১৮ হাজার বন্দির পুনর্বাসনে যুক্ত হচ্ছে মাদক অধিদপ্তর
নিজস্ব প্রতিবেদক
১৬ আগস্ট, ২০২৬, 11:32 AM
নিজস্ব প্রতিবেদক
১৬ আগস্ট, ২০২৬, 11:32 AM
১৮ হাজার বন্দির পুনর্বাসনে যুক্ত হচ্ছে মাদক অধিদপ্তর
মাদক মামলায় কারাগারে থাকা মাদক কারবারি, বাহক ও মাদকাসক্ত বন্দিদের চিকিৎসা, কাউন্সেলিং ও হাতে-কলমে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সমাজের মূলধারায় ফিরিয়ে আনতে চায় সরকার। তাই বিশেষায়িত চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কার্যক্রম চালুর পরিকল্পনা করেছে কারা অধিদপ্তর। মাদক কারবারি ও মাদকাসক্তদের জন্য বিশেষ কারাগার প্রস্তুত করে তাদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। এ কর্মসূচিতে কারিগরি সহায়তাসহ মাদক অপরাধীদের চিকিৎসা-পুনর্বাসনের কাজ করবে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)।
কারা অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গত ২৯ জুলাই পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন কারাগারে আটক বন্দি ৯৩ হাজার ৪৪০ জন। এর মধ্যে মাদক-সংক্রান্ত মামলায় শনাক্ত বন্দির সংখ্যা ১৭ হাজার ৮১৯। তাদের মধ্যে পুরুষ ১৭ হাজার ২২৬ এবং নারী ৫৯৩ জন। বিপুলসংখ্যক এই বন্দির জন্য কারাগারে পৃথক মাদক অপরাধীদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নেই। এমনকি কারাগারগুলোতে মাদক-সংশ্লিষ্ট বন্দিদের চিকিৎসায় বিশেষায়িত চিকিৎসকও নেই।
গত মাসে অনুষ্ঠিত জেলা প্রশাসক সম্মেলনে কারাগারে থাকা মাদক-সংক্রান্ত মামলায় বন্দিদের চিকিৎসা, কাউন্সেলিং ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এরই অংশ হিসেবে ডিএনসির কাছে মতামত ও কারিগরি সহায়তা চেয়েছে কারা অধিদপ্তর। এর আগে গত ১৩ মে ডিএনসির মহাপরিচালকের কাছে পাঠানো চিঠিতে ফেনী জেলা কারাগার-২ ও কিশোরগঞ্জ জেলা কারাগার ২-এ মাদকাসক্ত, মাদক বহনকারী ও মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত বন্দিদের সংশোধন ও পুনর্বাসনে বিশেষজ্ঞ সহায়তা চাওয়া হয়।
চিঠিতে বলা হয়, এসব বন্দির আচরণ ও আসক্তির ধরন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কারামুক্তির পর পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা ঠেকাতে নিবিড় কাউন্সেলিং ও বিশেষায়িত পুনর্বাসন জরুরি।
এখন মাদকাসক্ত, মাদক বহনকারী ও মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত বন্দিদের সংশোধন ও পুনর্বাসনে পাঁচটি বিশেষায়িত মাদক কারাগার প্রস্তুত করা হচ্ছে। এরই মধ্যে ফেনী জেলা কারাগার-২ এবং কিশোরগঞ্জ জেলা কারাগার-২ মাদকের বন্দিদের জন্য চালু হয়েছে। বাকি কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-১, মাদারীপুর জেলা কারাগার-২ এবং পিরোজপুর জেলা কারাগার-২ প্রস্তুত করা হবে। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় মানিকগঞ্জ জেলা কারাগারকে মাদক অপরাধে জড়িত বন্দিদের চিকিৎসার জন্য বিশেষভাবে প্রস্তুত করা হবে। এরই মধ্যে ডিএনসির লোকজনের এসব কারাগার পরিদর্শন শেষে তাদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ অনুযায়ী এগুলো প্রস্তুত করা হচ্ছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফ বলেন, মাদক অপরাধে জড়িত বন্দিদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের জন্য কারাগারেই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। ডিএনসি থেকে কারাগার পরিদর্শনও করা হয়েছে। কারা অধিদপ্তরের সক্ষমতা কিছু রয়েছে। এ ছাড়া ডিএনসির সহযোগিতার পাশাপাশি স্বাস্থ্য বিভাগের সহযোগিতা লাগবে। মাদকের বন্দিদের পরামর্শসহ বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।
