আল-কোরআনে ব্যবসা-বাণিজ্য
নিজস্ব প্রতিবেদক
০৮ অক্টোবর, ২০২৬, 11:35 AM
নিজস্ব প্রতিবেদক
০৮ অক্টোবর, ২০২৬, 11:35 AM
আল-কোরআনে ব্যবসা-বাণিজ্য
আতাউর রহমান খসরু
আল্লাহ কোরআনকে করেছেন মানবজাতির হেদায়েতের উৎস। তাকে সব জ্ঞানের ভাণ্ডার বানিয়েছেন।
আর তা শুধু পরকালীন জ্ঞানেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং জাগতিক জীবনের প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও নির্দেশনাও তাতে রয়েছে। তাই ব্যবসা-বাণিজ্য সম্পর্কেও কোরআনে রয়েছে ব্যাপক নির্দেশনা।
আল-কোরআনে ব্যবসা-বাণিজ্য
কোরআনে ব্যবসা-বাণিজ্য বোঝাতে প্রধানত তিজারা শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। তবে ‘বাই’ (বেচাকেনা বা লেনদেন) ও ‘শিরা’ (ক্রয় করা) শব্দদ্বয় এক ও পৃথকভাবেও আর্থিক লেনদেনকে বোঝায়।
কোরআনের চারটি সুরার ছয় স্থানে আট আয়াতে তিজারা শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। এর মধ্যে সুরা বাকারাতেই রয়েছে পাঁচটি আয়াত। আর বাই ও শিরা শব্দ দুটি পবিত্র কোরআনের সাতটি সুরায় চার স্থানে ১৯ আয়াতে এসেছে। এর মধ্যে সুরা বাকারায় সর্বোচ্চ ৯ বার এসেছে। (কোরআন পিডিয়া)
কোরআনে ব্যবসা-বাণিজ্য
ব্যবসা-বাণিজ্য ও আর্থিক লেনদেন বিষয়ে পবিত্র কোরআনের প্রধান প্রধান নির্দেশনা তুলে ধরা হলো—
১. ব্যবসা বৈধ : মহান আল্লাহ উপার্জনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবসা-বাণিজ্যকে বৈধ করেছেন। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘যারা সুদ খায় তারা সেই ব্যক্তিরই মতো দাঁড়াবে, যাকে শয়তান স্পর্শ দ্বারা পাগল করে। এটা এ জন্য যে তারা বলে, ক্রয়-বিক্রয় তো সুদের মতো। অথচ আল্লাহ ক্রয়-বিক্রয়কে হালাল ও সুদকে হারাম করেছেন।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ২৭৫)
২. বাণিজ্য হবে সম্মতিতে : ইসলামের দৃষ্টিতে কোনো আর্থিক লেনদেন গ্রহণযোগ্য হওয়ার শর্ত হলো তাতে উভয়পক্ষের সন্তুষ্টি ও সম্মতি থাকতে হবে।
জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়া ব্যবসা-বাণিজ্য ইসলামে গ্রহণযোগ্য নয়। আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনরা! তোমরা একে অপরের সম্পত্তি অন্যায়ভাবে গ্রাস কোরো না; কিন্তু তোমাদের পরস্পর রাজি হয়ে ব্যবসা করা বৈধ। একে অপরকে হত্যা কোরো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি পরম দয়ালু।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ২৯)
৩. লেনদেন হবে লিখিত : ব্যবসা-বাণিজ্য ও আর্থিক লেনদেন লিখিতভাবে করার পরামর্শ দিয়েছে ইসলাম, বিশেষ করে এমন আর্থিক লেনদেন, যার দায় অবশিষ্ট থাকে তা লিখিত রাখা উত্তম। লেখার সময় উভয়পক্ষের সততা রক্ষা করা আবশ্যক। ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মুমিনরা! তোমরা যখন একে অন্যের সঙ্গে নির্ধারিত সময়ের জন্য ঋণের কারবার করো, তখন তা লিখিয়ে রেখো। তোমাদের মধ্যে কোনো লেখক যেন ন্যায্যভাবে লিখে দেয়। লেখক লিখতে অস্বীকার করবে না।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ২৮২)
