ঢাকা ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
সংবাদ শিরোনাম
‘অবসরের পর বিচারকদের পাসপোর্ট ভেরিফিকেশন অযৌক্তিক ও ভিত্তিহীন’ ধানমন্ডিতে বহুতল ভবনে আগুন, নিয়ন্ত্রণে ৪ ইউনিট সিলেটে কিশোরীকে শিকল বেঁধে ঘোরানোর ঘটনায় গ্রেপ্তার ৩ ‘আস্থা হারানোর’ কথা জানিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পদ ছাড়লেন সায়মা ওয়াজেদ আলিস্তারের গোলে লিভারপুলের দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তন ফিলিপাইনে ফেরিতে ভয়াবহ আগুনে ৫ জনের মৃত্যু, নিখোঁজ ৮৬ খেলাপি ঋণের ৭২ শতাংশ দুর্বল ১০ ব্যাংকে ডেঙ্গুর লাগামহীন প্রকোপ এসবিএসি ব্যাংকের নতুন চেয়ারম্যান প্রফেসর মোঃ মাকছুদুর রহমান সরকার এফসিএমএ ২০২৯ সাল পর্যন্ত চলতে পারে ইরান যুদ্ধ, ট্রাম্পের উপদেষ্টাদের সতর্কবার্তা

ডেঙ্গুর লাগামহীন প্রকোপ

#

নিজস্ব প্রতিবেদক

১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,  11:38 AM

news image

ডেঙ্গুর প্রকোপ কমার বদলে দিন দিন আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছে। প্রতিদিনই হাজারের বেশি মানুষ নতুন করে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন, বাড়ছে মৃত্যুও। চলতি বছরে এডিস মশাবাহিত এ রোগে ইতোমধ্যে ১৩৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছাড়িয়েছে ৪৬ হাজার ৯০০। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এ রকম অনুকূল আবহাওয়া অব্যাহত থাকলে সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরজুড়ে ডেঙ্গুর প্রকোপ আরও বাড়তে পারে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার সারাদেশে বিশেষ পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচি নেওয়ার উদ্যোগ নিলেও শুধু সরকারি অভিযান দিয়ে এডিসের বিস্তার ঠেকানো কঠিন বলে মনে করছেন কীটতত্ত্ববিদরা। এদিকে ডেঙ্গুঝুঁকি বিবেচনায়

শনিবার থেকে দেশব্যাপী বিশেষ পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচি উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী।

ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় থেমে থেমে বৃষ্টি ও রোদের কারণে এডিস মশার বংশবিস্তারের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা স্বচ্ছ পানিতে এডিসের লার্ভা দ্রুত বেড়ে উঠছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কয়েক সপ্তাহ আগে যে লার্ভাগুলো বিভিন্ন পাত্র, নির্মাণাধীন ভবন, ছাদ, পরিত্যক্ত টায়ার কিংবা জমে থাকা পানিতে ছিল, সেগুলোর বড় একটি অংশ এখন পূর্ণাঙ্গ মশায় পরিণত হয়েছে। ফলে এ সময়ে শুধু লার্ভা ধ্বংসের পাশাপাশি মানুষকে মশার কামড় থেকে সুরক্ষিত রাখাও জরুরি হয়ে পড়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এবার অসময়েও থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে। রোদ-বৃষ্টির খেলা যত চলবে এডিস মশার বংশবিস্তার ততই বাড়বে। ঢাকায় ডেঙ্গুর হটস্পট চিহ্নিত। প্রতিবছর একই এলাকায় হট স্পট দেখা দেয়, সেখানে সিটি করপোরেশন নানা উদ্যোগ নিলেও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে পুরোপুরি সফল হতে পারছে না কোনো বছরই, উল্টো মশা নিয়ন্ত্রণে প্রতিবছর বিপুল অর্থ ব্যয় করছে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। সেই ২০০০ সাল থেকেই ডেঙ্গুর ভয়াবহতা ও সচেতনতা সৃষ্টিতে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে কিন্তু কোনো কিছুতেই থামানো যাচ্ছে না ডেঙ্গুর প্রকোপ। বিশেষজ্ঞদের মতে, লার্ভা অবস্থায় ধ্বংস করতে পারলে পরিস্থিতি খারাপ হতো না। এডিস মশার ডিম শুকনা পরিবেশেও নয় মাস পর্যন্ত সক্রিয় থাকে, নষ্ট হয় না। আর যখনই স্বচ্ছ পানির সংস্পর্শে আসে তখন তা লার্ভা হয়; রূপ নেয় পরিপূর্ণ মশায়।

