আইনের শর্ত উপেক্ষা করে একের পর এক পৌরসভা
নিজস্ব প্রতিবেদক
০৯ আগস্ট, ২০২৬, 11:17 AM
নিজস্ব প্রতিবেদক
০৯ আগস্ট, ২০২৬, 11:17 AM
আইনের শর্ত উপেক্ষা করে একের পর এক পৌরসভা
মিলছে না নাগরিক সেবা
দেশে একের পর এক নতুন পৌরসভা হচ্ছে। কোনোটিই পৌরসভা গঠনের আইনি সব শর্ত পূরণ করতে পারছে না। গত তিন দশকে শখানেক পৌরসভা হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, রাজনৈতিক বিবেচনায়, কিছু ব্যক্তির দাবি এবং দলীয় লোকদের পুনর্বাসনের জন্য এগুলো করা হচ্ছে। স্বায়ত্তশাসিত এসব প্রতিষ্ঠানের নিজেদের আহরিত রাজস্ব দিয়ে চলার কথা। কিন্তু অনেক পৌরসভা তাদের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন দিতেই হিমশিম খাচ্ছে। নাগরিকদের মিলছে না সেবা। তার পরও হচ্ছে নতুন নতুন পৌরসভা।
সর্বশেষ গত ১৭ মে কক্সবাজারের পেকুয়া ইউনিয়নকে পৌরসভায় রূপান্তর করে সরকার। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের নির্বাচনী এলাকার এই পৌরসভা গঠনেও কিছু শর্ত পূরণ করা হয়নি। তা সত্ত্বেও কীভাবে পৌরসভাটি গঠিত হলো, এ বিষয়ে দায়িত্বশীল কেউ মন্তব্য করতে চান না।
জানতে চাইলে স্থানীয় সরকার বিভাগের যুগ্ম সচিব (পৌরসভা) খলিলুর রহমান বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি বলতে পারব না। যখন এটা হয়েছে, তখন আমি এ দায়িত্বে ছিলাম না।’
স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) আইন ২০০৯ সালে সংশোধন করা হয়। এই আইনে সাতটি মৌলিক শর্ত পূরণ সাপেক্ষে পৌরসভা গঠনের বিধান রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো– পৌর এলাকার জনসংখ্যা হতে হবে সর্বনিম্ন ৫০ হাজার। প্রতি বর্গকিলোমিটারে জনসংখ্যার ঘনত্ব হবে দুই হাজার। ৭৫ শতাংশ পেশাজীবী হবেন অকৃষিনির্ভর। শতকরা ৩৩ ভাগ ভূমি হবে অকৃষি প্রকৃতির।
নবগঠিত পেকুয়া পৌরসভার জনসংখ্যা ৬০ হাজার ৫৭৪ জন। জনসংখ্যার শর্ত পূরণ করলেও তথ্য বাতায়ন বলছে, এই পৌরসভার প্রায় ৭২ শতাংশ মানুষ কৃষিজীবী। পৌরসভাটি কিছু শর্ত পূরণ করতে পারলেও, গত তিন দশকে দেশে যেসব পৌরসভার অনুমোদন সরকার দিয়েছে, সেগুলোর মধ্যে রংপুরের হারাগাছা পৌরসভার অবস্থা তুলনামূলক ভালো। তবে সেখানেও পেশাজীবীর শর্ত এখনও পূরণ হয়নি। ১৯৮৯ সালে গঠিত পৌরসভাটির ৪৮ শতাংশ পেশাজীবী কৃষক।
