ঢাকা ২৭ আগস্ট, ২০২৬
সংবাদ শিরোনাম
১৫ মামলায় খালাস পেলেন মির্জা আব্বাস নজিরবিহীন দুর্যোগ, ত্রাণ কার্যক্রম চলছে: নেপাল প্রধানমন্ত্রী সংসদে সরকারদলীয় এমপিদের নিয়ে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী ধর্ষণের আলামত মেলেনি তবে ময়নাতদন্তে মিলল চাঞ্চল্যকর তথ্য নেপালে আকস্মিক বন্যা: জাতিসংঘ মহাসচিবের শোক বিএনপি সরকারের ৬ মাসে জাতীয় গ্রিডে ২০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ সব আন্দোলনের অনুপ্রেরণা ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম: রিজভী আলজেরিয়ায় দাবানলে অন্তত ১২ জনের মৃত্যু নেপাল বিপর্যয়, নেপথ্য কারণ নিয়ে বিজ্ঞানীদের বিশ্লেষণ ডিএমপির অভিযানে গত ২৪ ঘণ্টায় গ্রেফতার ৫৬০

নেপাল বিপর্যয়, নেপথ্য কারণ নিয়ে বিজ্ঞানীদের বিশ্লেষণ

#

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

২৭ আগস্ট, ২০২৬,  11:45 AM

news image

নেপাল এবং তিব্বতের সীমান্ত অঞ্চলে আচমকা নেমে আসা ভয়াবহ ধস ও হরড়া বানের পেছনে প্রকৃত কারণ কী, তা নিয়ে এখনো শতভাগ নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে হিমালয় পর্বতমালার চরম ও দুর্গম ভৌগোলিক গঠন এই ধরনের বিপর্যয়ের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। গত বুধবার সকালে ঘটে যাওয়া এই প্রলয়ঙ্করী ঘটনায় এ পর্যন্ত অন্তত ১৬০ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং শত শত মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন।


কাদা ও পানির এই প্রাণঘাতী স্রোত তরল কংক্রিটের মতো তীব্র গতিতে নেমে এসেছে, যা আগাম পূর্বাভাস দেওয়া প্রায় অসম্ভব এবং এর গতি থেকে বেঁচে ফেরাও অত্যন্ত কঠিন। নেপাল-চীন সীমান্তের চীনা অঞ্চল থেকে ধারণ করা একাধিক ভিডিও চিত্রে দেখা গেছে, কাদা ও পাথরের একটি বিশালাকার প্লাবন দেয়াল বহুতল ভবনের ওপর আছড়ে পড়ে সেটিকে চোখের পলকে গুঁড়িয়ে দিচ্ছে এবং রাস্তা থাকা বাস ও গাড়িগুলোকে খেলনার মতো ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।


ঘটনার পরপরই নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল সংসদে জানিয়েছিলেন যে, প্রাথমিকভাবে একটি ভূমিকম্পের ফলে পাহাড়ে ধস নেমেছিল, যা নদীর স্বাভাবিক প্রবাহকে অবরুদ্ধ করে দেয় এবং পরবর্তীতে সেই কৃত্রিম বাঁধ ভেঙে নিম্নাঞ্চলে ভয়াবহ রূপ নিয়ে পানি প্রবাহিত হতে শুরু করে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ভূগোলাকৃতি গবেষণা সংস্থা ইউএস জিওলজিক্যাল সার্ভে (ইউএসজিএস) এক নতুন বিশ্লেষণে জানিয়েছে, শুরুতে ঘটনাটিকে ৪.৪ মাত্রার ভূকম্পন হিসেবে ধারণা করা হলেও দীর্ঘমেয়াদী ভূকম্পন তরঙ্গের গভীর বিশ্লেষণে দেখা গেছে যে, কোনো ভূমিকম্প নয় বরং প্রকাণ্ড ধসের কারণেই ভূমিতে এই কম্পনের সৃষ্টি হয়েছিল।


কাঠমান্ডুভিত্তিক আন্তর্জাতিক পর্বত গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্ট’-এর প্রাথমিক মূল্যায়নে সীমান্তের তিব্বত অংশে কোনো অস্বাভাবিকতা দেখা যায়নি। সংস্থাটির রিমোট সেন্সিং ও জিও-ইনফরমেশন বিশ্লেষক সার্থক শ্রেষ্ঠা এএফপি-কে জানান, নেপালের সীমানার ভেতরেই পাহাড়ের বরফ ও পাথরের মিশ্রণে গঠিত একটি বিশালাকার ধস (রক-আইস অ্যাভালাঞ্চ) লেন্দে নদীকে অবরুদ্ধ করে ফেলেছিল। এর ফলেই পরবর্তীতে নিম্ন অববাহিকায় এমন ধারাবাহিক প্লাবন ছড়িয়ে পড়ে।


