NL24 News
০৫ এপ্রিল, ২০২৬, 11:50 AM
গুনাহকে তুচ্ছজ্ঞান করার পরিণতি
‘গুনাহ’ শব্দটি বাংলা ভাষায় বহুল প্রচলিত হলেও এটি মূলত ফারসি শব্দ। ‘গুনাহ’ বোঝাতে বাংলায় আরো একটি বহুল প্রচলিত শব্দ হচ্ছে ‘পাপ’। বাংলা অভিধানে এর অর্থ লেখা হয়েছে অন্যায়, কলুষ, দুষ্কৃতি ইত্যাদি।
আরবিতে গুনাহ বা পাপ বোঝানোর জন্য অনেকগুলো পরিভাষা ব্যবহৃত হয়। যেমন- আল ইছম, আল খাত্বা ও আল খাত্বিআহ , আল মাসিয়াহ , আল জুর্ম, আয্ যান্ব ইত্যাদি।
এসব পরিভাষার মাঝে কিছু সূক্ষ্ম পার্থক্য থাকলেও মূলত যা বোঝায় তা হলো, আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসুল (সা.)-এর আদেশ পালন না করা বা তাঁদের বিরুদ্ধাচরণ করা এবং তাঁদের নিষেধকৃত কাজ করা, তা প্রকাশ্যেই হোক বা গোপনে হোক। (গুনাহ মাফের উপায়, শাহাদাৎ হুসাইন খান ফয়সাল)
একজন মুমিন হিসেবে সব সময় মনকে পাপমুক্ত রাখার চেষ্টা থাকা জরুরি। মহান আল্লাহ ইউসুফ (আ.)-এর ভাষ্য এভাবে উল্লেখ করেন, ‘আর আমি নিজেকে নির্দোষ মনে করি না। নিশ্চয়ই মানুষের মন মন্দপ্রবণ। শুধু ওই ব্যক্তি ছাড়া, যার প্রতি আমার রব দয়া করেন। নিশ্চয়ই আমার রব ক্ষমাশীল ও দয়াবান।’
(সুরা : ইউসুফ, আয়াত : ৫৩)
সুতরাং মানুষের অন্তরকে পাপের পঙ্কিলতা ও কলুষ-কালিমামুক্ত রাখার চেষ্টা করা জরুরি, যাতে তা পাপের দিকে ঝুঁকে না পড়ে।আর যদি কখনো গুনাহ হয়ে যায়, গুনাহ যে পর্যায়েরই হোক না কেন তাকে ছোট মনে করা যাবে না। বরং তাকে পরকালে শাস্তির কারণ মনে করে তা থেকে বিরত থাকা জরুরি। রাসুল (সা.) বলেন, মুমিন ব্যক্তি তার গুনাহগুলোকে এত বিরাট মনে করে, যেন সে একটা পর্বতের নিচে উপবিষ্ট আছে, আর সে আশঙ্কা করছে যে হয়তো পর্বতটা তার ওপর ধসে পড়বে। আর পাপিষ্ঠ ব্যক্তি তার গুনাহগুলোকে মাছির মতো মনে করে, যা তার নাকের ওপর দিয়ে চলে যায়। (বুখারি, হাদিস : ৬৩০৮)
অন্য হাদিসে এসেছে, রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, তোমরা ছোট ছোট গুনাহ থেকে বেঁচে থেকো। কেননা তার দৃষ্টান্ত হচ্ছে ওই সম্প্রদায়ের মতো, যারা কোনো উপত্যকায় অবতরণ করেছে। অতঃপর প্রত্যেকে একটি করে কাঠ নিয়ে এসেছে। এমনকি তা স্তূপাকার ধারণ করেছে। যার দ্বারা তারা রুটি পাকাতে পারে। আর নিশ্চয়ই ছোট ছোট গুনাহ যখন পাপীকে পাকড়াও করবে তখন তাকে ধ্বংস করে ছাড়বে। (মুসনাদ আহমাদ, হাদিস : ২২৮৬০)
একবার ভেবে দেখুন! পরিণতি সম্পর্কে জানা- বোঝার পরও গিবত, হিংসা-বিদ্বেষ, খেয়ানত, মা-বাবার অবাধ্যতা, মিথ্যা বলা, কুদৃষ্টি ও অন্যের মর্যাদাহানির মতো গুনাহগুলো থেকে আমরা কজন বেঁচে থাকতে পারছি! কজন এগুলোকে পাপকর্ম হিসেবে মূল্যায়ন করছি? এসব পাপে লিপ্ত হওয়ার পর আমাদের মধ্যে কোনো অনুশোচনার হচ্ছে কি? হয়তো হচ্ছে। কিন্তু তা খুব সামান্যই।
