নিজস্ব প্রতিবেদক
৩০ নভেম্বর, ২০২৫, 11:16 AM
ঘন ঘন কম্পন কি নতুন ঝড়ের শঙ্কা
গত এক সপ্তাহে দেশে-বিদেশে একের পর এক ভূমিকম্পে মানুষের মনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। বাংলাদেশে টঙ্গী ও মাধবদীর মতো জায়গায় ভূমিকম্প অনুভূত হওয়ার পর সাধারণ মানুষের মধ্যে ভীতির পরিবেশ তৈরি হয়েছে। রাজধানী ঢাকায় রাতভর ঘুমহীন মানুষ, বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধের সিদ্ধান্ত, এমনকি গুজব—সব মিলিয়ে ভূমিকম্প যেন শুধু মাটিই না, নাড়া দিয়েছে মানুষের মনেও। এমন পরিস্থিতিতে ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আতঙ্ক নয়, চাই সচেতনতা, প্রস্তুতি আর বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্যের ওপর নির্ভরশীলতা। ভূমিকম্পের আদ্যোপান্ত নিয়ে লিখেছেন হুমায়ূন কবির ও তারেক খান
প্রথমেই সবচেয়ে বেশি আলোচিত একটি ধারণা বিষয়ে পরিষ্কার হওয়া যাক। সেটি হচ্ছে—অনেকেই বলছেন, ছোট ছোট কম্পন বড় ভূমিকম্পের পূর্বাভাস। ব্যাপারটা কি আসলেই তাই? বিজ্ঞানীরা কী বলছেন?
গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, পৃথিবীর ভূগাঠনিক বাস্তবতায় যেসব অঞ্চল টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে রয়েছে, সেখানে ভূমিকম্প ঘন ঘন হওয়া স্বাভাবিক। এই অঞ্চলে প্লেটগুলো একে অপরের সঙ্গে সংঘর্ষ, সরে যাওয়া বা একটির নিচে আরেকটি ঢুকে যাওয়ার প্রক্রিয়ায় ক্রমাগত চাপ জমে থাকে। সেই চাপ যখন সহ্যসীমা ছাড়িয়ে যায়, তখনই ঘটে ভূমিকম্প।
তবে যখন একই এলাকায় ধারাবাহিকভাবে একের পর এক ছোট ছোট ভূমিকম্প হয়, তখন সেটি হয়তো একটি ‘আর্থকোয়ার্ক সোয়ার্ম’, কিংবা কিছু ক্ষেত্রে এটি হতে পারে ‘ফোরশক’—অর্থাৎ বড় ভূমিকম্পের পূর্বস্বরূপ। কিন্তু সমস্যা হলো, এই পার্থক্যটা আগাম নির্ভুলভাবে বলা এখনো সম্ভব নয়। অনেক ফোরশক হয়, যেগুলো পরে আর বড় কম্পনে রূপ নেয় না। আবার অনেক বড় ভূমিকম্পের আগেও কোনো পূর্বকম্পন দেখা যায় না।
বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের অবস্থা: বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিকভাবে যে অঞ্চলে অবস্থিত, তা বেশ সক্রিয় ও ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষত মেঘালয় সীমান্ত, সিলেট-কক্সবাজারের সাবডাকশন জোন—এগুলো ভূমিকম্প উৎপন্নকারী প্রধান এলাকা। এখানকার প্লেটগুলো হাজার বছর ধরে চাপ সঞ্চয় করছে। সম্প্রতি নরসিংদী, টঙ্গী অঞ্চলে কম্পন অনুভূত হয়েছে। এসব এলাকা ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থলের খুব কাছাকাছি নয়, কিন্তু যেহেতু বাংলাদেশের মাটির গঠন এবং ভবন কাঠামো দুর্বল, সেজন্য কাঁপুনি বেশি অনুভূত হয়।
তবে এসব ঘন ভূকম্পন বড় ভূমিকম্পের পূর্বাভাস কি না, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞরা সরাসরি কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেননি। বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ ড. হুমায়ুন আখতার বলেন, ‘আমরা শুধু চাপ জমার ধারা বুঝতে পারি, কিন্তু কবে বড় ভূমিকম্প হবে তা বলা যায় না।’
