ঢাকা ০৩ জুন, ২০২৬
সংবাদ শিরোনাম
রামিসা হত্যাকাণ্ড : আদালতে দায় স্বীকার সোহেলের, যুক্তিতর্ক বৃহস্পতিবার জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব: তপ্ত জুনে পুড়বে দেশ ৫০ শয্যার সব হাসপাতালকে ১০১ শয্যায় উন্নীত করার সিদ্ধান্ত জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধিতে চাপে মানুষ হজ শেষে দেশে ফিরলেন ২১ হাজার হাজি প্রথম বিদেশ সফরে মালয়েশিয়ায় যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী ছুটি শেষে ৭ জুন খুলছে স্কুল-কলেজ আদালতে সোহেল ও তার স্ত্রী, আত্মপক্ষ সমর্থন শুনানি আজ ওয়াসিম-ওয়াকারদের রেকর্ডে নাম লেখালেন শাহীন আফ্রিদি কেনিয়ায় শত শত মানুষের বিক্ষোভ

ব্যবসা ধসের মাশুল খেলাপি ঋণ

#

নিজস্ব প্রতিবেদক

০৩ জুন, ২০২৬,  10:56 AM

news image

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ব্যবসা-বাণিজ্য-বিনিয়োগ প্রায় স্থবির ছিল। হামলা, মামলা, জ্বালাও-পোড়াও, মব সন্ত্রাস, অ্যাকাউন্ট জব্দ, হয়রানি, বিদেশযাত্রায় বাধাসহ নানা কারণে ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তারা হতাশ-বিক্ষুব্ধ ছিলেন, যার প্রভাব পড়েছে ব্যবসা-বাণিজ্যে।

এর ফলে ঋণ নিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্যে খাটালেও পরিস্থিতি অনুকূলে না থাকায় ব্যবসায় লোকসান বাড়ে। তখন ঋণের কিস্তি বা সুদ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে অনেক উদ্যোক্তার জন্য। এখনো ওই ধারা অব্যাহত রয়েছে। এর ধাক্কা লেগেছে খেলাপি ঋণে।

অনিচ্ছা সত্ত্বেও অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খেলাপিতে পরিণত হচ্ছে। তার প্রমাণ মিলেছে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে প্রকাশিত মার্চভিত্তিক খেলাপি ঋণের প্রতিবেদনে। কারণ মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা বেড়েছে খেলাপি ঋণ।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য মতে, গত ডিসেম্বর মাস শেষে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল পাঁচ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকা।

তবে ২০২৬ সালের মার্চ শেষে অর্থাৎ তিন মাসের ব্যবধানে ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা বেড়ে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে পাঁচ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩২.২৬ শতাংশ। বর্তমানে ব্যাংক খাতে মোট ঋণ স্থিতি ১৮ লাখ ২৪ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, ‘দীর্ঘদিন থেকে নানা ধরনের সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। এর মধ্যে উচ্চ সুদের হার, ডলারের মূল্যবৃদ্ধি, আন্তার্জাতিক পর্যায়ে যুদ্ধ এবং আমাদের দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা অন্যতম। এত দিন কোনো নির্বাচিত সরকার ছিল না। তাই বেসরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি তালানিতে নেমেছে। অন্তর্বর্তী সরকার কোনো বিনিয়োগ পরিবেশ তৈর করতে পারেনি। তাই আমরা ব্যবসাও করতে পারিনি। বেসরকারি খাতকে সহায়তা না করে সরকার ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্যের আরও ক্ষতি করেছে। তারা ছিল একটি ব্যবসাবিরোধী সরকার। শুধু বাণিজ্য খাত নয়, ওই সরকার ব্যাংকগুলোকে দুর্বল ঘোষণা করার মাধ্যমে পঙ্গু করে দিয়ে গেছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘এখন নির্বাচিত সরকার এসেছে। আগামী দুই বছরের মধ্যে বিনিয়োগ ঘুরে দাঁড়াবে বলে আমরা আশাবাদী। তবে নীতিগত সহায়তা ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিও ভালো থাকা জরুরি। যদি যুদ্ধবিগ্রহ না থাকে তাহলে দেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতির উন্নতি হবেই। ব্যাংক খাতেও স্বস্তি ফিরবে।’

তবে ভিন্ন কথা বলেন বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন। তাঁর মতে ‘১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অনেক প্রার্থী তাঁদের ঋণ নবায়ন করেছিলেন। তাই ডিসেম্বর প্রান্তিকে খেলাপি ঋণ কিছুটা কমেছিল। ওই ঋণগুলো আবার খেলাপি হয়ে পাড়েছে। এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে সামগ্রিক খেলাপি ঋণে। এটাই হওয়ার কথা ছিল। কেননা এখন পর্যন্ত কোনো ঋণখেলাপির বিরুদ্ধে কঠোর আইনের প্রয়োগ আমরা দেখিনি। যত দিন পর্যন্ত ঋণখেলাপি গ্রাহকদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা না নেওয়া হবে তত দিন খেলাপি ঋণ বাড়বে।’

