ঢাকা ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
সংবাদ শিরোনাম
জানা গেল রোজা শুরুর সম্ভাব্য তারিখ আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকের পর স্থানীয় সরকার নির্বাচনের তারিখ চূড়ান্ত: ইসি সচিব সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় পুলিশের পৃথক ইউনিট গঠনের পরিকল্পনা ইয়েমেনে সংঘাতে বাড়ছে হতাহত, বাস্তুচ্যুত ১ লাখ ২৫ হাজার হাম উপসর্গ নিয়ে আরও ৬ শিশুর মৃত্যু সাতক্ষীরায় পটকা মাছ খেয়ে ব্যবসায়ীর মৃত্যু স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে ইসির ঘোষিত সময়সূচি চূড়ান্ত নয়: তথ্য উপদেষ্টা প্রি-পেইড মিটার রিচার্জ সমস্যায় দুঃখ প্রকাশ ওজোপাডিকোর একদিনের ছুটি নিতে পারলেই একটানা মিলবে ৫ দিনের ছুটি চাহিদার চেয়ে ১৫ লাখ ৮৪ হাজার টন বেশি সার মজুদ

জাল্লিকাট্টু: জীবনের ঝুঁকি নিয়েই যে খেলায় মাতে তামিলনাড়ু

#

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,  11:39 AM

news image

ষাঁড়ের সঙ্গে এই খেলায় তীব্র রোমাঞ্চ আছে, আছে প্রাণনাশের ঝুঁকি। বিশ্বের অন্যতম বিপজ্জনক খেলার তালিকায়ও নাম উঠিয়েছে। খেলাটি নিয়ে রয়েছে প্রাণী অধিকারকর্মীদের দীর্ঘদিনের আপত্তি। একপর্যায়ে ভারতের সুপ্রিম কোর্টও এর ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। তারপরও নিজেদের ঐতিহ্য থেকে সরে আসেননি তামিলনাড়ুর মানুষ।


প্রায় আড়াই হাজার বছরের পুরোনো এই খেলা আজও তামিলনাড়ুর পোঙ্গল বা নবান্ন উৎসবের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। জাল্লিকাট্টুতে প্রতিবছর জীবনবাজি রেখে মাঠে নামেন হাজারো তরুণ। বহু মানুষের গুরুতর আহত হওয়া ও প্রাণহানির ঘটনাও ঘটে। তবু তামিল সংস্কৃতি ও পরিচয়ের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা এই ঐতিহ্যের চর্চা থামেনি।


ষাঁড়ের সঙ্গে মানুষের লড়াই যেভাবে

ফটক খুলে দিতেই মাঠে ধেয়ে আসে শক্তিশালী প্রশিক্ষিত ষাঁড়। তার তীক্ষ্ণ শিং এড়িয়ে খালি হাতে কুঁজ আঁকড়ে ধরতে ছুটে যান একদল তরুণ। কেউ ষাঁড়ের পিঠে ঝাঁপিয়ে পড়েন, কেউ ধাক্কা খেয়ে ছিটকে পড়েন মাটিতে। সামান্য ভুলেই শিংয়ের গুঁতোয় পেটে বা বুকে তৈরি হতে পারে গুরুতর ক্ষত।


খেলায় প্রতিযোগীরা কোনো দড়ি, অস্ত্র বা সুরক্ষাবর্ম ব্যবহার করতে পারেন না। শুধু খালি হাতেই সামলাতে হয় ছুটন্ত ষাঁড়কে। প্রতিযোগীকে নির্দিষ্ট সময় বা দূরত্ব পর্যন্ত ষাঁড়ের কুঁজ ধরে থাকতে হয়। কিছু আয়োজনে ৩০ সেকেন্ড বা প্রায় ১৫ মিটার পর্যন্ত টিকে থাকার নিয়ম রয়েছে। শিং, লেজ বা ঘাড় ধরা নিষিদ্ধ। প্রতিযোগী সফল না হলে অনেক ধরনের জাল্লিকাট্টুতে ষাঁড়কেই বিজয়ী ধরা হয় এবং পুরস্কার পান তার মালিক। কিছু ধরনের আয়োজনে ষাঁড়ের শিংয়ে বাঁধা পুরস্কারের থলি বা পতাকা খুলে নেওয়াও জয়ের শর্ত থাকে।


পোঙ্গল উৎসবের সঙ্গে সম্পর্ক

জাল্লিকাট্টুর শেকড় তামিলদের প্রাচীন সঙ্গম যুগের সংস্কৃতিতেও যুক্ত। সাংস্কৃতিক গবেষণাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান সাহাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, খ্রিস্টপূর্ব ৪০০ থেকে খ্রিস্টীয় ২০০ সালের সঙ্গম যুগের তামিল সাহিত্যে ষাঁড়কে বশে আনার এ ধরনের আয়োজনের উল্লেখ পাওয়া যায়। ‘কালিথোগাই’ কাব্যসংকলনেও এ ধরনের উৎসবের বর্ণনা রয়েছে।


