পরিত্যক্ত লোহায় হচ্ছে মারণাস্ত্র
নিজস্ব প্রতিবেদক
০৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, 11:21 AM
নিজস্ব প্রতিবেদক
০৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, 11:21 AM
পরিত্যক্ত লোহায় হচ্ছে মারণাস্ত্র
গহিন পাহাড়ের দুর্গম আস্তানায় নয়, লোকালয়ের কোলাহলপূর্ণ গ্যারেজ কিংবা মেকানিক্যাল ওয়ার্কশপে তৈরি হচ্ছে মারণাস্ত্র। পরিত্যক্ত লোহা, বাতিল ছাতার শিক, গাড়ির বাফারের স্প্রিং ব্যবহার করে তৈরি হচ্ছে ওয়ান শুটার, দোনলা বন্দুক, পেনগানসহ দেশি নানান অস্ত্র। তৈরি করা হচ্ছে বিদেশি অস্ত্রের রেপ্লিকাও। এসব অস্ত্র তৈরিতে সরঞ্জাম ও কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত সরঞ্জাম কেজি দরে কেনা হয় বিভিন্ন ভাঙারি দোকান থেকে। যা গ্যারেজ ও মেকানিক্যাল ওয়ার্কশপে রূপান্তর করে তৈরি করা হচ্ছে ঘাতক অস্ত্র। এরপর দুই বা তিন হাত ঘুরে এসব অস্ত্র চলে যাচ্ছে অপরাধীদের হাতে। এসব অস্ত্র অপরাধীরা ব্যবহার করছে খুন, ছিনতাই, ডাকাতিসহ নানা অপরাধে। বাংলাদেশ প্রতিদিনের অনুসন্ধানে বের হয়ে এসেছে অস্ত্র তৈরির সিন্ডিকেটগুলোর এমন ভয়ংকর সব তথ্য।
চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বলেন, ‘অবৈধ অস্ত্র কারখানার সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা গ্রেপ্তার ঝুঁকি এড়াতে এবং চাহিদার কথা মাথায় রেখে নিত্যনতুন কৌশল অবলম্বন করছে। ছদ্মবেশী কারখানায় দেশি প্রযুক্তিতে অস্ত্র তৈরি এবং কারখানা লোকালয়ে আনার কৌশলটি এরই অংশ। লোকালয়ে অস্ত্র কারখানায় একাধিক সফল অভিযান চালানোর পর আমরা গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করেছি।’ নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর (অব.) এমদাদুল ইসলাম বলেন, ‘অস্ত্র বিপণন ও পরিবহন সহজ এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর নজরদারি এড়াতে অবৈধ অস্ত্র কারবারিরা নানা কৌশল অবলম্বন করছে। কৌশলের অংশ হিসেবে গ্যারেজ ও মেকানিক্যাল দোকানের আড়ালে অস্ত্র তৈরির কারখানা গড়ে তুলেছে অস্ত্র কারবারিরা। একই সঙ্গে নির্দিষ্ট এলাকার বাইরে গিয়ে কারখানা স্থাপন করছে তারা। এগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে হলে গোয়েন্দা তৎপরতা বৃদ্ধির পাশাপাশি বিশেষ অভিযান শুরু করতে হবে।’
অনুসন্ধানে জানা যায়, কয়েক বছর আগেও দেশি প্রযুক্তিতে তৈরি অস্ত্র এলজি, দোনলা বন্দুক ও ওয়ান শুটার গানের অন্যতম উৎস ছিল কক্সবাজারের মহেশখালীর পাহাড়ি এলাকা। ওখানকার পাহাড়ি এলাকায় তৈরি হওয়া অস্ত্র দিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সন্ত্রাসী বাহিনীগুলো অপরাধ করে আসছিল। কিন্তু প্রশাসনের কড়াকড়ির কারণে মহেশখালীর অস্ত্র তৈরির কারিগররা কৌশল পাল্টে ছড়িয়ে পড়েছেন চট্টগ্রামের বিভিন্ন জনবহুল এলাকায়। তারা গ্যারেজ, মেকানিক্যাল ওয়ার্কশপ ও ছোট কারখানার আড়ালে তৈরি করছে এলজি, দোনলা বন্দুক, পেনগান, শাটার গান ও ওয়ান শুটার গানের মতো মারণাস্ত্র। অস্ত্র তৈরির কারিগররা সরঞ্জাম সংগ্রহ করে চট্টগ্রাম ও আশপাশ এলাকার বিভিন্ন ভাঙারি দোকান থেকে। পুরোনো স্টিলের পাইপ, মোটরসাইকেলের স্টিয়ারিং পাইপ, গ্যাস সিলিন্ডার, গাড়ির শক-অবজর্বার, গাড়ির স্টিয়ারিংয়ের পরিত্যক্ত যন্ত্রাংশ কেজি ধরে সংগ্রহ করে। পরে এ লোহা কেটে তৈরি করা হয় অস্ত্রের ব্যারেল। ফায়ারিং পিনের জন্য ব্যবহার করা হয় বাতিল ছাতার শিক, ট্রেনের বাফারের স্প্রিং ও গাড়ির সাসপেনশন।