এভাবে ঈমানি দুর্বলতা, আল্লাহভীতির অভাব এবং পরকালীন জবাবদিহির ব্যাপারে অবহেলার কারণে আমরা আমাদের পাপগুলো প্রতিনিয়তই তুচ্ছজ্ঞান করে চলেছি।
ইমাম গাজালি (রহ.) বলেন, ছোট গুনাহগুলো এক এক করে জমা হতে থাকে। অতঃপর মৃত্যুর সময় এগুলোই ঈমানহারা হওয়ার কারণ হয়। কারণ ছোট ছোট গুনাহ মিলে বড় গুনাহে পরিণত হয় এবং মানুষের ধ্বংসের মাধ্যম হয়। (ইহইয়াউ উলুমিদ্দিন : ৩/৬০)
ইমাম ইবনে কায়্যিম (রহ.) বলেন, দুনিয়া ও আখিরাতে গুনাহের কুপ্রভাব দেহ-মন উভয়ের জন্য এমনই ক্ষতিকর, যা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো—
১. ইলম থেকে বঞ্চিত হওয়া। কারণ ইলম হচ্ছে নুর, যা আল্লাহ মানুষের অন্তরে দান করেন। আর গুনাহ ওই নুরকে নিভিয়ে দেয়।
২. রিজিক থেকে বঞ্চিত হওয়া।
৩. একাকিত্ব অনুভব হওয়া। কারণ গুনাহগার ব্যক্তি আল্লাহর কাছ থেকে দূরে সরে যায়। এ জন্য বহু মানুষের ভিড়েও সে যেন একা, নিঃসঙ্গ। দুনিয়ার সব সুখ একত্র হয়ে গেলেও তার সেই একাকিত্ব দূর করা সম্ভব নয়। এ বিষয়ে শুধু ওই ব্যক্তিই বুঝতে পারে, যার হৃদয় জাগ্রত থাকে। যদি ওই ব্যক্তি বুদ্ধিমান হয়, তাহলে মৃত্যুযন্ত্রণা তাকে ঘায়েল করার আগেই একাকিত্বের সতর্কবাণী অনুধাবন করে তৎক্ষণাৎ গুনাহ ছেড়ে দেবে। (আল জাওয়াবুল কাফি ১/৫২)
কোনো পাপ ছোট নয়। আনাস বিন মালিক (রা.) বলেন, ‘তোমরা বহু এমন (পাপ) কাজ করছ, সেগুলো তোমাদের দৃষ্টিতে চুল থেকেও সূক্ষ্ম (নগণ্য)। কিন্তু আমরা সেগুলোকে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে বিনাশকারী মহাপাপ বলে গণ্য করতাম।’ (বুখারি, হাদিস : ৬৪৯২)
আল্লাহর নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর সাহচর্যপ্রাপ্ত সাহাবিরা সামান্য কোনো পাপ করে ফেললেও তা থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাতেন। যেমন- আবু বকর (রা.) একবার রাবিআহ (রা.)-এর সঙ্গে বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন এবং এক পর্যায়ে তাকে একটা অপছন্দনীয় কথা বলে ফেলেন। অতঃপর তিনি অনুতপ্ত হয়ে বললেন, হে রাবিআহ! তুমি অনুরূপ কথা বলে প্রতিশোধ নিয়ে নাও, যাতে তা আমার কথার কিসাস হয়ে যায়। কিন্তু রাবিআহ আবু বকর (রা.)-এর উচ্চ মর্যাদার কথা ভেবে অনুরূপ কথা বলতে অস্বীকৃতি জানালেন। আবু বকর (রা.) বলেন, তোমাকে অবশ্যই বলতে হবে নতুবা তোমার বিরুদ্ধে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করব।
অতঃপর তিনি পুরো ঘটনা রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জানালে তিনি রাবিআহকে বলেন, তুমি অনুরূপ বলবে না। বরং বলবে, হে আবু বকর! আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করে দিন। রাসুল (সা.)-এর এ নির্দেশনা শুনে আবু বকর (রা.) ক্রন্দনরত অবস্থায় ফিরে গেলেন। (সিলসিলাহ সহিহাহ, হাদিস : ৩২৫৮)