বর্তমানে দেশে ৩৩১টি পৌরসভা আছে। এর মধ্যে প্রথম (ক) শ্রেণির ২০৮টি, দ্বিতীয় (খ) শ্রেণির ৯৪টি ও তৃতীয় শ্রেণির (গ) ২৯টি। স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) আইন অনুযায়ী, পৌরসভা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানকে নিজের আহরিত রাজস্ব দিয়ে তাদের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা নির্বাহ করতে হয়। পাশাপাশি নাগরিক সেবামূলক উন্নয়নমূলক কার্যক্রম বাস্তবায়ন করতে হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো– সড়ক নির্মাণ, উন্নয়ন ও মেরামত, সড়কবাতি স্থাপন, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, ড্রেনেজ ব্যবস্থা, মশক নিয়ন্ত্রণ প্রভৃতি। কিন্তু দেশের কোনো পৌরসভাই নিজস্ব রাজস্ব দিয়ে সেটা করতে পারছে না। মাঝে মাঝে সরকার থেকে কিছু অনুদান দেওয়া হয়। দাতাগোষ্ঠীও এগিয়ে আসে। তার পরও পৌরসভাগুলোর আর্থিক অবস্থা রুগ্ণ।
সাবেক স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব আবু আলম শহীদ খান বলেন, এসব পৌরসভা রাজনৈতিক বিবেচনায় মন্ত্রী-এমপির সুপারিশে করা হয়েছে। এ থেকে জনগণের লাভ হয় না। বরং তাদের পৌর কর দিতে হয়। তাদের ভোগান্তি বাড়ে। আবার পৌরসভাগুলো তাদের কর্মীদের বেতন দিতে পারে না। সবারই কষ্ট বাড়ে।
শর্ত ভঙ্গের ছড়াছড়ি
বাংলাদেশে প্রথম পৌরসভা আইন হয় ১৯৭৭ সালে। ওই আইনে পৌরসভা গঠনের শর্ত ছিল সর্বনিম্ন জনসংখ্যা হতে হবে ২৫ হাজার। প্রতি বর্গমাইলে দুই হাজার মানুষের বসতি থাকতে হবে। অকৃষিজীবী পেশার মানুষ থাকতে হবে ৭৫ শতাংশ। কিন্তু সেই শর্তও পূরণ হচ্ছে না।
২০০২ সালে গঠিত হয় যশোরের বাঘারপাড়া পৌরসভা। এটি আয়তনে দেশের সবচেয়ে ছোট পৌরসভা– মাত্র ৩ দশমিক ১২ বর্গকিলোমিটার। এতদিনেও মোট জনসংখ্যার শর্তটি পূরণ হয়নি। বর্তমানে পৌর এলাকার জনসংখ্যা ১০ হাজার ১৪১। তাদের ৫৮ শতাংশেরও বেশি কৃষিজীবী।
২০১৭ সালে গঠিত জামালপুরের হাজরাবাড়ি পৌরসভার জনসংখ্যা ২০ হাজার। এটিও কোনো শর্তই পূরণ করতে পারেনি। গ্রাম এলাকায় গঠিত এ পৌরসভায় বর্তমানে মোট জনবল ১৬ জন। এর মধ্যে একজন প্রশাসক ও একজন সহকারী প্রকৌশলী। অন্যরা ছোট পদের। তারা নিয়মিত বেতন-ভাতা পান না। পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী মুয়াক্ষীর হোসেন বলেন, ‘বেতন-ভাতার সমস্যা আছে। এই দিক থেকে সংকীর্ণ অবস্থায় আছি আমরা।’
কভিড মহামারির পরে দেশের ২৬০টি পৌরসভার বেতন অনিয়মিত হয়ে পড়ে। সেই ধাক্কা আর পৌরসভাগুলো কাটিয়ে উঠতে পারেনি। কভিড শেষে পৌরসভার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সংগঠন পৌরসভা সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন ও পৌরসভার মেয়রদের সংগঠন মিউনিসিপ্যাল অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে এক হাজার ২৪৯ কোটি টাকা বরাদ্দ চাওয়া হয়। সরকারের পক্ষ থেকে কিছু আর্থিক অনুদান দেওয়া হলেও পৌরসভাগুলো সংকট কাটিয়ে উঠতে পারেনি। সংকট মোচনে দেশের পৌরসভাগুলোর জন্য বিশ্বব্যাংকের কাছে ৩০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ চায় সরকার।