‘জাল্লি’ বা ‘সাল্লিকাসু’ শব্দের অর্থ মুদ্রা এবং ‘কাট্টু’ অর্থ প্যাকেট বা বাঁধা থলি। ঐতিহ্যগতভাবে ষাঁড়ের শিংয়ে মুদ্রার থলি বাঁধা হতো। প্রতিযোগীদের লক্ষ্য ছিল ষাঁড়ের কুঁজ ধরে ছুটতে ছুটতে সেই থলি নেওয়া। এই রীতি থেকেই ‘জাল্লিকাট্টু’ নামটির উৎপত্তি বলে ব্যাখ্যা করা হয়। তামিলদের নবান্ন উৎসব পোঙ্গলের তৃতীয় দিন ‘মাত্তু পোঙ্গল’। দিনটি গবাদিপশুর প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর সঙ্গে যুক্ত। জাল্লিকাট্টু এই উৎসবেরই একটি ঐতিহ্যবাহী আয়োজন।  


স্থানীয়দের কাছে জাল্লিকাট্টু শুধু বীরত্ব প্রদর্শনের খেলা নয়। দেশীয় জাতের শক্তিশালী ষাঁড় সংরক্ষণের সঙ্গেও এর সম্পর্ক রয়েছে বলে সমর্থকেরা দাবি করেন। ২০১৭ সালে জাল্লিকাট্টু চালু রাখতে তামিলনাড়ুর সংশোধিত আইনের ক্ষেত্রেও দেশীয় ষাঁড়ের জাত টিকিয়ে রাখার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছিল।

বিশ্বের অন্যতম বিপজ্জনক খেলা

জাল্লিকাট্টুর ইতিহাস যেমন দীর্ঘ, তেমনি এর ঝুঁকিও ভয়াবহ। স্পেনের ‘সান ফার্মিন’ বা ষাঁড়ের সঙ্গে দৌড় বা আমেরিকার ‘বুল রাইডিং’-এর মতোই বিপজ্জনক হিসেবে ধরা হয়। গবেষণাভিত্তিক বিভিন্ন বর্ণনায় খেলাটিকে গুরুতর আহত ও প্রাণহানির ঝুঁকিপূর্ণ আয়োজন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০১০ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে জাল্লিকাট্টুতে প্রায় এক হাজার ১০০ জন আহত এবং অন্তত ১৭ জন নিহত হওয়ার হিসাব বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।


ছুটন্ত ষাঁড়ের গতি ও শক্তির সঙ্গে খালি হাতে লড়াই করতে গিয়ে প্রতিযোগী ছাড়াও দর্শকরা আহত হতে পারেন। এ কারণে আয়োজনের সময় মাঠের বাইরে চিকিৎসা ও জরুরি সহায়তার ব্যবস্থাও রাখা হয়।


প্রাণী অধিকারকর্মীদের আপত্তি

জাল্লিকাট্টুর বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে সোচ্চার প্রাণী অধিকার রক্ষা সংস্থা ‘পেটা’ ও অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ার বোর্ড অব ইন্ডিয়া। তাদের অভিযোগ, খেলার আগে ষাঁড়কে মদ্যপান করানো, চোখে লঙ্কার গুঁড়ো দেওয়া ও লেজ মোচড়ানোর মতো শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে ২০১৪ সালের ৭ মে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট জাল্লিকাট্টুর ওপর পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা জারি করেন।


তবে আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে ২০১৭ সালে তামিলনাড়ুজুড়ে প্রবল আন্দোলন গড়ে ওঠে। চেন্নাইয়ের মেরিনা বিচে লাখ লাখ মানুষ নেমে এসে ঐতিহ্যের সুরক্ষায় প্রতিবাদ জানান। আন্দোলনের মুখে রাজ্য সরকার প্রাণী নির্যাতন প্রতিরোধ আইন সংশোধন করে খেলাটি পুনরায় চালুর অধ্যাদেশ পাস করে।


পরবর্তী সময়ে ২০২৩ সালের ১৮ মে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের পাঁচ বিচারপতির সাংবিধানিক বেঞ্চ তামিলনাড়ু সরকারের ওই আইনি সংশোধনীকে পূর্ণ বৈধতা প্রদান করেন। বর্তমানে অংশগ্রহণকারী ও ষাঁড়ের কড়া নিবন্ধন এবং চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করে আইনি বিধিনিষেধের অধীনে জাল্লিকাট্টু আয়োজিত হচ্ছে। সূত্র: বিবিসি, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, আনন্দবাজার

logo

সম্পাদক ও প্রকাশক : মো. নজরুল ইসলাম