অস্ত্র তৈরির এসব মিনি কারখানা সিএনজি গ্যারেজে থাকা ওয়েল্ডিং মেশিন, গ্রাইন্ডার ব্যবহার করে পাইপ ও লোহা কেটে তৈরি করা হয় এলজি, পেনগান, দোনলা বন্দুক, শাটার গান, ওয়ান শুটার ও বিদেশি অস্ত্রের রেপ্লিকা। অস্ত্র কারিগরদের বেশির ভাগই কক্সবাজার অঞ্চলের। যারা বংশপরম্পরায় অস্ত্র তৈরির সঙ্গে সম্পৃক্ত। তারা ওয়েল্ডিং মিস্ত্রি, লেদ মেকানিক ও কামারের ছদ্মবেশে তৈরি করছে দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি অস্ত্র। এ কারখানাগুলোতে তৈরি হওয়া অস্ত্রগুলোর দাম নির্ভর করে ফিনিশিং, ক্যালিবার এবং অস্ত্রের ধরনের চাহিদার ওপর। এর মধ্যে- ওয়ান শুটার গান তৈরির পর কারিগররা প্রতিটা বিক্রি করে ৩ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা। যা ডিলার পর্যায়ে পাইকারি দর ১২ হাজার থেকে ১৮ হাজার। সন্ত্রাসী বাহিনীগুলোর কাছে একেকটি এলজি এবং ওয়ান শুটার বিক্রি হয় ২৫ থেকে ৪০ হাজার টাকায়। একেকটি ওয়ান শুটার বহনের জন্য ক্যারিয়াররা পায় স্থান ভেদে দেড় হাজার থেকে ৩ হাজার টাকা। দোনলা বন্দুক তৈরির পর কারিগররা বিক্রি করে ৬ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা। ডিলার পর্যায়ে বিক্রি হয় ২৫ হাজার থেকে ৩৫ হাজার টাকা। সন্ত্রাসী বাহিনী বা খুচরা পর্যায়ে বিক্রি হয় ৫০ হাজার থেকে ৮০ হাজার টাকা। ক্যারিয়াররা পরিবহন কমিশন পান প্রতিটি অস্ত্রের জন্য ৩ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা। পেনগান, পাইপগান এবং শাটার গান তৈরির জন্য কারিগররা মজুরি পান আড়াই হাজার থেকে ৪ হাজার টাকা। ডিলার পর্যায়ে তা বিক্রি হয় ৮ হাজার থেকে ১২ হাজার টাকা। সন্ত্রাসীদের কাছে বিক্রি হয় ১৫ হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকা। এসব অস্ত্র বহনে ক্যারিয়াররা পায় দেড় হাজার থেকে দুই হাজার টাকা। স্থানীয় কারখানায় তৈরি হওয়া অস্ত্রের ডিলার হিসেবে কাজ করে দাগি অপরাধীরা। অস্ত্রের ক্যারিয়ার হিসেবে কাজ করেছেন সিএনজি ট্যাক্সিচালক, রিকশাচালক, দিনমজুর, নির্মাণ শ্রমিকসহ অপরাধ জগতে অপরিচিত মুখেরা।
চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার মির্জাপুরের অস্ত্র কারখানায় অভিযান ও আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদের নেতৃত্ব দিয়েছেন হাটহাজারী সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তারেক আজিজ। তিনি বলেন, ‘হাটহাজারীতে সন্ধান পাওয়া অস্ত্র কারখানায় স্থানীয় ভাঙারি দোকান থেকে অস্ত্র তৈরির সরঞ্জাম সংগ্রহ করা হতো। গ্যারেজে থাকা মেশিন দিয়েই তারা অস্ত্র তৈরি করত। এ কারখানায় তৈরি হওয়া অস্ত্র কয়েক হাত ঘুরে পৌঁছে যেত অপরাধীদের হাতে। এ কারখানার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের নাম আমাদের হাতে এসেছে। তাদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।’
