ঢাকা ৩০ জুলাই, ২০২৬
সংবাদ শিরোনাম
শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা: আইনমন্ত্রী হবিগঞ্জে ১৪৪ ধারা প্রত্যাহার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আরসা কমান্ডারকে গুলি করে হত্যা সরকারি কর্মকর্তা–কর্মচারীদের নতুন বেতনকাঠামো নিয়ে সুখবর দিলেন অর্থমন্ত্রী বিতর্ক যতই থাক, ফিফার পরিকল্পনায় বাংলাদেশ পেতে পারে ৮ কোটি ৬০ লাখ ডলার! ঢাকামুখী রোগীর চাপ সামাল দিতে দিশেহারা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অনলাইনে ঘৃণামূলক প্রচারণার জেরে মালয়েশিয়ায় বন্ধ হচ্ছে শরণার্থী স্কুল জেমিনাই অ্যাপ হালনাগাদ করল গুগল, যুক্ত হলো নতুন সুবিধা ফের সংশোধন হচ্ছে সাইবার সুরক্ষা আইন, বাড়ানো হচ্ছে শাস্তি গাজায় অভিভাবক হারানোর তালিকায় ৬০ হাজারের বেশি শিশু

ঢাকামুখী রোগীর চাপ সামাল দিতে দিশেহারা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ

#

নিজস্ব প্রতিবেদক

৩০ জুলাই, ২০২৬,  11:34 AM

news image

উন্নত ও সুচিকিৎসা পেতে সারা দেশ থেকে রোগীরা রাজধানী ঢাকায় আসছেন। বিশেষজ্ঞ ডাক্তার ও রোগ নির্ণয়ে সঠিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা পাবেন এই আশায় ঢাকায় আসেন রোগীরা। এসব রোগীর মধ্যে দরিদ্র এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণির রোগীরা সরকারি হাসপাতালকেই বেছে নেন। এতে রাজধানীর সরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগীর ভিড় বেড়েই চলেছে এবং বাড়তি রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

এছাড়াও খাদ্যে ভেজাল, পরিবেশগত দূষণসহ নানা কারণে দেশব্যাপী সংক্রামক ও অসংক্রামক ব্যাধি আশঙ্কাজনক হারে বাড়ার কারণেও বাড়ছে রোগীর চাপ।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, সরকারি হাসপাতালে আগত রোগীদের মধ্যে দুর্ঘটনায় আহত ছাড়াও অসংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেশি। অনেকের জরুরি ভিত্তিতে অপারেশন কিংবা আইসিইউ সাপোর্টের প্রয়োজন হয়। ঢাকার বাইরে জরুরি অপারেশন ও আইসিইউ ব্যবস্থাপনা সীমিত। সময়মতো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক পাওয়া যায় না। সরকারি হাসপাতালে পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা থাকলেও সময়মতো পরীক্ষ-নিরীক্ষা করার সুযোগ থাকে না। এই সুযোগে এক শ্রেণির দালাল রোগীদের আশপাশের ব্যক্তিমালিকানাধীন ক্লিনিকে পাঠিয়ে কমিশন বাণিজ্য করেন। ঢাকার বাইরে রোগী ভাগিয়ে নেওয়ার এই কমিশন বাণিজ্য ওপেনসিক্রেট। এসব কারণে রোগীরা ঢাকামুখী হচ্ছেন বেশি বলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা জানান। এ কারণে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালসহ রাজধানীর সরকারি হাসপাতালগুলোতে আগত রোগীদের সামাল দিতে ডাক্তার, নার্স ও কর্তৃপক্ষকে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

আবার মাত্রাতিরিক্ত রোগীর কারণে রাজধানীর সরকারি হাসপাতালগুলোতেও রোগী ভাগিয়া নেওয়া দালালদের দৌরাত্ম্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। এসব দালালের খপ্পরে পড়ে অনেক রোগী সর্বস্বান্ত হচ্ছেন। ভুল চিকিৎসা কিংবা অব্যবস্থাপনার কারণে অনেক রোগীর অঙ্গহানি ও প্রাণহানির ঘটনাও ঘটছে বলে তারা জানান।

