হাজার হাজার লিটার তেল চুরির হোতা বিআইডব্লিউটিএ’র নজরুল
০১ জুলাই, ২০২৬, 11:36 AM
NL24 News
০১ জুলাই, ২০২৬, 11:36 AM
হাজার হাজার লিটার তেল চুরির হোতা বিআইডব্লিউটিএ’র নজরুল
যুগ্ম পরিচালক সবুর খানের যোগসাজশেই ঘটে এই দুঃসাহসিক চুরি
পর্ব-০১
উজ্জল হোসেন : বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) এর নৌ-সংরক্ষণ ও পরিচালন বিভাগে দীর্ঘদিন ধরে জাহাজের তেল চুরি, ভুয়া বিল এবং প্রকল্পের অনিয়ম সংক্রান্ত দুর্নীতির অতল গহ্বরে নিমজ্জিত| বিভিন্ন প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের যোগসাজশে প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন জাহাজে তেল চুরি, ঠিকাদারি দুর্নীতি এবং অনিয়মের মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে| আর এই সমস্থ অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন চাঁদপুর নদী বন্দরের টাগবোট দুর্দান্ত জাহাজের মাস্টার নজরুল ইসলাম| তিনি নৌ সংরক্ষন ও পরিচালন বিভাগের চাঁদপুর এর যুগ্ম-পরিচালক মোঃ সবুর খানের সাথে যোগসাজশ করেই প্রকাশ্যেই সরকারি হাজার হাজার লিটার তেল চুরির দুঃসাহসিক ঘটনা ঘটিয়ে পুরো টাকা আত্মসাৎ করেছেন| ইতিপূর্বেও জ্বালানি তেল সরবরাহের ঠিকাদারি কাজ ও জ্বালানি তেল সংগ্রহে ঘুষ গ্রহণের ভিডিও ক্লিপ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে এই দপ্তর এবং জনমনে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়| এর প্রেক্ষিতে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে নৌসংরক্ষণ ও পরিচালন বিভাগের একাধিক কর্মকর্তাকে শুধুমাত্র সাময়িক বরখাস্ত করা হয়| তবে দপ্তরের একাধিক কর্মকর্তারা জানান, গুরুতর অপরাধ করার পরেও শুধুমাত্র লঘুদণ্ড আরোপিত হওয়ার ফলে এই ধরনের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা আরও নতুন উদ্যমে দুর্নীতি করতে উৎসাহী হয়ে পড়ছে| আর এ ধরনের অপকর্মের ফলে বিআইডব্লিউটিএ’র অর্জিত সুনাম আজ ধুলোয় মিশিয়ে যাচ্ছে| এত দুর্নীতি এবং অপকর্মের পরে নতুন করে আবারোও যুক্ত হয়েছে চাঁদপুর নদী বন্দরের টাগবোট দুর্দান্ত জাহাজের মাস্টার নজরুল ইসলামের তেল চুরির নতুন ভিডিও প্রকাশের পরে| সরকারি প্রতিষ্ঠান বিআইডব্লিউটিএ’র চুরির মহা উৎসব এর লাগাম ধরবে কে ? গত ১৭ জুন ২০২৬ তারিখে নৌ পরিবহন মন্ত্রণালযয়ের সভায় জ্বালানি সাশ্রয়ের সিদ্ধান্তের পরও বিআইডব্লিউটিএ চাঁদপুর নদী বন্দরের জাহাজ দুর্দান্ত থেকে ৪৪ হাজার লিটার তেল চুরি করে বিক্রি করে দেওয়ার ভিডিও সংরক্ষিত| বিশ্ব জ্বালানি মন্দার কারণে দেশে জ্বালানি সংকট অস্থিরতায় বিআইডব্লিউটিএর নির্ধারিত ঠিকাদার চাহিদার আলোকে জ্বালানি সরবরাহ করতে পারছে না বিধায় বিআইডব্লিউটিএ এর চেয়ারম্যান জনগণের সেবা নিশ্চিত করনের জন্য সকল জাহাজে সরাসরি সরকারিভাবে ডিপো থেকে জ্বালানি (ডিজেল ও লুব-ওয়েল) গত ১৬ মার্চ ২০২৬ তারিখে ক্রয় করার আদেশ দেন| এরই আলোকে বিআইডব্লিউটিএ চাঁদপুর নদী বন্দরের সকল জ্বালানি চাঁদপুর ডিপো থেকে গত ১৮ মার্চ ২০২৬ তারিখ থেকে ধাপে ধাপে ৯ হাজার লিটার করে ডিজেল ও লুব অয়েল তিন ধাপে ২৭ হাজার লিটার ডিজেল এবং এক ধাপে ১৭ হাজার লিটার ডিজেল সর্বমোট ৪৪ হাজার লিটার ডিজেল সংগ্রহ করে থাকে| এসব জ্বালানিগুলো যেসব জাহাজে