ঢাকা ০৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
সংবাদ শিরোনাম
রাজধানীতে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে: ডিএমপি কমিশনার ১৩ ফেব্রুয়ারির মধ্যেই নির্বাচনের চূড়ান্ত ফল ঘোষণা: ইসি আনোয়ারুল মধ্যরাতে শুরু হচ্ছে মোটরসাইকেল চলাচলে ৭২ ঘণ্টার নিষেধাজ্ঞা ভোটকেন্দ্রে মোবাইল নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবি সাদিক কায়েমের কর আদায় না বাড়িয়ে পে-স্কেল বাস্তবায়নে মূল্যস্ফীতি বাড়বে: গভর্নর ভোটকেন্দ্রে মোবাইল ফোন নিষিদ্ধের সিদ্ধান্তে হাসনাতের প্রতিক্রিয়া দেশের বাজারে ফের বাড়ল স্বর্ণের দাম, ভরি কত নাটোরে বসতঘরে আগুন লেগে মা-মেয়ের মৃত্যু সন্ধ্যায় বিটিভিতে ভাষণ দেবেন তারেক রহমান নির্বাচনি অপরাধের দ্রুত বিচারে ৫ দিনের জন্য ৬৫৭ বিচারক নিয়োগ

শেষবেলায় চুক্তি-কেনাকাটার হিড়িক

#

নিজস্ব প্রতিবেদক

০৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬,  10:54 AM

news image

বিপুল দায়দেনার বোঝা পড়বে নতুন সরকারের ওপর

জাতীয় নির্বাচনের আর মাত্র তিন দিন বাকি। সবকিছু ঠিক থাকলে অন্তর্বর্তী সরকারের ভেতরে প্রায় বিদায়ের সুর। উপদেষ্টাদের অনেকে চলে যাওয়ার ‘মুডে’ আছেন। ঠিক এই সময়ে বড় বড় কেনাকাটা আর চুক্তির জোর তৎপরতাও থেমে নেই। তফসিল ঘোষণার পর সাধারণত সরকারের ‘রুটিন কাজ’ করার কথা। উল্টো শেষ সময়ে একের পর এক বড় অঙ্কের চুক্তি ও ব্যয়বহুল প্রকল্প অনুমোদনের হিড়িক পড়েছে, যা নিয়ে এখন দেশজুড়ে চলছে সমালোচনা ও বিতর্ক। যেসব চুক্তি রাজনৈতিক সরকারের করার কথা, সেগুলো তড়িঘড়ি করে অন্তর্বর্তী সরকারই সম্পন্ন করে যাচ্ছে। চীন ও যুক্তরাজ্যের সঙ্গে নৌযান ক্রয়ের চুক্তি, ৩৭ হাজার কোটি টাকায় ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ ক্রয়সহ নন-ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্টের আওতায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি, নতুন বৃহৎ প্রকল্প অনুমোদন—একের পর এক করে যাচ্ছে সরকার।

এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে এক লাখ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ের প্রস্তাবিত নবম পে স্কেল বাস্তবায়নের চাপ, বিপুল বৈদেশিক ও অভ্যন্তরীণ ঋণ, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও খেলাপি ঋণের বোঝা। ভঙ্গুর অর্থনীতির এই বাস্তবতায় এসব দায় কাঁধে নিয়েই দায়িত্ব নিতে হবে নতুন সরকারকে—যা শুরুতেই তাকে এক কঠিন অগ্নিপরীক্ষার মুখে ঠেলে দিচ্ছে। অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা সতর্ক করে দিচ্ছেন, এসব ‘দায় বহন’ করেই দায়িত্ব নিতে হবে নতুন সরকারকে, যা শুরু থেকেই তাকে কঠিনতম এক অগ্নিপরীক্ষার মুখে ঠেলে দেবে।

তফসিল-পরবর্তী হিড়িক : প্রকল্প, চুক্তি ও রাজনৈতিক প্রভাবের প্রশ্ন

নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর অন্তর্বর্তী সরকারের কাজ হওয়ার কথা ছিল শুধু রুটিন দৈনন্দিন পরিচালনা ও নির্বাচনী পরিবেশ নিশ্চিত করা। কিন্তু গত ২৫ দিনে (১ ডিসেম্বর থেকে ২৫ জানুয়ারি) তড়িঘড়ি করে এক লাখ ছয় হাজার ৯৯৩ কোটি টাকা ব্যয়ের ৬৪টি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৭৯ হাজার ৩৫৬ কোটি টাকার ৪০টি প্রকল্পই সম্পূর্ণ নতুন। দেড় বছর মেয়াদে এই সরকার মোট ১৩৫টি নতুন প্রকল্প হাতে নিয়েছে, যার মোট ব্যয় ধরা হয়েছে দুই লাখ তিন হাজার কোটি টাকা। সাধারণত রাজনৈতিক সরকারের আমলে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর একনেক সভা বন্ধ থাকত। কিন্তু এই সরকারের আমলে তফসিল ঘোষণার পরও একনেক সভায় এক সপ্তাহে একাধিক মেগাপ্রকল্প অনুমোদন দিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করে।