কারা কর্মকর্তারা বলছেন, মাদক-সংক্রান্ত মামলার বন্দিদের শুধু কারাগারে আটক রেখে শাস্তি দিলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। মাদক অপরাধে জড়িতদের চিকিৎসা, মানসিক কাউন্সেলিং এবং প্রয়োজনীয় দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ দিতে হবে। একই সঙ্গে কারাগার থেকে মুক্তির পর যাতে তারা ফের মাদকে জড়িয়ে না পড়েন, সে জন্য পুনর্বাসন কার্যক্রমও জরুরি।
ডিএনসিতে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়, প্রস্তাবিত কর্মসূচিতে প্রথমে বন্দিদের প্রাথমিক স্ক্রিনিং ও শারীরিক পরীক্ষা করা। আসক্তির মাত্রা নির্ধারণের পর প্রয়োজন অনুযায়ী বন্দিদের শরীর থেকে ক্ষতিকর বিষাক্ত পদার্থ দূর করা ও চিকিৎসা দেওয়া। এ ক্ষেত্রে ডিএনসির চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞদের কারিগরি নির্দেশনা নেওয়া এবং প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সময় অনুযায়ী কারাগার পরিদর্শনের ব্যবস্থা করার পরিকল্পনা রয়েছে। চিকিৎসার পাশাপাশি বন্দিদের মানসিক পরিবর্তনে ব্যক্তিগত ও দলীয় কাউন্সেলিং, মোটিভেশনাল সেশন এবং মনোবিজ্ঞানীদের সম্পৃক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে। কারাগারের ভেতরে মাদকবিরোধী সচেতনতামূলক সভা, সেমিনার ও প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনীরও আয়োজন করা হবে।
পুনর্বাসনের অংশ হিসেবে আইসিটি, হস্তশিল্প, টেইলারিং, গ্রাফিক্সসহ বিভিন্ন কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রশিক্ষণ শেষে প্রাতিষ্ঠানিক সনদ দেওয়ার মাধ্যমে কারামুক্ত বন্দিদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির উদ্যোগ থাকবে। এর মূল লক্ষ্য হলো, মুক্তির পর তারা যাতে বৈধ উপায়ে আয় করতে পারেন এবং পুনরায় মাদক বা অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে না পড়েন।
এ ছাড়া বন্দিদের অপরাধের ধরন, আসক্তির মাত্রা এবং চিকিৎসা ও প্রশিক্ষণে অগ্রগতি পর্যালোচনায় যৌথ পর্যবেক্ষণ কমিটি গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। দুই অধিদপ্তরের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদানের জন্য ডেটা শেয়ারিং ব্যবস্থাও গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
কর্মকর্তারা মনে করছেন, শুধু কারাভোগের মাধ্যমে মাদকাসক্ত বন্দিদের সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। বন্দিদের বিশেষায়িত চিকিৎসা, মানসিক সহায়তা ও দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ দেওয়া গেলে সুস্থ জীবনে ফেরার সুযোগ তৈরি হবে। পাশাপাশি কারাগার থেকে বের হওয়ার পর পুনরায় মাদক অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি কমবে। তবে কর্মসূচি কার্যকর করতে প্রয়োজনীয় জনবল, বিশেষায়িত চিকিৎসক, কাউন্সেলর, প্রশিক্ষণ অবকাঠামো নিশ্চিত করা জরুরি।
মাদক মামলায় কারাগারে থাকা বন্দিদের বেশির ভাগের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা থাকে। জামিনে কারামুক্ত হয়ে অনেক বন্দি একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। তাই মাদক বন্দিদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের জন্য মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরকে যুক্ত করা হচ্ছে।
কারা অধিদপ্তরের কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন বলেন, মাদক অপরাধে জড়িত বন্দিদের কারাগারে আটকে রেখে লাভ নেই। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের লোকজনকে সংযুক্ত করে বন্দিদের চিকিৎসার পাশাপাশি মানসিক পরিবর্তনে ব্যক্তিগত ও দলীয় কাউন্সেলিং, মোটিভেশনের ব্যবস্থা করা হবে। কারাগারের ভেতরে মাদকবিরোধী সচেতনতামূলক সভা, সেমিনার, প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনীসহ সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা ও তাদের জীবনযাত্রায় নিয়মানুবর্তিতা আনার চেষ্টা করা হবে। সূত্র : দৈনিক সমকাল