তিনি আরো বলেন ‘আমাদের দেশে একেক গ্রাহকের জন্য একেক নিয়ম। ক্ষমতাসীনদের জন্য কোনো আইনই যেন আইন নয়। আর অসহায় গ্রাহকদের জন্য সব কঠোর আইন বাস্তবায়ন করা হয়। এটা ঠিক নয়। এভাবে চলতে থাকলে খেলাপি ঋণের ছোঁয়াচে রোগ ছড়িয়ে পড়বে। পাশাপাশি এই রোগ চরম আকার ধারণ করতে পারে।’

জাহিদ হোসেনের মতে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির পেছনে বাংলাদেশ ব্যাংক নিজেই দায়ী। কেননা সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। তাদের কারণেই আজ দেশে খেলাপি ঋণের পাহাড় সৃষ্টি হয়েছে। বিগত সময়ে নামে-বেনামে ঋণ লুটপাট হলেও কোনো ভ্রুক্ষেপ ছিল না বাংলাদেশ ব্যাংকের। উল্টো খেলাপি ঋণ কার্পেটের নিচে লুকিয়ে রাখা হয়েছে। সেগুলো এখন বেরিয়ে আসছে। পাশাপাশি ভালো গ্রাহকদের ওপরও প্রভাব সৃষ্টি করছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন বলছে, মার্চ মাস শেষে দেশের ৬১টি তফসিলি ব্যাংকে মোট বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ১৮ লাখ ২৪ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকা। তিন মাসের ব্যবধানে ঋণ বিতরণ বেড়েছে প্রায় চার হাজার কোটি টাকা। আর খেলাপি ঋণ বেড়েছে তিন মাসের ব্যবধানে ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি।

তথ্য মতে, রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার সবচেয়ে বেশি। এসব ব্যাংকে খেলাপি ঋণের হার বিতরণ করা ঋণের প্রায় ৪৬ শতাংশ। তবে এসব ব্যাংকে আগের প্রান্তিকের চেয়ে জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে খেলাপি ঋণ কমেছে। সব মিলিয়ে ওই সব ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ এক লাখ ৪৯ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা। আর বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর খেলাপি চার লাখ ১৬ হাজার ৪৮২ কোটি টাকা, যা তাদের মোট বিতরণ করা ঋণের ৩০.১১ শতাংশ। এ ছাড়া বিদেশি ব্যাংকের তিন হাজার ২৬২ কোটি এবং বিশেষায়িত ব্যাংকের ১৯ হাজার ১৭৫ কোটি টাকা খেলাপি হয়ে পড়েছে।

২০০৯ সালের জানুয়ারিতে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোট সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। তারা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগে ২০২৪ সালের জুনে খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়ায় দুই লাখ ১১ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দায়িত্ব নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। সেই সরকারের মেয়াদে ব্যাংক খাতের প্রকৃত চিত্র দেখানো শুরু হয়। আবার আওয়ামী লীগ সমর্থিত অনেক গ্রাহককে জনসমক্ষে দেখা যায়নি। ফলে খেলাপি ঋণ হু হু করে বেড়ে যায়। এ অবস্থায় অন্তর্বর্তী সরকার বিশেষ ছাড়ে ঋণ পুনঃ তফসিলের সুযোগ দেয়। তাতে খেলাপি ঋণ কমে আসে। কিন্তু আবার বাড়তে শুরু করেছে সেই খেলাপি ঋণের পরিমাণ।

ব্যাংকারদের মতে, আওয়ামী লীগ সরকারের সাড়ে ১৫ বছরে ব্যাংক খাতে অনিয়ম, জালিয়াতি, প্রতারণা ও দুর্নীতির উচ্চমাত্রার প্রভাবেই খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি পায়। এস আলম গ্রুপ, বেক্সিমকো গ্রুপ, নাসা গ্রুপ, বিসমিল্লাহ গ্রুপ, হলমার্ক গ্রুপসহ কয়েকটি গোষ্ঠী এবং ন্যাশনাল, ইসলামী ও বেসিক ব্যাংকে সংঘটিত কেলেঙ্কারির ঘটনায় খেলাপি ঋণ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ে।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, খেলাপি ঋণ হু হু করে বেড় যাওয়ার আরও একটি বড় কারণ হলো ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দা। কোনো বিনিয়োগ নেই। কর্মসংস্থান তলানিতে। অনেক শিল্প-কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। পুরনো ব্যবসায় লাভের চেয়ে লোকসান বাড়ছিল, অনেক কারখানা চলছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। যেখানে ব্যবসায় প্রবৃদ্ধি নেই, সেখানে তাদের পক্ষে নিয়মিত ঋণের কিস্তি চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে, যার প্রতিফলন খেলাপি ঋণে দেখা যায়। সৌজন্যে : কালের কণ্ঠ

logo

সম্পাদক ও প্রকাশক : মো. নজরুল ইসলাম