ভুল ধারণা বনাম বাস্তবতা: ভূমিকম্প নিয়ে মানুষের মাঝে যে আতঙ্ক বাড়ছে, তা অনেক সময় বাস্তবতার চেয়ে বেশি। কারণ এখন সিসমোগ্রাফিক প্রযুক্তি অনেক উন্নত, ফলে ছোট কম্পনও ধরা পড়ে এবং তা দ্রুত মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। বাড়তে থাকা জনসংখ্যা ও সোশ্যাল মিডিয়া সংবেদনশীলতা মিলে ভূমিকম্পের উপস্থিতি যেন অনেক বেশি মনে হয়, যদিও বৈজ্ঞানিকভাবে ভূমিকম্পের গড় হার অপরিবর্তিত।
সুতরাং, ঘন ঘন ভূমিকম্প সবসময় বড় ভূমিকম্পের পূর্বাভাস নয়। তবে এটি ভূমি চাপ ও সক্রিয়তার ইঙ্গিত দিতে পারে, বিশেষত যদি তা ভূকম্পনপ্রবণ এলাকায় হয়। সতর্ক থাকা জরুরি, কিন্তু আতঙ্কিত না হয়ে সচেতনতা, প্রস্তুতি ও তথ্যনির্ভরতা—এই তিনটিই হওয়া উচিত আমাদের প্রধান ভরসা।
সাত দিনে বিশ্বে ১৪৯ ভূমিকম্প: গত সাত দিনে পৃথিবীর নানা প্রান্তে ৪.০ বা তার চেয়ে বেশি মাত্রার ১৪৯টি ভূমিকম্প সংঘটিত হয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশের টঙ্গীর কাছে ৪.০ মাত্রার একটি কম্পনও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) এসব তথ্য জানিয়েছে। তাদের তথ্য অনুযায়ী, ১৪৯টি ভূমিকম্পের অধিকাংশই ছিল সাগরের নিচে বা ভূকম্পনপ্রবণ অঞ্চলে। সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্পটি হয়েছে ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা উপকূলে, যার মাত্রা ছিল রিখটার স্কেলে ৬.৬।
ম্যাককুয়েরি দ্বীপের পশ্চিমে, মারিয়ানা দ্বীপপুঞ্জ অঞ্চল, রাশিয়ার সেভেরো-কুরিলস্কের দক্ষিণাঞ্চল, জাপানের কাছাকাছি ও ফিজি দ্বীপপুঞ্জের পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলোতে একাধিক ভূকম্পনের ঘটনা ঘটেছে। প্রশান্ত মহাসাগরের ‘রিং অব ফায়ার’ অঞ্চলে ভূকম্পন সবচেয়ে বেশি পরিলক্ষিত হয়। এই অঞ্চল পৃথিবীর সবচেয়ে সক্রিয় প্লেট সীমান্তগুলোর একটি।
চিলি, আর্জেন্টিনা, ইরান, গ্রিস, চীন, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া রাজ্যেও ভূকম্পনের খবর পাওয়া গেছে গত সাত দিনে। দক্ষিণ আমেরিকার আন্দিজ পর্বত অঞ্চল এবং মধ্য আমেরিকার এল সালভাদর, গুয়াতেমালা, কোস্টারিকা ও মেক্সিকোর কিছু অংশেও কম্পন অনুভূত হয়েছে।
প্রাকৃতিকভাবে ভঙ্গুর এসব অঞ্চলে একাধিক কম্পনের মাত্রা ছিল ৫.০-এর বেশি। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি ভূমিকম্প হলো—ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা উপকূলে ৬.৬ মাত্রার কম্পন, আলাস্কার সাসিটনা এলাকায় ৬.০ মাত্রার, গ্রিসের পানোরমোসের কাছে ৪.৭ মাত্রার, ক্যালিফোর্নিয়ায় ৪.০ মাত্রার এবং বাংলাদেশে টঙ্গীর কাছে ৪.০ মাত্রার কম্পন।
এ ছাড়া, আটলান্টিক মহাসাগরের মাঝখানে অবস্থিত মিড-অ্যাটলান্টিক রিজ এলাকায় এবং ভারত-আ্যান্টার্কটিকা রিজ অঞ্চলে বেশ কয়েকটি সামুদ্রিক ভূকম্পনের ঘটনা রেকর্ড হয়েছে। সৌভাগ্যক্রমে, এসব ভূমিকম্পের বেশিরভাগই মানব বসতি থেকে দূরে। ফলে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি বা প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ভূকম্পনপ্রবণ অঞ্চলগুলোতে সতর্কতা ও প্রস্তুতি আরও জোরদার করা জরুরি। ভূমিকম্পগুলোর মধ্যে বেশিরভাগ ঘটেছে গভীর রাতে বা ভোররাতে, যখন মানুষ ঘুমিয়ে থাকে। এই প্রতিবেদন প্রস্তুত করতে ইউএসজিএস থেকে সংগৃহীত মানচিত্র ও তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