গত ৩১ আগস্ট হাটহাজারী উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়নের একটি সিএনজি ট্যাক্সি মেরামতের ওয়ার্কশপের আড়ালে অস্ত্র তৈরির কারখানার সন্ধান পায় পুলিশ। অভিযানে অস্ত্র তৈরির সরঞ্জাম, দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরির ৫টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ২০ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়। পুলিশ জানায়, ট্যাক্সি মেরামতের এ ওয়ার্কশপে দীর্ঘদিন ধরে অস্ত্র তৈরি করে আসছিল একটি চক্র। এর আগে ২০২৫ সালের ৩০ আগস্ট সীতাকুণ্ডের সলিমপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে অস্ত্র তৈরির কারখানার সন্ধান পায় সেনাবাহিনী। অভিযানে দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি অস্ত্র, অস্ত্র তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। অভিযানে গ্রেপ্তার করা হয় অস্ত্র তৈরির চার কারিগরকে।
সমতলে অস্ত্র কারখানা নতুন নিরাপত্তা ঝুঁকি : চট্টগ্রাম ও আশপাশের জনবহুল এলাকায় গ্যারেজ এবং মেকানিক্যাল ওয়ার্কশপের আড়ালে দেশীয় অস্ত্র তৈরির যে চিত্র উঠে এসেছে, তা আমাদের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য গভীর উদ্বেগজনক। একসময় অবৈধ অস্ত্রের মূল কারখানাগুলো কক্সবাজারের মহেশখালী বা গহিন পাহাড়ে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারির কারণে অস্ত্র কারবারিরা এখন কৌশল পাল্টেছে। তারা লোকালয়ের ভিতরেই ছদ্মবেশে কারখানা গড়ে তুলছে। যা অপরাধ জগতে একটি ভয়ংকর ‘কাঠামোগত পরিবর্তন’। এমন দাবি নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর (অব.) এমদাদুল ইসলামের।
তাঁর মতে, গ্যারেজ বা ওয়ার্কশপ বেছে নেওয়ার মূল কারণ নিখুঁত ক্যামোফ্লেজ বা ছদ্মবেশ। সেখানে সারা দিনই লোহা কাটা বা ঝালাইয়ের শব্দ হয়। ফলে অস্ত্রের ব্যারেল বা ফায়ারিং পিন তৈরির শব্দ মানুষের মনে সন্দেহ তৈরি করে না। ভাঙারি দোকান থেকে অতি সাধারণ পরিত্যক্ত লোহা, ছাতার শিক বা গাড়ির যন্ত্রাংশ সংগ্রহ করে এই মারণাস্ত্রগুলো তৈরি হচ্ছে। এর ফলে অস্ত্রের উৎপাদন ও পরিবহন সহজ হয়েছে এবং দ্রুত তা ছিনতাইকারী, ডাকাত বা ভাড়াটে খুনির হাতে পৌঁছে যাচ্ছে। পাহাড়ি রুট এড়িয়ে লোকালয়ে বসেই ক্রেতার হাতে অস্ত্র তুলে দেওয়ার এ প্রক্রিয়া রীতিমতো অ্যালার্মিং।
তিনি বলেন, এ নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শুধু প্রথাগত পুলিশিং যথেষ্ট নয়। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে তাদের নজরদারির ধরন বদলাতে হবে। সোর্স তৃণমূলে নামিয়ে আনতে হবে। সন্দেহভাজন সিএনজি গ্যারেজ, লেদ কারখানা ও ভাঙারি দোকানগুলোর ওপর বিট পুলিশের মাধ্যমে নিয়মিত নজরদারি বাড়াতে হবে। শুধু কারিগর বা ক্যারিয়ারদের নয়। এ সিন্ডিকেটগুলোর পেছনে অর্থ লগ্নি করা মূল হোতাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে না পারলে সমতলের এই নীরব অস্ত্র কারখানাগুলো নির্মূল করা সম্ভব হবে না।
-সূত্র : দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন