NL24 News
০২ এপ্রিল, ২০২৬, 10:49 AM
সাতক্ষীরায় সুন্দরবনের মধু আহরণ মৌসুম শুরু, বনদস্যু আতঙ্কে শঙ্কিত মৌয়ালরা
মনিরুজ্জামান মনি : বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ সুন্দরবনে বুধবার (১ এপ্রিল) থেকে শুরু হয়েছে চলতি মৌসুমের মধু আহরণ কার্যক্রম। দুই মাসব্যাপী এ মৌসুমকে ঘিরে সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন হলেও বনদস্যু ও জলদস্যু আতঙ্কে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় রয়েছেন উপকূলীয় এলাকার মৌয়ালরা।
বন বিভাগের নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী, ১ এপ্রিল থেকেই সুন্দরবনের বিভিন্ন পয়েন্টে মধু সংগ্রহের জন্য প্রবেশ করছেন পারমিটধারী মৌয়ালরা। প্রতি বছরের মতো এবারও শত শত মৌয়াল জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গহিন বনে প্রবেশ করবেন। তবে এবারের মৌসুমে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হয়ে দাঁড়িয়েছে বনদস্যুদের তৎপরতা।
স্থানীয়দের দাবি, সাম্প্রতিক সময়ে সুন্দরবন উপকূলে অপহরণ, মুক্তিপণ আদায় ও চাঁদাবাজির ঘটনা বেড়েছে। এর ফলে অনেক মৌয়াল মধু আহরণে যেতে অনাগ্রহী হয়ে পড়েছেন। সাতক্ষীরার গাবুরা ইউনিয়নের এক মৌয়াল জাহিদুর রহমান বলেন, বনদস্যুদের বিষয়ে প্রকাশ্যে কথা বললেও পরবর্তীতে বিপদের আশঙ্কা থাকে। তাই তারা সরকারের কাছে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের মৌয়াল হাফিজুর রহমান জানান, আগে এক-দুটি দস্যু বাহিনীকে টাকা দিলেই চলত, এখন পাঁচ-ছয়টি বাহিনী সক্রিয় হয়ে উঠেছে। অনেক সময় মৌসুম শুরুর আগেই অবৈধভাবে মধু সংগ্রহ হয়ে যায়, ফলে প্রকৃত মৌয়ালরা কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ মধু পান না। মহাজনের কাছ থেকে টাকা নিয়ে বনে যেতে হয়, কিন্তু মধু না পেলে ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে ফিরতে হয়।
শ্যামনগর উপকূলীয় এলাকার আরও কয়েকজন মৌয়াল জানান, আগে বাঘ ও কুমিরের ভয় থাকলেও এখন বনদস্যুদের ভয়ই সবচেয়ে বেশি। পরিবার-পরিজনের নিরাপত্তার কথা ভেবে অনেকে এবার মধু আহরণে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
এদিকে মৌয়ালদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে বাড়ানো হয়েছে নজরদারি। বন বিভাগ জানিয়েছে, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে কোস্টগার্ড ও অন্যান্য বাহিনীর যৌথ টহল জোরদার করা হয়েছে।
অন্যদিকে, সাতক্ষীরার শ্যামনগরে আনুষ্ঠানিকভাবে মধু আহরণ মৌসুমের উদ্বোধন করেছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম। বুধবার সকাল সাড়ে ১১টায় শ্যামনগরের বুড়িগোয়ালিনী ফরেস্ট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি প্রধান অতিথি হিসেবে মৌসুমের উদ্বোধন করেন। এর আগে তিনি বনজীবীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।
অনুষ্ঠানে প্রতিমন্ত্রী বলেন, “আপনি সুন্দরবনে ডাকাতি করবেন আর আপনার সন্তান ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হবে, এটা সম্ভব না। আপনি খারাপ কাজ করে সন্তানকে খাওয়ালে সেই সন্তানও খারাপ পথে যাবে। তাই কারও উচিত নয় মধুতে ভেজাল দেওয়া কিংবা অন্যায় কাজে জড়ানো।”
তিনি আরও বলেন, সুন্দরবন উপকূলের মানুষের জীবিকার অন্যতম প্রধান উৎস এই মধু। সরকার বনজীবীদের নিরাপত্তা ও জীবনমান উন্নয়নে বদ্ধপরিকর। পাশাপাশি বন বিভাগকে মৌয়ালদের সুবিধার্থে নিয়মিত তদারকি বাড়ানোর নির্দেশ দেন।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন পশ্চিম সুন্দরবন বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এ জেড এম হাছানুর রহমান। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গাজী নজরুল ইসলাম, আফরোজা আখতার, মোঃ আরেফিন জুয়েল, এইচ. এম. রহমত উল্লাহ পলাশ এবং ড. মোঃ মনিরুজ্জামান। উদ্বোধনের পর থেকেই পারমিটধারী মৌয়ালরা সুন্দরবনের বিভিন্ন অভিমুখে যাত্রা শুরু করেছেন।