রাজধানী থেকে শুরু করে উপজেলা পর্যন্ত সরকারি হাসপাতালের সামনে ও আশপাশে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠেছে প্রাইভেট ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। এসবের অধিকাংশেরই কোনো সরকারি লাইসেন্স নেই, নেই পরীক্ষা-নিরীক্ষা আধুনিক যন্ত্রপাতি ও প্যাথলজিস্ট। অশিক্ষিত টেকনিশিয়ান দিয়ে চলছে এগুলোর কার্যক্রম। হাসপাতালগুলো চালাতে গড়ে উঠেছে রোগী ভাগিয়ে নেওয়ার দালাল চক্র। প্রকাশ্যে সরকারি হাসপাতালে আসা রোগীদের ভাগিয়ে নিচ্ছেন দালালরা। স্থানীয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দালাল নিয়ন্ত্রণ করতে হিমশিম খাচ্ছে। আবার এসব হাসপাতালের একশ্রেণির কর্মচারী-কর্মকর্তার সহায়তায় পরিচালিত হচ্ছে ঝুঁকিপূর্ণ ওইসব প্রাইভেট ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। 

একাধিক হাসপাতাল পরিচালক জানান, দালাল ধরে পুলিশের কাছে দিলেও কয়েক দিন পর তারা ফিরে আসেন এবং একই কাজ করেন। একদিকে, সরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগীদের চাপ যেমন বাড়ছে, দালালদের তৎপরতাও তেমনই বাড়ছে।

নীতিমালা অনুযায়ী, সরকারি হাসপাতালের সামনে কিংবা আশপাশে কোনো ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিক করা নিয়ম বহির্ভূত। বিন্তু বছরের পর বছর সরকারি নীতিমালা উপেক্ষা করে এই ধরনের ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার গড়ে উঠেছে। এতে সরকারি হাসপাতালগুলোতে দালালদের দৌরাত্ম্য বেড়েছে। একশ্রেণির চিকিৎসক এসব দালালের কাছ থেকে নিয়মিত কমিশনও পাচ্ছেন।

একাধিক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এর সত্যতা স্বীকার করে বলেন, 'দিন দিন রাজধানীমুখী রোগীদের চাপ বাড়ছে। এই পরিস্থিতি নিরসনে হাসপাতালের সম্প্রসারণ ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। পাশাপাশি ঢাকার বাইরে সরকারি হাসপাতালগুলোর চিকিৎসাব্যবস্থা সম্প্রসারণ, পাশাপাশি উপযুক্ত জনবল ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। এ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হলে রাজধানীতে রোগীর চাপ কমে আসবে বলে পরামর্শ দিয়েছেন বিভিন্ন সরকারি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। 

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের ভাষ্য, খাদ্যে ভেজাল, পরিবেশগত কারণসহ নানা কারণে দেশব্যাপী সংক্রামক ও অসংক্রামক ব্যাধি আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে । এ বিষয়ে সচেতনতা বাড়ালে রোগীর সংখ্যা কমবে।

২৬০০ শয্যার ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে বর্তমানে চিকিৎসাধীন রোগীদের সংখ্যা পাঁচ সহস্রাধিক। প্রতিদিন চিকিৎসার জন্য বহির্বিভাগ ও জরুরি বিভাগে সাত হাজারের বেশি রোগী আসে। চাহিদা অনুযায়ী দেশের এই সর্ববৃহৎ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল জনবল সীমিত। এ হাসপাতালে আগত রোগীদের মধ্যে সিংহভাগই দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে রোগীদের প্রচণ্ড চাপ।

শিডিউল অপারেশন ছাড়াও ২৪ ঘণ্টা জরুরি অপারেশন অব্যাহত আছে। এই সীমিত জনবল দিয়ে রোগীরা সুচিকিৎসা পাচ্ছেন । পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে গিয়ে হাসপাতালে রোগীরা হয়রানির শিকার হন। প্রথমে টিকিট কিনে ব্যাংক বুথে পরীক্ষা-নিরীক্ষার টাকা জমা দিতে হয়। এরপর পরীক্ষার জন্য গিয়ে দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষা করতে থাকেন। এই সুযোগে দালালরা নানা অজুহাতে ফুসলিয়ে অসহায় রোগীদের ভাগিয়ে নিয়ে যায় । এমন পরিস্থিতিতে অনেক বিত্তশালীও দালালদের খপ্পরে পড়েন।