বিশ্লেষকদের মতে, শেষ মুহূর্তে অনুমোদন পাওয়া এ রকম কিছু প্রকল্পের মাধ্যমে নির্দিষ্ট কিছু এলাকার রাস্তাঘাট ও গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন করে কোনো বিশেষ দল বা প্রার্থীকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। তবে সরকারি পক্ষ এসব দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলছে, এগুলো দেশের উন্নয়নের জন্য জরুরি কাজ।

অর্থনীতিবিদদের সতর্কতা : ‘নির্বাচিত সরকারের হাত-পা বাঁধা হচ্ছে’

অর্থনীতিবিদ ও গবেষকরা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের এমন কাজ ‘সমীচীন’ ছিল না। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, ‘যে চুক্তিগুলো জরুরি নয় এবং দীর্ঘমেয়াদি, সেগুলো অন্তর্বর্তী সরকারের এড়িয়ে যাওয়া উচিত ছিল। বড় কোনো অর্থনৈতিক ও নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গেও প্রয়োজনীয় আলোচনা করা হয়নি। নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এই কাজগুলো সম্পন্ন করতে পারত।’

যেসব বড় চুক্তি নিয়ে বিতর্ক

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি : যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যচুক্তি আজ সোমবার ওয়াশিংটনে স্বাক্ষরিত হতে যাচ্ছে। এর আওতায় বাংলাদেশি পোশাক রপ্তানিতে শুল্কছাড়ের পথ তৈরি হতে পারে। তবে আগে স্বাক্ষরিত একটি ‘নন-ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্ট’-এর কারণে চুক্তির শর্তাবলি এখনো গোপন রাখা হয়েছে।

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর মোট ৩৫ শতাংশ শুল্ক বহাল থাকলেও প্রস্তাবিত চুক্তির আওতায় মার্কিন কাঁচামাল বা তুলা ব্যবহার করে তৈরি পোশাকে বড় ধরনের শুল্কছাড় পাওয়ার প্রত্যাশা করা হচ্ছে।

বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন জানিয়েছেন, অতিরিক্ত সচিব খাদিজা নাজনীনের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের প্রতিনিধিদল চুক্তি সই অনুষ্ঠানে সরাসরি অংশ নেবেন; তবে আগে স্বাক্ষরিত একটি ‘নন-ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্ট’-এর কারণে চুক্তির শর্তাবলি এখনই প্রকাশ করা হচ্ছে না।

এই চুক্তির ফলে ২০ শতাংশ ‘রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ’ থেকে অব্যাহতি পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে বাংলাদেশ এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ২৫টি বোয়িং উড়োজাহাজ, গম, সয়াবিন, তুলা ও এলএনজি আমদানির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং পাঁচ বছরে ৩৫ লাখ টন গম আমদানির চুক্তিও সম্পন্ন করেছে।

৩৭ হাজার কোটি টাকায় ১৪ বিমান কেনা হচ্ছে বোয়িং থেকে

বাণিজ্য উপদেষ্টা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন এই চুক্তির অংশ হিসেবে বোয়িং থেকে নতুন ২৫টি উড়োজাহাজ কেনার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ। তবে আপাতত বোয়িং থেকে ১৪টি উড়োজাহাজ কিনতে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার কোটি টাকা বাংলাদেশের সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে।

বিমান ও সরকারি উচ্চপদস্থ সূত্রগুলো জানায়, উড়োজাহাজবহর আধুনিকীকরণ জাতীয় স্বার্থে প্রয়োজনীয় হলেও ভোটের ঠিক আগে এমন তাড়াহুড়া ও জবাবদিহির অভাব নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। উড়োজাহাজগুলো সরবরাহ শুরু হবে ২০৩১ থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে। অর্থাৎ বর্তমান সরকারের সময়ে এর কোনো সুফল পাওয়া যাবে না। বিপরীতে, সরবরাহের সময়ের মূল্যস্ফীতি ও ডলারের বিনিময়হার অনুযায়ী অর্থ পরিশোধ করতে গিয়ে বিমান বড় ধরনের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

চীন ও যুক্তরাজ্য থেকে জাহাজ কিনতে চুক্তি

বাংলাদেশ চীন থেকে চারটি নতুন জাহাজ কেনার ফ্রেমওয়ার্ক চুক্তি সই করেছে। গতকাল রবিবার চীন সরকারের পক্ষে রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব মো. শাহরিয়ার কাদের সিদ্দিকী যৌথভাবে চুক্তিতে সই করেন।

ঢাকার চীনা দূতাবাস জানিয়েছে, চারটি জাহাজের মধ্যে দুটি ক্রুড অয়েল মাদার ট্যাংকার এবং দুটি মাদার বাল্ক ক্যারিয়ার। এর মোট ব্যয় ২৪ কোটি ১৯ লাখ ২০ হাজার মার্কিন ডলার। এর মধ্যে দুটি ক্রুড অয়েল মাদার ট্যাংকারের জন্য ব্যয় হবে ১৫ কোটি ১৯ লাখ ৬০ হাজার মার্কিন ডলার। আর দুটি মাদার বাল্ক ক্যারিয়ার কেনায় ব্যয় হবে আট কোটি ৯৯ লাখ ৬০ হাজার মার্কিন ডলার।

একই দিনে নৌ সদর দপ্তরে যুক্তরাজ্যের সঙ্গে জিটুজি ভিত্তিতে একটি ‘অফ দ্য শেলফ’ হাইড্রোগ্রাফিক সার্ভে ভেসেল কেনার চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে।

এ ছাড়া মেয়াদের শেষ সময়ে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনাকাটার আলোচনা এবং কিছু ক্ষেত্রে চুক্তি করছে অন্তর্বর্তী সরকার। বিষয়টিকে চলমান প্রক্রিয়ার অংশ বলেছেন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান।

নবম পে স্কেল : বাড়তি এক লাখ কোটি টাকার বোঝা

অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে বড় আর্থিক দায় রেখে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হতে পারে প্রস্তাবিত নবম পে স্কেল। এই বেতন স্কেল বাস্তবায়নে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে বছরে অতিরিক্ত এক লাখ ছয় হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে। বিশ্লেষকরা বলছেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতির এই সময়ে এই বিশাল ব্যয় মেটাতে গিয়ে নতুন সরকারকে হয় নতুন করে টাকা ছাপাতে হবে, নয়তো বড় অঙ্কের ঋণ নিতে হবে, যা অর্থনীতিতে বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে।

দুর্ভাগ্যজনক সময়ে ভুল সিদ্ধান্ত : মুস্তফা কে. মুজেরি

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে. মুজেরি বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের আয়ু মাত্র কয়েক দিন, শেষ সময়ে বড় বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া অযৌক্তিক। নির্বাচন-পরবর্তী যে সরকার আসবে, তার অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ সংকুচিত করে যাচ্ছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমার মনে হয়, অর্থনীতিতে সফলতা নেই বললেই চলে। বর্তমান সরকারের নেওয়া অর্থনৈতিক নীতিগুলোর একটি সাধারণ ধরন রয়েছে। সেটি হচ্ছে, ভুল সময়ে ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া।’

বিদেশি ঋণের বোঝা ও ভবিষ্যতের চাপ

রাজস্ব ঘাটতি মোকাবেলায় বাজেট সহায়তা এবং বড় প্রকল্পগুলোতে অর্থছাড় বাড়াতে গিয়ে পূর্ববর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের মতোই বিদেশি ঋণের পথে হাঁটছে অন্তর্বর্তী সরকার, যার ফলে ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে সরকারি খাতে বৈদেশিক ঋণের দায় দাঁড়িয়েছে ৭৭ বিলিয়ন ডলারে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) হিসাব মতে, মাত্র পাঁচ বছরের ব্যবধানে এই ঋণের বোঝা প্রায় ৪৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যেখানে আইএমএফ ও সরকারের গ্যারান্টি দেওয়া ঋণ অন্তর্ভুক্ত করলে প্রকৃত দায়ের পরিমাণ আরো বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজ সতর্ক করে বলেছেন, ‘ভবিষ্যতে ঋণ পরিশোধের চাপ ৬৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে।’

সরকারের যুক্তি : ‘নতুন সরকারকে চাপমুক্ত রাখা’

এসব সমালোচনার জবাবে বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন দাবি করেন, ‘আগামী দিনে যারা ক্ষমতায় আসবে, সেই নির্বাচিত সরকারকে বাড়তি চাপমুক্ত রাখতেই অন্তর্বর্তী সরকার এই চুক্তি সম্পন্ন করে যাচ্ছে।’

সাবেক একজন অর্থসচিবের মতে, ‘মেয়াদের শেষ সপ্তাহে এসে এক লাখ কোটি টাকার বেশি আর্থিক দায় তৈরি করা প্রশাসনিক শিষ্টাচারবহিভর্ভূত। বিশেষ করে পে স্কেল বা মেগাবিমান ক্রয়ের মতো বিষয়গুলো নির্বাচিত সরকারের ম্যান্ডেট হওয়া উচিত ছিল। এখন পরবর্তী সরকারকে হয়তো শুরুতেই বড় ধরনের বাজেট ঘাটতি ও আইএমএফের কঠিন শর্তের মুখে পড়তে হবে।’

সৌজন্যে : কালের কণ্ঠ

logo

সম্পাদক ও প্রকাশক : মো. নজরুল ইসলাম