ঢাকা ০২ মার্চ, ২০২৬
সংবাদ শিরোনাম
খামেনি হত্যাকাণ্ডে পাকিস্তানজুড়ে সহিংসতা, নিহত ২৩ ভোটের ফল চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে বিএনপির আরও ৪ প্রার্থী মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি দেশের জন্য অশনিসংকেত ফেব্রুয়ারি মাসে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে ১৯.৫ শতাংশ ইরানকে কঠোর হুঁশিয়ারি সৌদিসহ মধ্যপ্রাচ্যের ৬ দেশের রকেট হামলায় ইরানে ২০ ভলিবল খেলোয়াড় নিহত টানা ষষ্ঠ দফায় বাড়ল স্বর্ণের দাম খামেনি আমাকে মারার আগেই তাকে মেরেছি: ট্রাম্প ইরানে হামলার পর তেলের দাম বেড়ে গেছে, শেয়ারে ধস ঢাকা–মাওয়া এক্সপ্রেসওয়েতে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত ১

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি দেশের জন্য অশনিসংকেত

#

নিজস্ব প্রতিবেদক

০২ মার্চ, ২০২৬,  11:07 AM

news image

মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে ক্রমবর্ধমান যুদ্ধ পরিস্থিতি শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তাকেই নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারকেও অস্থির করে তুলেছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডর হরমুজ প্রণালিতে তেল ও এলএনজিবাহী অসংখ্য ট্যাঙ্কার আটকে পড়ার খবরে নতুন করে শঙ্কা তৈরি হয়েছে আমদানিনির্ভর দেশগুলোর মধ্যে। বার্তা সংস্থাগুলো ও শিপ-ট্র্যাকিং সূত্র বলছে, উপসাগরীয় উন্মুক্ত সমুদ্রে শতাধিক জাহাজ নোঙর করে অপেক্ষা করছে নিরাপদ চলাচলের জন্য। ইতোমধ্যে কয়েকটি ট্যাঙ্কারে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাও উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

বাংলাদেশের জন্য এই পরিস্থিতি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। দেশের প্রাথমিক জ্বালানির প্রায় সবটাই আমদানিনির্ভর এবং এলএনজি আমদানির বড় অংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে, যা হরমুজ প্রণালি হয়ে পরিবহন হয়। একদিকে দেশি গ্যাস উৎপাদন কমছে, অন্যদিকে শিল্প, বিদ্যুৎ ও আবাসিক খাতে গ্যাসের চাহিদা বাড়ছে। এমন বাস্তবতায় হরমুজে সামান্য বিঘ্ন দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।

জ্বালানি মন্ত্রণালয় ও পেট্রোবাংলা ইতোমধ্যে পরিস্থিতি পর্যালোচনায় বৈঠক করেছে। সরবরাহকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ, বিকল্প রুট ও জরুরি পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। অবশ্য যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে শুধু সরবরাহ নয়, আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি, জাহাজভাড়া বৃদ্ধি এবং নিষেধাজ্ঞাজনিত জটিলতা মিলিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। চার হাজার কিলোমিটার দূরের যুদ্ধের ঢেউ যে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে সেই বাস্তবতার মুখোমুখি এখন বাংলাদেশ।

সর্বশেষ খবর অনুযায়ী বিশ্বের জ¦ালানি পরিবহনে অন্যতম সমুদ্র পথ হরমুজ প্রণালির উভয় পাশে জ¦ালানি তেল এবং এলএনজিবাহী অনেক জাহাজ আটকা পড়েছে। অপরিশোধিত তেল এবং এলএনজি বহনকারী অন্তত ১৫০টি ট্যাঙ্কার হরমুজ প্রণালির বাইরে উপসাগরীয় উন্মুক্ত সমুদ্রে নোঙর করে আছে। বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. এরফানুল হক

 বলেন, যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী জ¦ালানি পণ্যের বাজার ঊর্ধ্বমুখী থাকবে। আমাদের এলএনজি আমদানি করতে হয়। ফলে যুদ্ধের মধ্যে এলএনজি আমদানিতে কী ধরনের প্রভাব পড়বে সেটা নিয়ে ভাবনা রয়েছে। তিনি বলেন, আমরা ইতোমধ্যে জ¦ালানি মন্ত্রণালয়ে বিষয়টি নিয়ে বৈঠক করেছি। যুদ্ধকালীন কী করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যায় সেই বিষটি মাথায় রেখে পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্স এবং মেরিন ট্রাফিক প্ল্যাটফর্মের শিপ-ট্র্যাকিং তথ্যের ভিত্তিতে জানা গেছে, ইরাক ও সৌদি আরবের মতো প্রধান উপসাগরীয় তেল উৎপাদনকারী এবং এলএনজি উৎপাদনকারী বড় দেশ কাতারের উপকূল সংলগ্ন এলাকায় এই ট্যাঙ্কারগুলো রয়েছে। এসব ট্যাংকার বিভিন্ন গন্তব্যের উদ্দেশে যাওয়ার কথা; কিন্তু বর্তমানে পরিস্থিতিতে সময়মতো যেতে পারবে না।

হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকলে দেশের জ¦ালানি খাত ভয়াবহ সংকটে পড়তে পারে। বিশেষ করে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়তে পারে এলএনজি আমদানি খাতে।

গত এক দশক ধরে ভয়াবহ গ্যাস সংকটের মধ্যে দিয়ে সময় পার করছে বাংলাদেশ। দেশি গ্যাসের উৎপাদন কমছে। আমদানি করেও সামাল দেওয়া যাচ্ছে না ঘাটতি। এরপর এলএনজি আমদানি ব্যাহত হলে পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করতে পারে। দেশি উৎস থেকে প্রতিদিন গড়ে এক হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট আর আমদানি করে যোগান দেওয়া হচ্ছে ৮৫০ থেকে ১০০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে আনা এলএনজির প্রায় পুরোটাই আসছে হরমুজ প্রণালি হয়ে। এখন হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রচণ্ড রকম গ্যাস সংকটের আশঙ্কা করা হচ্ছে।

পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন) প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম এ বিষয়ে বলেন, বাংলাদেশে এলএনজি আমদানির অধিকাংশই হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজে আসে। এখন যে পরিস্থিতি তাতে সরবরাহকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছি বিকল্প কী উপায়ে তারা এলএনজি সরবরাহ করবে। তিনি বলেন, আজ (রবিবার) তাদের ছুটির দিন, সব বন্ধ। আগামীকাল থেকেই যোগাযোগ করব।

হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হিসেবে বিবেচিত হয়। বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস এই পথ দিয়ে আনা-নেওয়া করা হয়। স্বাভাবিকভাবেই ইরান সংকট বিশ্বের জ্বালানি তেলের বাজারকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

জ্বালানি তেল কিছুটা স্বস্তিতে থাকলেও টেনশন বাড়ছে গ্যাস সরবরাহ নিয়ে। এক সময় দেশি গ্যাসফিল্ডগুলো থেকে ২৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ পাওয়া যেত। ফিল্ডগুলোর মজুদ কমে যাওয়ায় প্রতিদিনেই কমছে উৎপাদন। প্রয়োজন ছিল তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে জোর পদক্ষেপ, সেদিকে না গিয়ে আমদানির পথে পা বাড়িয়েছে বাংলাদেশ।

গ্যাস ঘাটতি মোকাবিলায় ২০১৮ সাল থেকে জিটুজি ভিত্তিতে কাতার থেকে এলএনজি আমদানি শুরু করা হয়। এরপর ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে খোলাবাজারের পাশাপাশি ওমান থেকেও এলএনজি আমদানি শুরু করা হয়। যার প্রায় পুরোটাই হরমুজ প্রণালি হয়ে আসে। যে কারণে ৪ হাজার কিলোমিটার দুরে যুদ্ধের ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও কালো মেঘ জমতে শুরু করেছে।

ডেল্টা এলপিজির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, দেশের জ¦ালানি নিরাপত্তা পরিকল্পনা কার্যকরভাবে কাজ না করায় বাংলাদেশে এখন মূলত জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল। মধ্যপ্রাচ্যে কোনো দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ হলে তা তেলের দাম, এলপিজি পরিবহন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির সরবরাহের ওপর অবশ্যই নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এই যুদ্ধ চলতে থাকলে আমরা ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে পড়ব।

পেট্রোবাংলার এক জেষ্ঠ্য কর্মকর্তা  বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের ভয়াবহ প্রভাব আমাদের মতো গরিব দেশগুলোকে বেশি সংকটে ফেলবে। যুদ্ধের কারণে জ¦ালানি পণ্যের দাম বাড়বে। জাহাজা ভাড়া বাড়বে। এছাড়া মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে সব সময় জাহাজা পাওয়াও যাবে না। জ¦ালানির দাম বাড়ার কারণে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতে ব্যয় বাড়বে। সেক্ষেত্রে ভর্তুকি বাড়বে। সবক্ষেত্রে খরচ বাড়বে। মূল্যস্ফীতি দেখা দিতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া দেশগুলো ক্ষতিগ্রস্ত বেশি হলেও অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল দেশগুলোও চরম সংকটে পড়ে যাবে। সূত্র : আমাদের সময়

logo

সম্পাদক ও প্রকাশক : মো. নজরুল ইসলাম