াইয়ে নামছে আর্জেন্টিনা।
ইয়োহান ক্রুইফের টোটাল ফুটবলকে আত্মস্থ করে নিজেদের একটা আলাদা ঘরানা গড়ে তুলেছিল স্পেন। যার নাম তিকিতাকা। প্রতিপক্ষকে খেলতে দিও না। পাসের পর পাসের ইন্দ্রজাল বুনে তাদের ক্লান্ত করে তোলো, তারপর গোল করে ঘরে তোলো সোনার ফসল। এই পাসিং ফুটবলের পসরা সাজিয়েই স্পেন ২০১০ সালে ঘরে নিয়ে গিয়েছিল তাদের আজন্ম লালিত প্রথম বিশ্বকাপ। এরপর বারবার প্রমাণ হয়েছে পাসিংই শেষকথা নয়। ম্যাচ জেতায় গোল, আর সেজন্য খেলতে হয় ডিরেক্ট ফুটবল। লুইস দে লা ফুয়েন্তে সার বুঝে সেভাবেই খেলাচ্ছেন দলকে। ২০২৩ ইউরোপিয়ান নেশনস কাপ জয়ের পরের বছর ইউরো জয়। অতঃপর দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালেও তুলে আনলেন লা ফুরিয়া রোহাদের। এই ফাইনালে যদি রক্তলাল গোলাপের সৌরভ ছড়িয়ে শেষ হাসিটা হাসে দে লা ফুয়েন্তের ছাত্ররা, নিশ্চিত থাকুন ফুটবলের পৃথিবীতে কায়েম হবে ‘ফুয়েন্তেবাদ’।
ফুয়েন্তেবাদটা কী? তিকিতাকাকে দূরে ঠেলে একটু বেশি গোলমুখী কার্যকর ফুটবল। অর্থাৎ দলের রক্ষণটাকে দুর্ভেদ্য প্রাচীর বানাও। ব্যাকলাইনের ওপরে বসাও দুই প্রহরীর সজাগ পাহারা। মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যুক্ত হও আক্রমণে। সঙ্গে দুই দ্রুতগতির উইঙ্গারকে কাজে লাগিয়ে আক্রমণ করো। গোল আসবেই। এই দর্শনেই সাত ম্যাচে মাত্র একটিবারের জন্য বল ঢুকতে পেরেছে তাদের পোস্টে। এই স্টাইলেই সব বাধা পেরিয়ে তারা ফাইনালে। সেমিফাইনালে ফুয়েন্তেবাদের কাছেই ধ্বংস হয়ে ফিরে যেতে হয়েছে অদম্য ফ্রান্সকে।
এবারের বিশ্বকাপের আট কোয়ার্টার ফাইনালিস্টের ৬টিই ইউরোপীয় দেশ। চার বছর আগে কাতারের বিশ্বকাপ কোয়ার্টার ফাইনালে আট দলের পাঁচটিই ছিল ইউরোপের। কালের নিয়মে, অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বিশ্ব ফুটবলের ইউরোপীয়করণ হচ্ছে। এখন ইউরোপের ফুটবল কারখানায় উৎপাদিত যান্ত্রিক ফুটবল শাসন করছে ফুটবলবিশ্ব। এটাই বেশির ভাগ ফুটবল বিশেষজ্ঞ বলছেন।
তবুও কিছু কথা থেকে যায়। কোথায় যেন নিজস্ব ঘরানার অস্তিত্ব তির তির করে বয়ে চলা স্রোতের মতো অবিনাশী থাকে। লাতিন স্টাইলকে আপনি মুছে ফেলতে পারবেন না। যেখানে মুহূর্তের ঔজ্জ্বল্য চিরস্থায়ী ছাপ রেখে যায়। হ্যাঁ, মেসির শরীরে আর্জেন্টাইন রক্ত প্রবাহিত হলেও তাঁর ফুটবল পরিপুষ্ট বার্সেলোনার লা মাসিয়ায়। কিন্তু লা মাসিয়া ওই পাসিং ফুটবলের দর্শন কোত্থেকে ধার করেছে? উত্তর লাতিন আমেরিকা থেকে। আসলে বিশ্বফুটবল এখন ‘দেবে আর নেবে, মেলাবে মিলিবে’ তত্ত্বকথার বাস্তব প্রতিফলন। ক্রীড়া বিজ্ঞানের চূড়ান্ত।
তারপরও সাফল্যের বিচারে একটি ধারেই এখানে প্রতিষ্ঠিত হতে পারছে না। কারণ ভেতরে ভেতরে ফুটবলারদের ডিএনএতে নিজস্বতা কিংবা বৈচিত্র্য গেঁথে আছে। ২০১০ বিশ্বকাপ ফুটবল চলাকালে একবার কেপটাউন থেকে ঘুরতে গিয়েছিলাম নিকটবর্তী কেপ অব গুড হোপ বা উত্তমাশা অন্তরীপে। অনেক উঁচুতে, লাইটহাউসের পাশে দাঁড়িয়ে চোখ রেখেছিলাম আটলান্টিক মহাসাগর ও ভারত মহাসাগরের মিলন মোহনায়। দুটি স্রোতধারার মিলনেও ধূসর রঙের ভারত মহাসাগরের স্রোতকে আটলান্টিকের নীল স্রোত থেকে ঠিকই আলাদা করা যায়।
বিশ্বফুটবলটাও ঠিক এমনই। সব ঘরানা মিলেমিশে একাকার। তবু কোথায় যেন আলাদা সত্তা ভেতরে ভেতরে প্রবহমান। মেসি তো দুই ঘরানারই ফসল। তারপরও তাঁর পায়ে কিংবা শরীরে যেন আর্জেন্টিনার লা নুয়েস্ত্রারই জয়গান। দেখা যাক, আজ ১৯ জুলাইয়ের রাতে আর্জেন্টিনার লা নুয়েস্ত্রা না স্পেনের রূপান্তরিত তিকিতাকার জয় হয়। সূত্র : সমকাল