সম্প্রতি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ জাহিদ রায়হান ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ভবন-টু এর উলটা দিকে একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে আকস্মিক অভিযান চালান। তিনি এই ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসকদের পরীক্ষা-নিরীক্ষার শতাধিক ব্যবস্থাপত্র দেখতে পান।

তিনি জানান, এক মাস আগে এই ডায়াগনস্টিক সেন্টারটি অবৈধ কর্মকাণ্ডের কারণে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরিস্থিতি দেখার জন্য তিনি হঠাৎ ওই ডায়াগনস্টিক সেন্টারে গিয়ে দেখেন যে, বন্ধ ডায়াগনস্টিক সেন্টার পুরোদমে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। তাৎক্ষণিক তিনি ওই ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিকের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন।

তিনি আরও জানান, ওই এলাকায় এই ধরনের বারেটি ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিক রয়েছে । এসব ক্লিনিক ও হাসপাতালগুলোর দালালরা ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আগত রোগীদের ভাগিয়ে নিয়ে যায়। যেখানে চিকিৎসাসেবার নামে ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিকগুলো রোগীদের গলাকাটে। শুধু এই হাসপাতালের সামনে নয়, রাজধানীর অন্যান্য সরকারি হাসপাতালের আশপাশেও ব্যাঙের ছাতার মতো ডায়াগনিস্টক সেন্টার ও ক্লিনিক গড়ে উঠেছে । সেখানেও একাশ্রেণির দালাল আগত রোগীদের একই কায়দায় ভাগিয়ে নিয়ে যায় । এভাবে ঢাকায় আগত রোগীরা চিকিৎসা করতে এসে সর্বস্বান্ত হয়ে বাড়ি ফিরে যান।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান বলেন, '২৬০০ বেডে হাসপাতালে প্রতিদিন রোগী চিকিৎসাধীন থাকে পাঁচ সহস্রাধিক। বহির্বিভাগ ও জরুরি বিভাগে প্রতিদিন ৭০০-৮০০ রোগী চিকিৎসার জন্য আসেন। এই বিশালসংখ্যক রোগীর চিকিৎসাসেবা দিতে গিয়ে ডাক্তার, নার্স ও কর্মচারীরা হিমশিম খাচ্ছেন। তবে কোনো রোগী চিকিৎসাসেবার বাইরে থাকে না। এটা হলো হাসপাতালের বৈশিষ্ট্য।'

তিনি জানান, বিছানা না থাকলে ফ্লোরে কিংবা এক বেডে দুই-তিন জন রেখেও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা হয়। এ কারণে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের আস্থা অনেক বেশি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) ডা. বেনজির আহমেদ জানান, রাজধানীতে মোহাম্মদপুর, মিরপুর ও যাত্রাবাড়ী এলাকায় আধুনিক হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা এখন সময়ের দাবি। রাজধানীতে জনসংখ্যা বেড়েছে অনেক। প্রতিদিন আসা-যাওয়া করে কয়েক লাখ লোক। রাজধানীতে যে সংখ্যক সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল রয়েছে, এসব দিয়ে শুধু রাজধানীবাসীর চিকিৎসা নিশ্চিত করা সম্ভব বলে তিনি জানান।

ওই কর্মকর্তার মতে, ঢাকার বাইরে বিভাগীয় শহর থেকে শুরু করে উপজেলা পর্যন্ত চিকিৎসাসেবা আধুনিক ব্যবস্থাপনা সময়ের দাবি। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সিজারিয়ান অপারেশনসহ মাঝারি ধরনের অপারেশন করার ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু এসব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মেডিসিন, সার্জারি, গাইনিসহ অন্যান্য বিষয়ের কনসালটেন্ট রয়েছে। কিন্তু রোগীরা সেখানে উপযুক্ত সুচিকিৎসা পাচ্ছেন না। সেখানেও রোগীরা দালালদের খপ্পরে পড়েন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক (প্রশাসন) বলেন, চিকিৎসার নামে হয়রানি বন্ধসহ চিকিৎসাব্যবস্থা সম্প্রসারণ করার জন্য সরকার উদ্যোগ নিয়েছে। এ ব্যবস্থাপনা বাস্তবায়ন হলে রোগীরা হাতের কাছে সুচিকিৎসা পাবেন বলে তিনি জানান । সূত্র : দৈনিক ইত্তেফাক 

logo

সম্পাদক ও প্রকাশক : মো. নজরুল ইসলাম