ভূমিকম্প কেন হয়: আমরা যে মাটির ওপর হেঁটে চলি, সেই পৃথিবীর উপরের স্তরটা আসলে মাত্র একটি টুকরো নয়। এটি অনেকগুলো বৃহদাকার পাতের মতো খণ্ডে বিভক্ত। সেগুলোকে বলা হয় ‘টেকটোনিক প্লেট’। এই প্লেটগুলো সব সময় খুব ধীরে ধীরে নড়ে চলে। কখনো একে অপরের দিকে ধাক্কা দেয়, কখনো দূরে সরে যায়, আবার কখনো একটার নিচে আরেকটা ঢুকে পড়ে।
এই ধাক্কাধাক্কি বা চাপ জমে জমে এক সময় সহ্যসীমা পার করে ফেলে। তখন হঠাৎ করেই মাটির নিচের শক্তি বেরিয়ে আসে। আর সেই শক্তির ঝাঁকুনিতেই আমরা অনুভব করি যাকে বলি ভূমিকম্প। সবচেয়ে বেশি ভূমিকম্প হয় যেসব জায়গায় এই প্লেটগুলো একে অন্যের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়—যেমন প্রশান্ত মহাসাগরের চারপাশ, যাকে বলা হয় ‘রিং অব ফায়ার’।
কীভাবে ভূমিকম্প শনাক্ত হয়: ভূমিকম্প চোখে দেখা যায় না, তবে মাটির নিচের কাঁপুনি ধরা পড়ে বিশেষ যন্ত্রে। এই যন্ত্রের নাম ‘সিসমোগ্রাফ’। মাটির কাঁপুনি যখন শুরু হয় তখন এই যন্ত্র খুব সূক্ষ্মভাবে সেই কম্পন রেকর্ড করে।
বিশেষজ্ঞরা সেসব কম্পনের ধরন, সময়, এবং শক্তি দেখে বুঝতে পারেন, ভূমিকম্পের কেন্দ্র কোথায় ছিল, কতটা গভীরে ছিল এবং কতটা শক্তিশালী ছিল। বড় ভূমিকম্পের পর ছোট ছোট পরাঘাতও (আফটারশক) হয়ে থাকে, সেগুলোও নজরে রাখা হয়। অনেক দেশেই বড় বড় শহরের আশপাশে এই সিসমোগ্রাফ বসানো হয়েছে, যাতে খুব দ্রুত তথ্য পাওয়া যায়।
ভূমিকম্পের খবর আগাম জানার প্রযুক্তি কত দূর: ভূমিকম্প যে হবে, তা আগে থেকে বলা এখনো সম্ভব হয় না। তবে বিজ্ঞানীরা অনেক দূর এগিয়েছেন। বর্তমানে ‘আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম’ বলে একটি প্রযুক্তি রয়েছে, যা মাটির নিচে ছোট ছোট কাঁপুনি শনাক্ত করেই আশপাশের মানুষকে কয়েক সেকেন্ড আগে সতর্ক করতে পারে। যদিও এটা সময় খুব কম দেয়, তবুও এক-দুই সেকেন্ড সময় পেলেও অনেক সময় জীবন বাঁচানো যায়। যেমন, ট্রেন থামিয়ে দেওয়া, গ্যাস বন্ধ করে দেওয়া বা মানুষকে কোনো শক্ত জায়গায় আশ্রয় নিতে বলা।
জাপান, মেক্সিকো বা যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়াতে এসব প্রযুক্তি ব্যবহার হচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত কয়েক ঘণ্টা আগেই জানা যাবে—এমন নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি বিজ্ঞানীরা তৈরি করতে পারেননি। কারণ ভূমিকম্প শুরু হওয়ার আগেই যে সংকেত পাওয়া যাবে, এমন কিছু এখনো বিজ্ঞানীরা খুঁজে পাননি। তবে গবেষণা চলছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রযুক্তি হাতে আসতে হয়তো আরও ১০-২০ বছর সময় লাগতে পারে। ততদিন পর্যন্ত আমাদের সাবধান থাকা, সচেতন থাকা আর ঘরবাড়ি এমনভাবে বানানো দরকার, যেন ভূমিকম্পে ভেঙে না পড়ে—এগুলোই সবচেয়ে বড় প্রস্তুতি।
সূত্র : দৈনিক কালবেলা