আবুল হোসেন বাবলু
২০ আগস্ট, ২০২২, 10:01 PM
এক যুগেরও বেশী সময় ধরে লোহার শেকলে বাঁধা রংপুরের জাহিদ
বাড়ি ঘরের টাটিবেড়া ঘরের আসবাবপত্র, প্রতিবেশীদের মাঠের ফসলসহ ফলজ গাছের ক্ষতিসাধন সব মিলিয়ে একজন উম্মাদ পাগলকে আটকে রাখতে পায়ে লোহার শিকল পড়িয়েছে তার পরিবার। রংপুরে প্রায় এক যুগেরও বেশী সময় ধরে শিকলে বাঁধা জাহিদের জীবন। প্রথম দেখাতেই মনে হবে সুস্থ জাহিদ। কিন্তু কাছে গেলেই বোঝা যায় অন্য মানুষের মতো স্বাভাবিক জীবন নয় তার। মানসিক ভারসাম্যহীন উম্মাদ হওয়ায় গত একযুগ ধরে শিকলবন্দী রয়েছে কিশোর জাহিদ। রোদ-বৃষ্টি ঝড়তুফান সবই যেনো তার সঙ্গী, এভাবেই কাটছে তার জীবন। মানসিক ভারসাম্যহীন জাহিদের বাড়ি রংপুর মহানগরীর ২নং ওয়ার্ডের শুকান চকি অভিরাম গ্রামে। বাবা ভ্যান চালক দিন মজুর ইউনুস আলী ও মা জাহানারা বেগম দম্পতির ৩ ছেলে মেয়ের মধ্যে বড় ছেলে জাহিদ। জাহিদের ছোটো ১ বোন তার ছোটো ১ ভাই। ভ্যান চালক বাবা অনেক কষ্টে তাদের লেখা পড়ার খরচ যোগান। পাশাপাশি অসুস্থ ছেলের চিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছেন।
নিজের সর্বস্ব ভিটেমাটি বলতে যা ছিলো তা সন্তানের চিকিৎসার পিছনে খুইয়েছেন। বর্তমানে মাথা গোঁজার ঠাঁই বাড়ি টুকু রয়েছে সেটিও ভাইদের কাছে সন্তানের চিকিৎসা করানোর জন্য ধাপে ধাপে টাকা নিয়ে এক প্রকার বিক্রি করে দিয়েছেন। বলা যায় ভাইয়ের আশ্রয়ে আছেন পরিবার নিয়ে। প্রতিবেশীরা জানান, জাহিদ ছোট থেকেই আশপাশের মানুষের ক্ষতি করে। একটু ছাড়া পেলে প্রতিবেশীদের বাড়িঘর ভাঙচুর ফসলের ক্ষতি এমনকি মানুষকে কামড় দিয়ে জখম করে। তাই বাধ্য হয়ে পরিবারের লোকজন তার পায়ে শিকল পরিয়ে রাখেন। তাকে প্রায় ১২ বছরের বেশী সময় ধরে শিকলবন্দী করে রাখা হয়েছে।জাহিদের মা জাহানারা বেগম বলেন, ‘মানুষের ক্ষতি করলে তারা নালিশ করে, নানা কটু কথা শুনায়। তাই জাহিদ কে বাধ্য হয়ে বেঁধে রাখি। জাহিদের বাবা দিনমজুর ইউনুস আলী বলেন, ছেলের বয়স যখন ৩ বছর তখন তারা বুজতে পারেন ছেলে অন্যদের মতো সুস্থ স্বাভাবিক না। পরে অনেক কবিরাজি চিকিৎসা করেন। সর্বশেষ পাবনার পাগলা গারদে নিয়ে যান কিন্তু জাহিদের বয়স কম থাকায় সেখানেও তাকে চিকিৎসার জন্য ভর্তি নেয় নাই। পরে রংপুরের বেশ কয়েকজন মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসককে দেখান। কয়েক বছর চিকিৎসাও চলে। সে সময় চিকিৎসক জানিয়েছিলেন নিয়মিত চিকিৎসা চললে সুস্থ হয়ে যাবে জাহিদ। কিন্তু অর্থের অভাবে আর চিকিৎসা করাতে পারেননি।জাহিদের বাবা আরো জানায়, অন্তত ২২ শতক জমি বিক্রি করতে হয়েছে এ পর্যন্ত জাহিদের চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে। সর্ব শান্ত হয়ে বেশ কিছুদিন আগে সকল চিকিৎসা বন্ধ করতে বাধ্য হয়। বাবা ইউনুস আলী অর্থের অভাবে আর ছেলের চিকিৎসা চালাতে পারছেন না।জাহিদের মা জাহানারা বেগম গণমাধ্যমের সাথে কথা বলতে গিয়ে কান্না জড়িত কন্ঠে জানান, তার ছেলেকে রাখার মত একটা ঘর আমাদের নেই। আমার বুকের ধনকে এভাবে গাছের সাথে বেধে রাখি আমার বুক ফেটে যায়, রোদ-বৃষ্টি ঝড়তুফানেও ঘরে তুলতে পারিনা। আমাদের টাটি বেড়ার ঘর মুহুর্তের মধ্যে ভেঙে ফেলে। আমার যদি একটা আধাপাকা ঘরও থাকতো আমার বুকের মানিককে একটু ভালোভাবে রাখতে পারতাম। ছেলের পাগলামির কারণে বাধ্য হয়ে পায়ে শিকল পরিয়ে রাখতে হয়। তিনি বলেন, ছেলেকে শিকল পরাতে কষ্ট হয়। কিন্তু শিকল না পরালে সে আমাদেরকেও মারধর করে। আমার সারা শরীর কামরে শেষ করে দিয়েছে। এ বিষয়ে রংপুর সিটি কর্পোরেশন ২নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর বলেন, পরিবার বাধ্য হয়ে শিকল পরিয়ে রেখেছে নিজেদের সন্তানের পায়ে। এদের চিকিৎসায় সরকার ও বিত্তবানদের এগিয়ে আসা উচিৎ।পরিষদের পক্ষথেকে মাঝে মাঝে সাহায্য দেওয়া হয়। সমাজ সেবা কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম পাইকার বলেন এরকম অবহেলিত জনগোষ্ঠীকে সমাজের মুল স্রোতধারায় নেওয়ার যে চিন্তা চেতনা তা বাস্তবায়নে কাজ করছে সরকার। জাহিদ কে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা করার জন্য পরামর্শ দেন এই কর্মকর্তারা।