বিশ্ববিদ্যালয় অব টেক্সাস সান আন্তোনিওর জলবায়ুবিজ্ঞানী ও হাইড্রোলজিস্ট হাতিম শরীফ এই দুর্যোগের একটি বিশেষ দিক উল্লেখ করে বলেন, এই ঘটনার পূর্বে সেখানে কোনো উল্লেখযোগ্য বৃষ্টিপাতই হয়নি। বৃষ্টিহীন অবস্থায় এমন আকস্মিক প্লাবন পৃথিবীর যেকোনো আধুনিক বন্যা সতর্কীকরণ ব্যবস্থার কার্যকারিতাকে ব্যর্থ করে দেয়। তিনি সতর্ক করে বলেন, কাদার এই ঢল দেখতে পাওয়ার পর দৌড়ে বাঁচা বা গাড়িতে চড়ে পালানোর চেষ্টা সম্পূর্ণ নিরর্থক, কারণ এটি অত্যন্ত দ্রুতগতির তরল কংক্রিটের মতো কাজ করে। এমন পরিস্থিতিতে বেঁচে থাকার একমাত্র উপায় হলো তাৎক্ষণিকভাবে উঁচু কোনো পাহাড় বা অন্তত ২০ ফুট উঁচু স্থানে উঠে যাওয়া। তিনি আরও প্রস্তাব করেন, নদীতে রিয়েল-টাইম ওয়াটার লেভেল গেজ বসানো সম্ভব হলে স্থানীয় মানুষ হয়তো এলাকা খালি করার জন্য ২০ থেকে ৩০ মিনিটের একটি জরুরি সময় পেতে পারেন।


যুক্তরাজ্যের রিডিং ইউনিভার্সিটির গবেষক ডরোথি হাইনরিখ জানান, পাহাড়ি অঞ্চলের নদীগুলো সাধারণত অত্যন্ত সংকীর্ণ ও অপ্রশস্ত হয়। সেখানে ধস বা তুষারধসের কারণে নদী সাময়িকভাবে আটকে গেলে পেছনে বিপুল পরিমাণ পানি জমা হয় এবং পরবর্তীতে তা ভেঙে অবিশ্বাস্য গতিতে ধেয়ে আসে। এদিকে, নদী প্রবাহে এখনো কোনো প্রতিবন্ধকতা রয়ে গেছে কি না তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন আইসিআইএমওডি-এর প্রধান গবেষক চিয়াংগং ঝাং; কারণ এমনটা থাকলে উজানে পুনরায় দ্বিতীয় দফায় বন্যার সৃষ্টি হতে পারে।


হিমালয় অঞ্চল মূলত হিমবাহ হ্রদ বিস্ফোরণজনিত বন্যার জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল। এর আগে ২০২৫ সালের জুলাই মাসে চীনের জাইরং কাউন্টিতে সৃষ্ট এমনই এক হিমবাহ হ্রদ বিস্ফোরণের দরুন নেপালের রাসুয়া জেলা মারাত্মকভাবে প্লাবিত হয়েছিল। তবে বর্তমান ঘটনার পেছনে কোনো হিমবাহ লেকের ভূমিকা ছিল কি না, তা নিয়ে বিজ্ঞানীরা এখনো কোনো চূড়ান্ত মন্তব্য করেননি।


বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক এই দুর্যোগের পেছনে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের সুনির্দিষ্ট প্রভাব কতটা ছিল, তা বের করতে সামনের দিনগুলোতে বিজ্ঞানীরা বৈশিষ্ট্য মূল্যায়ন গবেষণা পরিচালনা করবেন। ডরোথি হাইনরিখ যোগ করেন, হিমালয় অঞ্চলে বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রভাব স্পষ্ট; যেমন ঘন ঘন তাপদাহ, হিমবাহ গলে যাওয়া এবং পারমাফ্রস্ট ক্ষয় হওয়া; যেগুলো ধস ও হিমবাহ বন্যার হার বাড়িয়ে দেয়।  সূত্র: এনডিটিভি

logo

সম্পাদক ও প্রকাশক : মো. নজরুল ইসলাম