সরবরাহ করা হয়েছে তা বাস্তবে নয় শুধুমাত্র কাগজে| জাহাজগুলো হলো উদ্ধারকারী জাহাজ রুস্তমকে ৮০০০ লিটার ডিজেল, ওয়ার্কবোর্ড কপোতকে ৩০০০ লিটার ডিজেল ও আড়িয়াল খাঁ কে ৫০০০ লিটার ডিজেল, টাগবোট দুর্দান্তকে ২৬ হাজার লিটার ডিজেল, এসএমবি-৩ মার্কিং বোটকে ২০০০ লিটার ডিজেল দেখিয়ে সর্বমোট ৪৪ (চুয়াল্লিশ) হাজার লিটার ডিজেল ও লুব ওয়েল সরবরাহের নামে সরকারের সংকটনাপন্ন সময়ে সেবা নিশ্চিত কল্পে জ্বালানি ডিজেল ভাগবাটোয়ারার মাধ্যমে ৯৫ টাকা দরে ৪১ লক্ষ ৮০ হাজার টাকার ডিজেল চুরি করে বিক্রির মাধ্যমে সরকারের জ্বালানি টাকা আত্মসাৎ করে| খোঁজ নিয়ে জানা জায়, গত ১৮ মার্চ ২০২৬ তারিখ হতে অদ্যাবধি পর্যন্ত বিআইডব্লিউটিএ এর উদ্ধারকারী জাহাজ রুস্তম ও টুইং টাগ জাহাজ দুর্দান্ত কোথাও কোন উদ্ধার অভিযান বা নৌযান উদ্ধারের কাজে কার্যক্রম করেনি তাহলে কোথায় এই জ্বালানি খরচ হলো ? এবং মার্কিন কাজ করার এসএমবি-৩ বোটটিও কোথাও চালানো হয়নি যদিও ঈদ উপলক্ষে যেসব মার্কিন কাজ করা হয়েছে তাহারা ভাড়াকৃত মার্কিং বোর্ড দিয়ে কাজ পরিচালনা করেছে এবং কাজের বাবদ ভাড়াটিয়া মার্কিং বোট (নৌকা) কে গত তিন মাসে ৪৫ হাজার টাকা হারে ১(এক) লক্ষ ৩৫ হাজার টাকা ভাড়া দেওয়া হয়েছে| মোট কথা হল ৪৪ হাজার লিটার ডিজেলের মধ্যে সম্পূর্ণটাই চুরি করে বিক্রি করে দেন যুগ্মœ-পরিচালক সবুর খান এবং মাস্টার নজরুল ইসলাম| এরই মধ্যে গত ১৬ জুন ২০২৬ তারিখে নতুন করে ৩০০০ হাজার লিটার ডিজেল সরবরাহের আদেশ দিলে তা জাহাজের মাস্টার কৌশল করে সরবরাহ গ্রহণ করেনি, এই চুরির ব্যাপারে অনুসন্ধানে জানা যায়, টাগবোট দুর্দান্ত জাহাজের মাস্টার নজরুল ইসলাম নিজেই পাহারা দিয়ে গত ৩০ মে ২০২৬ ইং তারিখে রাত্রে দশটা থেকে ভোর পর্যন্ত চাঁদপুরের তেল ব্যবসায়ী সুমনের ট্যাঙ্কারের মাস্টার আঃ কাশেমকে সরাসরি একটি কালো পাইপ দিয়ে পাম্প মেশিনের মাধ্যমে নিয়ে যেতে দেখা যায়| অথচ আইন অনুযায়ী জাহাজের ইঞ্জিন রুমের সমস্ত দায়িত্ব ড্রাইভারের এখানে মাস্টারের কোন এখতিয়ার নেই ইঞ্জিন রুমে প্রবেশ করার| এই তেল চুরির ঘটনাটি উক্ত জাহাজের কিছু কর্মচারী দেখে ফেললে তাদেরকে ১১ লক্ষ টাকা দিবে বলে বিষয়টি ধামা-চাপা দেওয়ার চেষ্টা করে| অনুসন্ধানে জানা যায়, পরেরদিন সকালে তেল ব্যবসায়ী সুমনের ট্যাংকারটি দুর্দান্ত জাহাজের পাশে বাধা হলে কর্মচারীরা ক্ষিপ্ত হয়ে যায় এবং তাদের সাথে হট্টগোল করে| সূত্রমতে এত কিছু ঘটার পরও কতিপয় কর্মচারী চাকরির ভয় উপেক্ষা করে গোপনে মাস্টার নজরুলের সাগর চুরি তেল বিক্রির ব্যাপারে নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা যুগ্ম-পরিচালক সবুর খানকে জানালেও কোন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, উল্টো যেসব কর্মচারীরা নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা সবুর খানকে জানিয়েছেন তাদেরকে যুগ্ম-পরিচালক সবুর খান এবং নজরুল মাস্টার স্থানীয় লোকজন দিয়ে হুমকি-ধমকি দিচ্ছে এবং বদলি ও চাকরি খেয়ে ফেলবে বলে ভয় ভীতি দেখাচ্ছে| জানা যায়, মাস্টার নজরুল স্থানীয় চাঁদপুর সদর এলাকার বাসিন্দা হওয়ায় কর্মচারীরা এ বিষয় নিয়ে মারাত্মক আতঙ্কে রয়েছেন| বিআইডব্লিউটিএর দুর্নীতির মাত্রা দিন দিন প্রকোপ হারে বেড়েই চলেছে এর লাগাম ধরার