এডিসের দুটি প্রজাতি— এডিস ইজিপটাই ও এডিস অ্যালবোপিকটাস। কয়েক বছর ধরে এডিস ইজিপটাই ডেঙ্গু ছড়াচ্ছে। কিন্তু এবার অ্যালবোপিটাস সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু ছড়াচ্ছে বলে জানা গেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা আমাদের সময়কে জানান, যশোর, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট এলাকায় ৬০-৭০ শতাংশ অ্যালবোপিকটাস পাওয়া গেছে। কোথাও কোথাও শতভাগ অ্যালবোপিকটাস রয়েছে। এবার ভয়ের কারণ হবে এই প্রজাতির মশা। ঢাকায় অধিক নজর থাকায় এখানে আক্রান্ত কম হলেও ঢাকার বাইরে থেকে আক্রান্ত রোগী ঢাকায় চিকিৎসা নেওয়ার সময় ছড়িয়ে দিচ্ছে ঢাকায়ও। যার কারণে উচ্চঝুঁকিতে ঢাকাও রয়েছে।

এ বিষয়ে কীটত্ত্ববিদ অধ্যাপক কবিরুল বাশার আমাদের সময়কে বলেন, এখন পরিচ্ছন্নতা অভিযান করে খুব যে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে তেমনটা মনে হচ্ছে না। কারণ এডিসের লার্ভাগুলো এখন পূর্ণ মশায় রূপ নিয়েছে। তবে ব্যাপকভিত্তিক পরিচ্ছন্নতায় মশা কমতে পারে। ভালো ফল না দিলেও উদ্যোগ নেওয়াটা জরুরি। শুধু সরকার উদ্যোগ নিলে হবে না, মানুষের বাসাবাড়িতে যেন এডিস মশার প্রজনন না হয় সেটা তাদের নিশ্চিত করতে হবে।

গতকাল বুধবার দেশে ডেঙ্গুতে আরও তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। এই সময়ে এডিস মশাবাহিত এই রোগে নতুন করে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে আরও ১ হাজার ৪৭৩ জন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, চলতি বছরে ডেঙ্গুতে এখন পর্যন্ত ১৩৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে আগস্ট মাসেই মারা গেছে ৪৩ জন। এ ছাড়া জানুয়ারিতে দুই, ফেব্রুয়ারিতে দুই, মে মাসে এক, জুনে ১৩ ও জুলাইয়ে ৩৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। সেপ্টেম্বরে এখন পর্যন্ত মারা গেছে ৩৬ জন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গু নিয়ে ৪৬ হাজার ৯৩৮ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। তাদের মধ্যে ৪৩ হাজার ৫৫৩ জন সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছে। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি আছে ৩ হাজার ২৫২ জন।

ঢাকার ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইমরুল কায়েস চৌধুরী আমাদের সময়কে বলেন, বর্তমান আবহাওয়া ডেঙ্গুর জন্য অনুকূল পরিবেশ। আক্রান্ত বাড়তে পারে। তবে ঢাকার পরিস্থিতি এখন পর্যন্ত সন্তোষজনক বা স্বস্তিদায়ক। তিনি বলেন, উত্তর সিটি করপোরেশনে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর যে তথ্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে দেওয়া হয় আমরা নিজস্ব পদ্ধতিতে রোগীর কাছে গিয়ে তার ঠিকানা সংগ্রহ করে দেখেছি ডিএনসিসির হাসপাতলে ভর্তি রোগীর ৫০ শতাংশই ঢাকার বাইরের। আমরা চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে প্রতিটি বাড়িতে গিয়ে সোর্স শনাক্তে কাজ করা শুরু করেছি। ১০০ তে ১০০ কর্মসূচির মাধ্যমে ১০০ জন স্বেচ্ছাসেবক কর্মী প্রতিদিন ১০০টি বাড়িতে গিয়ে পরিদর্শন করবে এবং সোর্স ধ্বংস করবে; পাশাপাশি শিখিয়ে দিয়ে আসবে কীভাবে এডিসের লার্ভা ধ্বংস করতে হয়।

