NL24 News
২৪ এপ্রিল, ২০২৫, 12:41 PM
আনারস আকরামের ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়েছে
শাহীন খন্দকার: রাজধানীর অলিতে গলিতে ফুটপাতসহ গ্রামগঞ্জের হাট-বাজারে মৌসুমি ফলের পাশাপাশি সুমিষ্ট ঘ্রাণ আর স্বাদে রসালো ফল আনারস এখন সর্বত্রই পাওয়া যাচ্ছে। এই গরমে রসালো আনারসের চাহিদা রয়েছে ব্যাপক বলে জানিয়েছেন, আনারস বিক্রেতা আকরাম হোসেন। আকরাম জানান, এক সময় তিনি হোটেলে বাবুর্চির সহকারি হিসাবে ১২ হাজার টাকার মাইনাতে চাকুরী করতেন মতিঝিলে। রোজার ঈদের পরে বাড়ী কুমিল্লা থেকে ফিরে ২৫০০ টাকা পুঁিজ নিয়ে প্রতিদিন আগাঁরগাও মেট্টোরেল স্টেশনে তার বিক্রি ৫-৭ হাজার টাকা আয় করছেন। কোনদিন আবার ৪-৫ হাজার টাকাও বিক্রি হয়। আকরাম পরিবার নিয়ে আগের চেয়ে পরিবার নিয়ে অনেক ভালো আছেন। আগে থাকতেন বস্তিতে এখন থাকেন ফ্ল্যাট বাড়ীতে। আকরাম বলেন, ভাতে মাইনা ১২০০০ টাকার চেয়ে এখন তিনি বেশ ভালো আছেন,পরিবার পরিজন নিয়ে মাসে তার আয় ৩০-৪০ হাজার টাকা! এখন প্রতিদিন তাকে লগ্নি করতে হচ্ছে আড়াই হাজার টাকায় ১৫০ পিচ আনারস সংগ্রহ করতে হয় কারওয়ানবাজার অথবা রায়ের বাজার থেকে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দেশীজাতের আনারস ছাড়াও ফিলিপাইনের জাতের আনারসও আবাদ হচ্ছে দেশে।
তবে জনপ্রিয় আনারস মধুপুরের ও পার্বত্যাঅঞ্চলের সেই সঙ্গে সিলেটের আনারস এই গরমে বেশী বিক্রি হচ্ছে। আকারামের মতই অন্যান্য আনারস ব্যাবসায়িরা জানিয়েছেন, যতো গরম হবে ততোধিক স্টেশনে কাটা আনারস বিক্রি হবে। প্রতিবেদকের সঙ্গে কারওয়ানবাজারের আনারসচাষীসহ মহাজনের ব্যাবসায়ি শ্রমিকদের সাথে কথা হলে জানান দারুণ ব্যাস্ত সময় পার করছেন তারা। আনারসে সয়লাব, প্রতিদিন শতশত ট্রাকে করে মধুপুরসহ অন্যান্য জেলা থেকে আনারস আসছে রাজধানীতে।
টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলা পাহাড়ি জনপদে ৬৬টি গ্রাামের মানুষের জীবন-জীবিকার প্রধান অর্থনৈতিক উৎসহ আনারস। চাষাবাদ, পরিচর্যা, পরিবহন, প্রক্রিয়াজাত ও বাজারজাতকরণসহ সামগ্রিক কর্মকান্ডে দেড়-দুই লাখ মানুষের জীবন-জীবিকা জড়িত। এধুপুরের আদিবাসী চাষীরা জানিয়েছেন, আনারস চাষে সেচের প্রয়োজন পড়ে না। কিন্ত চলতি বছর টানা খরায় ফলন কিছুটা কম হয়েছে। মধুপুরে কৃষিঋণের বেশির ভাগ বিতরণ হয় আনারস খাতে। এছাড়া মহাজনি দাদনের কোটি কোটি টাকা লগ্নি হয়।