ক্ষমতা নাকি খোদ সরকারেরও নেই আর দুদকও নাকি তাদের হাতের মুঠোয়| দুর্নীতি দমন কমিশনে বিআইডব্লিউটিএ এর বিরুদ্ধে ভুরী ভুরী অভিযোগ পরে থাকে যুগের পর যুগ| বিআইডব্লিউটিএ’র এক শীর্ষ কর্মকর্তার সাথে তেল চুরির ব্যাপারে আলাপকালে তিনি জানান, সরকারি দপ্তর থেকে শুধু তেল চুরি নয় সরকারি যে কোন সম্পদ চুরি করা একটি ফৌজদারি অপরাধ| এই অপরাধে জড়িত ব্যক্তি (কর্মচারী বা বাইরের কেউ) দণ্ডবিধি (চবহধষ ঈড়ফব), দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন এবং সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালার আওতায় শাস্তিযোগ্য অপরাধী হিসেবে গণ্য হবেন| তিনি বলেন, সরকারি দায়িত্বে নিয়োজিত কোনো ব্যক্তি যদি সরকারি সম্পত্তি বা তেল আত্মসাৎ করেন, তবে তা অপরাধমূলক, বিশ্বাসভঙ্গ ও দুর্নীতি (দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর ৪০৯ ধারা ও দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন এবং কর্মচারী বা সেবকের দ্বারা চুরি (দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর ৩৮১ ধারা অনুযায়ী অপরাধী হিসেবে গণ্য হবেন এবং এই অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য যাবজ্জীবন কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ ১০ বছর সশ্রম কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডের বিধানের আওতাধীন হবেন| এছাড়াও তিনি বলেন, সরকারি কর্মচারীদের জন্য প্রণীত নিয়ম বা কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী, এই ধরনের চুরির অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিভাগীয় ব্যবস্থা হিসেবে চাকরি থেকে বরখাস্ত, পদাবনতি বা বাধ্যতামূলক অবসরের মতো শাস্তির মুখোমুখি হবেন| ৪৪০০০ হাজার লিটার তেল চুরির বিষয়ে চাঁদপুর নদী বন্দরের টাগবোট দুর্দান্ত জাহাজের মাস্টার নজরুল ইসলামের নিকট জানতে চাইলে তেল চুরির ব্যাপারে অ¯^ীকার করে বলেন তাঁর বিরুদ্ধে একটি মহল অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন| তবে তেল চুরির ভিডিও প্রকাশের বিষয়ে সংবাদ প্রকাশের বিষয়ে তিনি প্রতিবেদককে প্রকাশ না করার অনুরধ জানান| বিআইডব্লিউটিএ’র নৌ সংরক্ষন ও পরিচালন বিভাগের যুগ্ম-পরিচালক মোঃ সবুর খানের নিকট তেল চুরির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি এ বিষয়ে অবগত বলে জানালেও কোন মতামত প্রদান করতে রাজি হননি| পরবর্তীতে তিনি প্রতিবেদককে এ বিষয়ে বিআইডব্লিউটিএ’র জন সংযোগ কর্মকর্তার সাথে কথা বলতে বলেন| বিআইডব্লিউটিএ’র জনসংযোগ কর্মকর্তা মোঃ শাহাদাত হোসেনের নিকট জানতে চাইলে তিনি সবুর খানের সাথে আলাপ করে মতামত জানাবেন বললে ও পরবর্তীতে আর কোন মতামত প্রদান করেননি| পরবর্তীতে ৪৪০০০ হাজার লিটার তেল চুরি করার বিষয়ে জানতে বিআইডব্লিউটিএ’র নৌ সংরক্ষন ও পরিচালন বিভাগের পরিচালক ক্যাপ্টেন মোঃ শাহজাহানের মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন দিলেও তিনি রিসিভ করেননি| ˆদনিক মুক্তখবরের বিশেষ অনুসন্ধানে টাগবোট দুর্দান্ত জাহাজের মাস্টার নজরুল ইসলাম, জুগ্ন-পরিচালক মোঃ সবুর খান এবং বিআইডব্লিউটিএ’র চাঁদপুর নদী বন্দরের বিভিন্ন অনিয়ম এবং দুর্নীতির তথ্য উপাত্ত উঠে এসেছে যা পরবর্তী সংখ্যায় প্রকাশ করা হবে|