৪. মুনাফার লোভে অসততা নয় : শরিয়ত কোনো ব্যক্তিকে মুনাফার লোভে ব্যবসা-বাণিজ্যে অসততা অবলম্বনের অনুমতি দেয় না। আল্লাহ অসৎ ব্যবসায়ীর প্রতি অভিশাপ করে বলেছেন, ‘দুর্ভোগ তাদের জন্য যারা মাপে কম দেয়, যারা লোকের কাছ থেকে মেপে নেওয়ার সময় পূর্ণমাত্রায় গ্রহণ করে এবং যখন তাদের জন্য মেপে বা ওজন করে দেয়, তখন কম দেয়। তারা কি চিন্তা করে না যে তারা পুনরুত্থিত হবে।’ (সুরা : মুতাফফিফিন, আয়াত : ১-৪)
৫. দূর বাণিজ্যে বেশি প্রাচুর্য : ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য দূর দেশে সফর করে, আল্লাহ তাদের বিশেষ বরকত দেন। পবিত্র কোরআনের একটি আয়াত থেকে সেই ধারণা পাওয়া যায়। আল্লাহ তাআলা সাহাবিদের সম্পর্কে বলেন, ‘আল্লাহ জানেন যে তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ অসুস্থ হয়ে পড়বে, কেউ কেউ আল্লাহর অনুগ্রহ (জীবিকা) সন্ধানে দেশভ্রমণ করবে এবং কেউ কেউ আল্লাহর পথে সংগ্রামে লিপ্ত হবে।’ (সুরা : মুজ্জাম্মিল, আয়াত : ২০)
আয়াতের ব্যাখ্যায় প্রাজ্ঞ আলেমরা বলেন, সবচেয়ে বরকতময় সফর হলো যা দ্বিনি ইলম অর্জনের জন্য করা হয়; এরপর যা ঈমান রক্ষার জন্য করা হয় (তথা হিজরত); অতঃপর যা জীবিকার সন্ধানে করা হয়।
৬. নৌ-বাণিজ্যে অবহেলা নয় : পবিত্র কোরআনের একাধিক আয়াতে আল্লাহ নৌ-বাণিজ্যের কথা বলেছেন, যা থেকে প্রমাণ হয় নৌ-বাণিজ্য ব্যবসার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম এবং মুসলমানদের উচিত এই খাতে মনোযোগী হওয়া। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা দেখো তার (সমুদ্রের) বুক চিরে নৌযান চলাচল করে, যাতে তোমরা তাঁর অনুগ্রহ (জীবিকা) অনুসন্ধান করতে পারো এবং যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো।’ (সুরা : ফাতির, আয়াত : ১২)
৭. ব্যবসায় সময় ও মৌসুম গুরুত্বপূর্ণ : ব্যবসা-বাণিজ্যে আত্মনিয়োগ করতে চায় তাদের মনে রাখতে হবে যে বাণিজ্যের প্রায় প্রতিটি খাতের একটি উপযুক্ত সময় ও মৌসুম আছে। আর সেই সময়টি কাজে লাগানো জরুরি। ইরশাদ হয়েছে, ‘যেহেতু কুরাইশের আসক্তি আছে, আসক্তি আছে তাদের শীত ও গ্রীষ্মের সফরের।’ (সুরা : কুরাইশ, আয়াত : ১-২)
তাফসিরবিদরা বলেন, কুরাইশরা ছিল পেশায় ব্যবসায়ী। তারা গ্রীষ্মে শামে এবং শীতে ইয়েমেনে ব্যবসা করতে যেত। কেননা এ সময়ে উভয় অঞ্চলের উত্তম পণ্যগুলো পাওয়া যেত। আল্লাহ কোরআনে দুই সফরের কথা বলে ব্যবসায়ীদের মৌসুম সচেতন হওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন।
দ্বিনদারি ও ব্যবসার সম্পর্ক
একজন মুমিনের জীবনে ব্যবসা-বাণিজ্যের স্বরূপ কেমন হবে এবং সে কিভাবে দ্বিনদারির সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষা করে চলবে সে বিষয়েও কোরআনের নির্দেশনা রয়েছে। সংক্ষেপে যা তুলে ধরা হলো—