দুর্বল আর্থিক অবস্থার কারণে পৌরসভাগুলো তাদের প্রয়োজনীয় সেবা দিতে পারছে না। ময়মনসিংহের নান্দাইল পৌরসভার বার্ষিক রাজস্ব আয় এক কোটি টাকার কিছু বেশি। এর মধ্যে সরকারি-বেসরকারি অনুদানও ছিল। কিন্তু গত অর্থবছরে পৌরসভার জনবলের বেতন-ভাতা বাবদ পরিশোধ করা হয়েছে এক কোটি টাকা। ১০ লাখ টাকার মতো উদ্বৃত্ত ছিল। তা দিয়ে নাগরিকদের চাহিদা অনুযায়ী সেবা তারা দিতে পারেনি। হাতেগোনা কিছু পৌরসভা ছাড়া সবগুলোরই প্রায় একই অবস্থা। এর মধ্যে প্রথম শ্রেণির পৌরসভাও রয়েছে অনেক।
বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে যে ১১টি সংস্কার কমিশন গঠিত হয়, এর মধ্যে স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশন ছিল অন্যতম। কমিশনের প্রধান ছিলেন স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. তোফায়েল আহমেদ (প্রয়াত)। ওই কমিশন সুপারিশ করেছিল, যেসব পৌরসভা রুগ্ণ ও রাজনৈতিক বিবেচনায় করা হয়েছে, সেগুলোকে ইউনিয়ন পরিষদের সঙ্গে একীভূত করার। কিন্তু ওই সুপারিশের বাস্তবায়ন করেনি বিগত সরকার। ২০২৫ সালের ৮ অক্টোবর ড. তোফায়েল আহমেদ প্রয়াত হন। বর্তমান সরকারও এ ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার চিন্তা নেই বলে স্থানীয় সরকার বিভাগ সূত্রে জানা গেছে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সহসভাপতি শেখ মেহেদী আহসান বলেন, এসব পৌরসভা সম্পূর্ণ রাজনৈতিক বিবেচনায় হয়েছে। যখন যে দল ক্ষমতায় এসেছে, তাদের নেতাকর্মীদের পুনর্বাসনের জন্য করছে। এতে পৌরবাসীর উপকার তেমন হয় না। বরং তারা হোল্ডিং ট্যাক্সের আওতায় গিয়ে ভোগান্তি পোহান। আর রাজনৈতিক নেতারা ভোটের আগে পৌরসভা করার আশ্বাস দিয়ে ভোট নেন। পরে তারা এটাকে সফলতা হিসেবে জাহির করেন। তবে বিদেশি অনুদানে পৌরসভায় কিছু অবকাঠামোগত উন্নয়ন করা হয়।
যেসব পৌরসভার আর্থিক অবস্থা অতি দুর্বল
তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, দেশে আর্থিক অবস্থা অতি দুর্বল, এমন অনেক পৌরসভা রয়েছে। এগুলোও আইনের শর্ত অনুসরণ না করে বিভিন্ন সময় গঠিত হয়। এর মধ্যে আছে শেরপুরের শ্রীবরদী, কুমিল্লার বুড়িচং, চট্টগ্রামের নাজিরহাট, রাঙামাটির বাঘাইছড়ি, বগুড়ার সারিয়াকান্দি, শিবগঞ্জ, কাহালু, তালোড়া, সিরাজগঞ্জের তাড়াশ, নাটোরের বাগাতিপাড়া, গাইবান্ধার পলাশবাড়ী, দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট, নীলফামারীর ডোমার, পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ, কুষ্টিয়ার খোকসা, নড়াইলের লোহাগড়া, হবিগঞ্জের আজমিরীগঞ্জ, সিলেটের জকিগঞ্জ প্রভৃতি। সূত্র : দৈনিক সমকাল