ঢাকা ২১ জুলাই, ২০২৬
সংবাদ শিরোনাম
মিরপুরে আতশবাজি বিস্ফোরণে দগ্ধ ৪ সীমান্ত সুরক্ষায় বিজিবির সক্ষমতা বাড়াবে সরকার: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সারাদেশে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ সম্প্রসারণের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর হাম ও উপসর্গে মৃত্যু ৮০০ ছুঁইছুঁই রণক্ষেত্র দিল্লি, ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়তেই তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী বৃষ্টির সঙ্গে ধেয়ে আসছে ডেঙ্গু ৫ মাত্রার ভূমিকম্পে কাঁপল ইরান আসাদুজ্জামান খান কামালকে ফেরত চেয়ে ভারতকে বাংলাদেশের চিঠি ট্রলি ও মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে ২ তরুণ নিহত

বৃষ্টির সঙ্গে ধেয়ে আসছে ডেঙ্গু

#

নিজস্ব প্রতিবেদক

২০ জুলাই, ২০২৬,  2:54 PM

news image

চলছে শ্রাবণ মাস। এই সময়ে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বাড়তে থাকবে সেটাই স্বাভাবিক। গত কয়েক দিন ধরে থেমে থেমে বৃষ্টির সঙ্গে মশা বাহিত ডেঙ্গু রোগের প্রাদুর্ভাব বেড়েছে। রাজধানী ঢাকা ছেড়ে ডেঙ্গু এখন জেলা শহরেও দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে ডেঙ্গু আক্রান্তের এই উচ্চহার চলবে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত । জুন মাসের তুলনায় জুলাই মাসে দ্বিগুণের বেশি আক্রান্ত হতে পারে। গত ১৯ দিনেই জুনের তুলনায় ৩৪ শতাংশ বেশি আক্রান্ত।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সবশেষ তথ্য অনুযায়ী জুন মাসে আক্রান্ত ছিল ২ হাজার ৯০৭ জন। সেটা জুলাইয়ের ১৯ দিনে বেড়ে হয়েছে ৪ হাজার ৩৮১ জন। অর্থাৎ মাস না পেরুতেই আক্রান্ত ৩৪ শতাংশ বেশি। বিশেষজ্ঞদের মতে এই উচ্চহার চলবে পুরো জুলাই, আগস্ট, সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। কাজেই হাসপাতাল, সিটি করপোরেশন, পৌরসভাসহ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকরী উদ্যোগ নেওয়া অতি জরুরি হয়ে গেছে বলে মনে করেন তারা। এখন থেকেই জোরালো পদক্ষেপ না নিলে ভয়াবহ রূপ নিতে পারে

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে গতকাল পর্যন্ত ২০০ দিনে দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ১০ হাজার ৪৮৫ জন। এই সময়ের মধ্যে ডেঙ্গু ও ডেঙ্গুর লক্ষণ নিয়ে মারা গেছেন ৩৪ জন। আর চিকিৎসা শেষে হাসপাতাল

থেকে ছাড়পত্র নিয়েছেন ৯ হাজার ৪৪০ জন। আর গতকাল রবিবার শেষ ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৪৭৩ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার তথ্য জানানো হয়েছে। আক্রান্তদের মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এলাকায় ৪৪ জন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) এলাকায় ৩৭ জন। সারাদেশে আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে ৩৯.১% নারী, ৬০.৯% পুরুষ। অন্যদিকে মারা যাওয়া রোগীদের মধ্যে ৫৫.৯% নারী, ৪৪.১% পুরুষ।

কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক কবিরুল বাশার আমাদের সময়কে বলেন, ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা গত মাসের চাইতে এই মাসে বেশি হবে। আগস্ট-সেপ্টেম্বর উচ্চ ঝুঁকি রয়েছে। বিশেষ করে ঢাকার বাইরের জেলা শহরগুলোতে উচ্চ ঝুঁকি রয়েছে। তার মধ্যে বরিশাল বিভাগের জেলাগুলো, চট্টগ্রাম বিভাগের জেলাগুলো এবং ঢাকা সিটির আশাপাশের জেলাগুলোতে এবার অধিক হারে ডেঙ্গু রোগী পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ডেঙ্গুর এই উচ্চ ঝুঁকি রোধে করণীয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোর প্রতিটি বাড়ি এবং ভবনের আঙিনায় বাড়তি নজর দিতে হবে যেনো কোনভাবেই এডিসের লার্ভা না থাকে। সিটি করপোরেশন বা স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের মধ্যে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে লার্ভিসাইড প্রয়োগ করে বিডিং প্লেস ম্যানেজমেন্ট এবং লার্ভা নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। আর আক্রান্তদের যথাযথ চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে হাসপাতালগুলোতে বিশেষ করে জেলা, উপজেলা পর্যায়ে একজন ডাক্তার এবং নার্সকে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে উপযুক্ত করে প্রস্তুত রাখতে হবে।

প্রতিদিনই ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়লেও ঢাকা উত্তর এবং দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় বিশেষ কোনো তদারকি নেই বলে জানিয়েছেন ঢাকাবাসী। তাছাড়া সিটি করপোরেশনের এই মুহুর্তে বড় চ্যালেঞ্জ জলাবদ্ধতা। একটার ধকল কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই আর আরেকটা ধকলে পড়ছে দুই সিটি করপোরেশন। অন্যদিকে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি বিশেষ করে ওয়ার্ড ভিত্তিক কাউন্সিলর না থাকায় জবাবদিহির জায়গায় বড় ঘাটতি দেখছেন পরিকল্পনাবিদরা। তাদের মতে, ওয়ার্ড কাউন্সিলর থাকলে প্রতিটি ওয়ার্ড ভিত্তিক একটা তদারকি থাকত, সেটার এখন যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। তার কারণে ডেঙ্গুসহ পরিচ্ছনতা কার্যক্রমেও নাজুক অবস্থা দেখা দিয়েছে।