১. ঈমান ও আমল ব্যবসার মতোই : পবিত্র কোরআনে আল্লাহ ঈমান ও আমলকে তিজারা ও বাই শব্দ দ্বারা ব্যক্ত করেছেন, যা অন্য কোনো পেশার ক্ষেত্রে হয়নি। আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনরা! আমি কি তোমাদেরকে এমন এক বাণিজ্যের সন্ধান দেব যা তোমাদেরকে রক্ষা করবে মর্মন্তুদ শাস্তি থেকে; তা এই যে তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলে বিশ্বাস স্থাপন করবে এবং তোমাদের ধন-সম্পদ ও জীবন দ্বারা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করবে। এটাই তোমাদের জন্য শ্রেয় যদি তোমরা জানতে।’ (সুরা : সাফ, আয়াত : ১০-১১)
২. ইবাদত ও ব্যবসা একসঙ্গেও হতে পারে : ব্যবসা-বাণিজ্য যদি ঈমান ও ইসলামের জন্য অন্তরায় না হয়, তবে দ্বিন পালন ও ব্যবসা একসঙ্গে হতে পারে। আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের প্রতিপালকের অনুগ্রহ সন্ধান করাতে তোমাদের কোনো পাপ নেই। যখন তোমরা আরাফাত থেকে প্রত্যাবর্তন করবে তখন মাশআরুল হারামের কাছে পৌঁছে আল্লাহকে স্মরণ করবে এবং তিনি যেভাবে নির্দেশ দিয়েছেন সেভাবে তাঁকে স্মরণ করবে।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ১৯৮)
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম কুরতুবি (রহ.) লেখেন, পবিত্র কোরআনে অনুগ্রহ সন্ধান শব্দযুগল ব্যবসার অর্থে এসেছে।...সুতরাং আয়াতে হাজির জন্য হজে ইবাদত পালনের পাশাপাশি ব্যবসা বৈধ হওয়ার প্রমাণ রয়েছে। (তাফসিরে কুরতুবি)
৩. ব্যবসা যেন দ্বিনদারিকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে : ইসলাম ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রতি উৎসাহিত করেছে। তবে মুমিনদের এই বিষয়েও সতর্ক করেছে যেন ব্যবসা দ্বিন পালনে প্রতিবন্ধক না হয়। পবিত্র কোরআনে তাদের নিন্দা করা হয়েছে, যারা ব্যবসার জন্য ইবাদত ত্যাগ করেছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘যখন তারা দেখল ব্যবসায় ও কৌতুক, তখন তারা তোমাকে দাঁড়ান অবস্থায় রেখে তার দিকে ছুটে গেল। বোলো, আল্লাহর কাছে যা আছে তা ক্রীড়া-কৌতুক ও ব্যবসা অপেক্ষা উত্তম। আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ রিজিকদাতা।’ (সুরা : জুমা, আয়াত : ১১)
৪. দ্বিনকে প্রাধান্য দেওয়া : যখন মুমিনের ব্যবসা-বাণিজ্য ও জীবিকার অবলম্বন এবং দ্বিনদারি মুখোমুখি হয়, তখন সে দ্বিনদারিকে প্রাধান্য দেয়। আল্লাহর নির্দেশ হলো, ‘হে মুমিনরা! জুমার দিনে যখন নামাজের জন্য আহ্বান করা হয়, তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণে ধাবিত হও এবং ক্রয়-বিক্রয় ত্যাগ কোরো, এটাই তোমাদের জন্য শ্রেয় যদি তোমরা উপলব্ধি করো।’ (সুরা : জুমা, আয়াত : ৯)
আল্লাহ সব মুসলমানকে কোরআনের জ্ঞান দ্বারা উপকৃত করুন। আমিন।