কথা হয় অবসরপ্রাপ্ত টাঙ্গাইল জেলা কৃষিকর্মকর্তা রস্তম আলী তালুকদার বলেন, মহাজনি ঋন ছাড়াও অসাধু কেমিক্যাল ব্যবসায়ীদের ফাঁদ দুশ্চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ আনারস, কলা ও এর সাথি ফসলকে কেন্দ্র করে কোটি কোটি টাকার চোরাই, নকল ও ক্ষতিকর হরমোন, সার এবং কেমিক্যালের অবাধ বাণিজ্য করছে প্রভাবশালী সিন্ডিকেট। এতে যে শুধু আনারস, কলা-হলুদসহ অন্যান্য ফসলের ক্ষতি করছে, সবজি বিষাক্ত হচ্ছে তা-ই নয়, জমির উর্বরতা শক্তি ও মাটির উপকারী জীব-অণুজীব বিনষ্ট হচ্ছে। ক্ষতিকর কেমিক্যালে উপকারী পতঙ্গ মৌমাছির সংখ্যা কমছে।
তিনি আরও বলেন, আনারসের আদি নিবাস দক্ষিণ আমেরিকা।শতাব্দি ধরে চাষ হয়ে আসছে, সেই ১৭ শতকে ইউরোপে আনারস গাছ বিলাসবহুলতার গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক প্রতীক বলেও প্রচলন রয়েছে। এক তথ্যে আরো জানাগেছে ১৮২০ সন থেকে আনারস বানিজ্যিকভাবে গ্রীনহাউস এবং গ্রীষ্মমন্ডলীয় বাগানে চাষ হয়ে আসছে।
আনারস পরাগায়নবিহীন উদ্ভিদের পৃথক ফুলগুলি একত্রিত হয়ে একাধিক ফল তৈরি করে। উদ্ভিদটি সাধারণত ফলের শীর্ষে উৎপাদিত অফসেট থেকে বংশবিস্তার করে। পার্শ্বীয় অঙ্কুর থেকে, এবং সাধারণত এক বছরের মধ্যে পরিপক্ক হয়। তথ্যে আরো জানাগেছে বিশ্বের শীর্ষ আনারস রপ্তানীকারক দেশ ফিলিপাইন।
২০১৪ সালে ফিলিপানো কোম্পানী ডেলমন্টে প্যাসিফিক লিমিটেড ডেল মন্টে ফুডস ক্রয় সম্পন্ন করার পরে ডেল মন্টে বাগানগুলি বর্তমানে স্থানীয়ভাবে পরিচালিত হচ্ছে। আর বানিজ্যিক চাষের জন্য কৃত্রিম পদ্ধতিতে ফুল ফোটানোও যেতে পারে।
আনারসের উপরের অংশ মাটিতে রোপণ করে নতুন গাছ তৈরী করাও যায় তবে স্লিপ এবং সাকার বাণিজ্যিকভাবে রোপণ করা হয় বলে কৃষি অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক জাওয়াদ জানিয়েছেন। তিনি আরও বলেন, বিশ্বেও শীর্ষ আনারস রপ্তানীকারক দেশের মধ্যে ফিলিপাইন অন্যতম। কোস্টারিকা, ব্রাজিলও বিশ্বে উৎপাদনকারী দেশের মধ্যে প্রায় এক তৃতীয়াংশ।
এই কৃষি কর্মকর্তা আরো বলেন, বাংলাদেশ ও পার্শ্ববতী দেশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গেও বানিজ্যিকভাবে চাষ হচ্ছে। বাংলাদেশে টাঙ্গাইলের মধুপুর ও পার্বত্য চট্টগ্রাম, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান আনারস চাষের জন্য উপযোগী পাহাড়ি জরপদে চাষ হচ্ছে।
এছাড়া সিলেট, মৌলভীবাজার, কুমিল্লা ও নরসিংদী নেত্রকোনা জেলায় প্রচুর পরিমাণে আনারসের চাষ হয়। পুষ্টিমানের দিক দিয়েও আনারসের গুরুত্ব অপরিসীম। আনারসে ভিটামিন এ.বি.ও সি-এর উৎস। ইচ্ছে করলে বসতবাড়ির আশে পাশে খালি জায়গাতেও আনারস চাষ করে সহজেই পরিবারের পুষ্টির চাহিদা পুরণ করা যেতে পারে। তিনি বলেন, কেউ যদি ব্যাক্তিগত ভাবে আনারসের বাগান করতে চাইলে তাকে বিভাগীয় ও জেলা উদ্যানপালন অধিদপ্তরে গিয়ে যোগাযোগ করতে পারেন।