বিশেষজ্ঞরাও মনে করেন শুধু ঢাকায় ফোকাস দিলে চলবে না, এবার নতুন নতুন জেলায় ডেঙ্গু রোগী পাওয়া যাচ্ছে। এডিস মশা এমন একটা বাহক সেই মশা যে কোনো মাধ্যমে দূর-দূরান্তে ছড়িয়ে যেতে পারে। তাছাড়া ঢাকায় যেহেতু ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসা বেশি হচ্ছে তাই ঢাকায় ঝুঁকিও বাড়ছে। এ জন্য হাসপাতালের আশপাশে বিশেষ নজর দিয়ে ডেঙ্গু দমন অভিযান চালাতে হবে। পাশাপাশি দেশব্যাপী স্থানীয় সরকারের মাধ্যমে বিশেষ প্রোগ্রাম নিতে হবে। যদিও পৌরসভা, সিটি করপোরেশন ও ইউনিয়ন পরিষদগুলোয় মেম্বার পদে জনপ্রতিনিধি না থাকায় সমন্বিত উদ্যোগে ভাটা পড়েছে।

ঢাকার ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকার দাবি করেছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. জাহানে ফেরদৌস বিনতে রহমান। তিনি আমাদের সময়কে বলেন, আমাদের বিশেষ ক্র্যাশ প্রোগ্রাম চালু রয়েছে। লার্ভিসাইডিং এবং ফগিং কার্যক্রম জোরাল করা হয়েছে। প্রতিদিন হাসপাতালে যে রোগীর তথ্য দেওয়া হচ্ছে সেটিও গতবছরের তুলনায় বেশি না। ঢাকার বাইরের রোগী এসে এখানে চিকিৎসা করায় বিধায় আক্রান্ত বেশি দেখায়।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ও মৃত্যুর তথ্য রাখে ২০০০ সাল থেকে। এর মধ্যে ২০২৩ সালে এ রোগ নিয়ে সবচেয়ে বেশি ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়। ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে সবচেয়ে বেশি ১ হাজার ৭০৫ জনের মৃত্যুও হয় ওই বছর।

ডেঙ্গু প্রতিরোধে দেশব্যাপী তিন মাসব্যাপী পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ক্রাশ প্রোগ্রাম চালানো হবে জানিয়ে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেছেন, ডেঙ্গুর প্রকোপ সেপ্টেম্বর, অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে বেশি দেখা যায়। এ সময় এডিস মশার প্রজননও বাড়ে। ফলে দেশব্যাপী আগামী তিন মাস এ পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করা হবে। প্রতি শনিবার সারাদেশে একযোগে এ কার্যক্রম চালানো হবে। এ কর্মসূচির মাধ্যমে নগর, উপজেলা, ইউনিয়ন ও পৌরসভা পর্যায়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা হবে।

গতকাল সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম এ কথা বলেন।

তিনি বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমকে আরও জোরদার করতে আগামী শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) সকাল ৯টায় জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় ‘দেশব্যাপী ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও পরিচ্ছন্ন অভিযান-২০২৬’ আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ সময় ৬৪টি জেলা ও ৫০৩টি উপজেলা থেকে জুম ও ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সংশ্লিষ্টরা যুক্ত থাকবেন।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও করণীয় নিয়ে একটি সভায় ডেঙ্গুর চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন। বিশেষ করে এডিস মশার লার্ভা যাতে জন্মাতে না পারে এবং আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা যায়, সেদিকে গুরুত্ব দিতে বলা হয়েছে।

মীর শাহে আলম বলেন, এ কর্মসূচিতে স্কাউটস, বিএনসিসি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার স্বেচ্ছাসেবক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ও স্বেচ্ছাসেবক, রেড ক্রিসেন্ট, রোভার, বিডি ক্লিন এবং ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা অংশ নেবেন। একই সময়ে দেশের ৬৪টি জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে এবং ৫০৩টি উপজেলায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপজেলা পরিষদের মাধ্যমে এ কার্যক্রম পরিচালিত হবে। ডেঙ্গু প্রতিরোধে জনসচেতনতা তৈরিতে জাতীয়, জেলা ও মাঠপর্যায়ে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালানো হবে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন সিটি করপোরেশনের ইলেকট্রনিক বিলবোর্ডে ডেঙ্গু ও এডিস মশা প্রতিরোধে তথ্য মন্ত্রণালয়ের তৈরি ভিডিও প্রতি ঘণ্টায় দুই থেকে তিনবার প্রদর্শন করা হচ্ছে।

স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রতি শনিবার দেশের সব কলেজ, উচ্চ বিদ্যালয় ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা নিজ নিজ এলাকার পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে অংশ নেবেন। স্থানীয় প্রশাসন ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো সমন্বয়ের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের জন্য নির্দিষ্ট এলাকা ঠিক করবে। সূত্র: আমাদের সময়

logo

সম্পাদক ও প্রকাশক : মো. নজরুল ইসলাম