ঢাকার ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইমরুল কায়েস চৌধুরী আমাদের সময়কে বলেন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় ডেঙ্গু পরিস্থিতি এখন পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রয়েছে। আমরা বিশেষভাবে নজর দিচ্ছি জনসম্পৃক্ততা এলাকা এবং হাসপাতালগুলোতে অ্যাক্টিভ কেইস সার্ভিলেন্সে (পরিস্থিতিকেন্দ্রিক সক্রিয় অনুসন্ধান)। ডেঙ্গুর উৎসগুলো চিহ্নিত করে ধ্বংস করার উপর জোর দিয়েছি। শিগগিরই ৩০০ ভলেন্টিয়ার নামবে বাসাবাড়ির ছাঁদ, গ্যারেজ ঘুরে দেখবে কোথাও এডিসের লার্ভার জন্মায় এমন কিছু থাকলে সেগুলো সংগ্রহ করা হবে।

তিনি আরো বলেন, আতঙ্কের বিষয় হয় নতুন ভাইরাস যুক্ত হলে। এবার এখন পর্যন্ত আইইডিসিআরের তথ্যমতে বিদ্যমান চারটি ভাইরাসের মধ্যে তৃতীয় নম্বর ভাইরাসটিই বেশি পাওয়া যাচ্ছে। যেহেতু নতুন ভাইরাস এখন পর্যন্ত সনাক্ত হয়নি তাই আতঙ্কিত হওয়ার মতো কিছু দেখছি না। তবে এই মুহুর্তে ডেঙ্গু মশা বৃদ্ধির অনুকুল পরিবেশ বিরাজ করছে। বৃষ্টি এবং আদ্রতা বাড়লে ডেঙ্গু বাড়বে। কিন্তু ডিএনসিসিতে গত বছরের এই সময়ের তুলনায় এখন পর্যন্ত আক্রান্ত রোগী কম।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকায় এডিস মশার ঘনত্ব আগেই ঝুঁকিপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছেছিল। বিভিন্ন জরিপে রাজধানীর অনেক এলাকায় লার্ভার উপস্থিতি নিরাপদ সীমার চেয়ে বেশি পাওয়া গেছে। ফলে বর্ষার বৃষ্টি শুরু হওয়ার পর সংক্রমণ বাড়বেÑ এমন আশঙ্কার কথাও আগে থেকেই জানানো হয়েছিল। কিন্তু সেই সতর্কতার পরও সমন্বিত উদ্যোগের ঘাটতি রয়ে গেছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু ফগার মেশিনে ধোঁয়া ছিটিয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, নিয়মিত লার্ভা জরিপ, নির্মাণাধীন ভবন তদারকি এবং নাগরিক সচেতনতা বাড়ানোই সবচেয়ে কার্যকর উপায়। একই সঙ্গে আক্রান্ত রোগী দ্রুত শনাক্ত ও চিকিৎসা নিশ্চিত করাও জরুরি।

ঢাকার সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীর চাপ ধীরে ধীরে বাড়ছে। চিকিৎসকেরা বলছেন, জ্বর, শরীরব্যথা, মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, বমি বা রক্তক্ষরণের মতো উপসর্গ দেখা দিলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে সতর্কতা আরও বেশি প্রয়োজন।

এ বিষয়ে ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট টিবি হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. আয়েশা আক্তার আমাদের সময়কে বলেন, জমা পানি শুধু ফেলে দিলে হবে না, পানির পাত্রটাকে ভালো করে পরিস্কার করে দিতে হবে। কারণ অনেক সময় এডিসের লার্ভা পাত্রের সঙ্গে থেকে যায়, আবার যখন পানি পায় তখনই লার্ভাগুলো জেগে ওঠে। এজন্য এখন শুধু পানি ফেলে দিলেই চলবে না। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু সিটি করপোরেশনের একার উদ্যোগ যথেষ্ট না, নাগরিকদের সচেতনতা এবং সম্পৃক্ততা জরুরি।

এদিকে আবহাওয়াবিদরা আগামী কয়েক সপ্তাহে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকার পূর্বাভাস দিয়েছেন। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, এ সময় কার্যকর মশক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা জোরদার না করা গেলে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। ইতোমধ্যে সরকার ও স্বাস্থ্য বিভাগ ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি জোরদারের আহ্বান জানিয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু মোকাবিলায় এখনই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো প্রতিটি বাসা, ভবন ও আশপাশে জমে থাকা পরিষ্কার পানি সপ্তাহে অন্তত একবার অপসারণ করা, নির্মাণাধীন ভবনে নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করা এবং সিটি করপোরেশনের মশক নিধন কার্যক্রম আরও বিজ্ঞানভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক করা। অন্যথায় বর্ষার বাকি সময় রাজধানীতে ডেঙ্গুর প্রকোপ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সূত্র : আমাদের সময় 

logo

সম্পাদক ও প্রকাশক : মো. নজরুল ইসলাম