বক-পানকৌড়ির কিচিরমিচিরে মুখর কুমিল্লার কিশোরনগর
নিজস্ব প্রতিনিধি
১৮ জুলাই, ২০২৬, 11:08 AM
নিজস্ব প্রতিনিধি
১৮ জুলাই, ২০২৬, 11:08 AM
বক-পানকৌড়ির কিচিরমিচিরে মুখর কুমিল্লার কিশোরনগর
সকালের নরম আলো ছড়িয়ে পড়েছে গ্রামের আকাশে। দূর থেকে ভেসে আসছে শত শত পাখির কিচিরমিচির। গাছের মাথাজুড়ে সাদা বকের সারি, কোথাও আবার কালো পানকৌড়ির দল। মনে হবে যেন প্রকৃতি নিজ হাতে সাজিয়েছে এক বিশাল পাখির নগরী। কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার ছোট্ট গ্রাম কিশোরনগর এখন এমনই এক অনন্য দৃশ্যের জন্য পরিচিত হয়ে উঠেছে।
মাত্র তিনটি বাড়ি নিয়ে গড়ে ওঠা কিশোরনগর গ্রামের জনসংখ্যা হাজারের মতো। কিন্তু গ্রামের পরিচিতি এখন মানুষের সংখ্যা দিয়ে নয়, হাজারো অতিথি পাখির আবাসস্থল হিসেবে। গ্রামের সিরাজ মাস্টারের বাড়ি ও আশপাশের গাছগুলোকে নিজেদের নিরাপদ ঠিকানা বানিয়েছে বক, পানকৌড়িসহ নানা প্রজাতির পাখি।
সরেজমিনে দেখা যায়, বুড়িচং বাজার থেকে আগানগর সড়ক ধরে প্রায় দুই কিলোমিটার পশ্চিমে পীরযাত্রাপুর ইউনিয়নের কিশোরনগর গ্রাম। চারদিকে খোলা মাঠ, ছোট ছোট পুকুর আর সবুজ গাছপালা। পুকুরপাড়ের বাঁশঝাড়, তেঁতুল, আম ও নারিকেল গাছের ডালে ডালে অসংখ্য বাসা। কোথাও সাদা বকের ঝাঁক, কোথাও পানকৌড়ির দল বসে আছে নিশ্চিন্তে।
সবচেয়ে আকর্ষণীয় দৃশ্য দেখা যায় বাসাগুলোতে। মা পাখি খাবার নিয়ে ফিরলেই ছানারা গলা উঁচু করে অপেক্ষা করে খাবারের জন্য। প্রতিটি বাসা যেন নতুন জীবনের গল্প শোনায়। স্থানীয়দের ভাষায়, গাছগুলো যেন পাখিদের জন্য নিরাপদ ‘মাতৃসদন’। এখানে ডিম পেড়ে ছানা ফোটায়, বড় করে তোলে, তারপর ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে উড়ে যায় দূর দেশে।
স্থানীয়রা জানান, বর্ষা মৌসুম শুরু হলেই পাখিদের আগমন ঘটে। শরৎ পেরিয়ে কখনও হেমন্ত পর্যন্ত অবস্থান করে তারা। শীতের আগেই আবার চলে যায়। গত চার বছর ধরে নিয়মিতভাবেই এই গ্রামে আসছে পাখিরা। তবে এবার পাখির সংখ্যা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি।
পাখিদের এই অভয়াশ্রম দেখতে প্রতিদিনই ভিড় করছেন আশপাশের বিভিন্ন গ্রামের মানুষ। গোপীনাথপুর, কণ্ঠনগর, গোসাইপুর, বাহেরচর, শ্রীপুর, শিবরামপুর ও গোবিন্দপুরসহ নানা এলাকা থেকে দর্শনার্থীরা আসছেন ছবি তুলতে ও প্রকৃতির এই অপূর্ব দৃশ্য উপভোগ করতে।
মাস্টারবাড়ির বাসিন্দা নাজমুল হাসান, জামাল উদ্দিন ও রফিকুল ইসলাম জানান, প্রথমদিকে এত পাখি ছিল না। ধীরে ধীরে সংখ্যা বেড়েছে। গ্রামের মানুষ পাখিদের বিরক্ত করেন না বলেই তারা নিরাপদে থাকতে পারছে। আশপাশের বিল ও পুকুর থেকে সহজেই খাবার পায়। তবে মাঝেমধ্যে কিছু দুষ্ট লোক পাখির ছানা ধরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। স্থানীয়রা তখন বাধা দেন এবং পাখিগুলোকে রক্ষার চেষ্টা করেন।
সামাজিক বন বিভাগ কুমিল্লার বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোহাম্মদ রুহুল আমিন বলেন, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গাছের মতো পাখিরও প্রয়োজন রয়েছে। বুড়িচং উপজেলার কিশোরনগর গ্রামে পাখির অভয়াশ্রমের বিষয়টি শুনেছি। শিগগিরই এলাকাটি পরিদর্শন করে পাখি সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।