অর্থায়নের উৎস বৈচিত্র্যময় করতে হবে: অর্থমন্ত্রী
নিজস্ব প্রতিবেদক
১৩ জুন, ২০২৬, 2:02 PM
নিজস্ব প্রতিবেদক
১৩ জুন, ২০২৬, 2:02 PM
অর্থায়নের উৎস বৈচিত্র্যময় করতে হবে: অর্থমন্ত্রী
ব্যাংক ঋণ ও সরকারি কোষাগারের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে অর্থায়নের উৎস বৈচিত্র্যময় করার আহ্বান জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বাস্তবতায় প্রচলিত অর্থায়ন কাঠামো আর কার্যকর নয়। তাই ‘ব্লেন্ডেড ফাইন্যান্সিং’ বা সমন্বিত অর্থায়ন ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যেতে হবে। শনিবার (১৩ জুন) রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) যৌথ আয়োজনে ‘বাণিজ্য, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক কূটনীতিক কর্মপরিকল্পনা বিষয়ক সম্মেলনে’ প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অর্থমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে অর্থায়নের নানা বিকল্প উৎস রয়েছে। সিন্ডিকেটেড ফাইন্যান্সিং, বিভিন্ন ফান্ড ম্যানেজার ও বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ব্যাংকের বাইরেও অর্থায়নের সুযোগ দিচ্ছে। তাই শুধু ব্যাংক ঋণ বা সরকারি কোষাগারের ওপর নির্ভর করার মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। এই পরিবর্তনের প্রয়োজন শুধু বেসরকারি খাতের জন্য নয়, ব্যাংক খাত ও সরকারের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য। নতুন আর্থিক কাঠামো, নতুন অর্থায়ন পদ্ধতি এবং নতুন চিন্তার দিকে এগিয়ে যেতে হবে। সরকারের ঋণ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, অতীতে বহুপাক্ষিক ও দ্বিপাক্ষিক উৎস থেকে নেয়া ঋণের ব্যয় এখন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। পাশাপাশি সরকার যখন স্থানীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে উচ্চ সুদে ঋণ নেয়, তখন তার চাপও বাড়ে। গত এক দশকে এই প্রবণতা ঋণ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে শুধু সুদ পরিশোধের জন্য প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখতে হয়েছে। ফলে সরকারের আর্থিক সক্ষমতা বা ‘ফিসকাল স্পেস’ সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। মূলধন বাজারকে অর্থায়নের প্রধান উৎস হিসেবে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, বড় বড় বিনিয়োগের অর্থায়ন মূলধন বাজার থেকেই আসা উচিত। ইক্যুইটি এবং ঋণ; উভয় ধরনের অর্থই মূলধন বাজার থেকে সংগ্রহ করতে হবে। যদি কোনো প্রতিষ্ঠান ব্যাংক থেকে ১৪ থেকে ১৫ শতাংশ সুদে ঋণ নেয়, অথচ বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে ৭ থেকে ৮ শতাংশ খরচে অর্থ সংগ্রহ করতে পারে, তাহলে ব্যয়ের পার্থক্য বিশাল। ব্যবসার ক্ষেত্রে ঋণের খরচ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অর্থমন্ত্রী বলেন, বিশ্বের অধিকাংশ সৎ ও পেশাদারভাবে পরিচালিত ব্যবসা নিয়মিতভাবে ৪ থেকে ৬ শতাংশের বেশি নিট মুনাফা করতে পারে না। কিন্তু উচ্চ সুদের ঋণের কারণে সেই মুনাফার বড় অংশ ব্যয় হয়ে গেলে ব্যবসার টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। সরকারি অর্থায়ন কাঠামো পুনর্বিবেচনার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, আগে সরকারি অর্থায়নের প্রধান উৎস ছিল বহুপাক্ষিক ও দ্বিপাক্ষিক ঋণ, স্থানীয় অর্থায়ন এবং কর রাজস্ব। কিন্তু বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কাঠামোর পরিবর্তনের কারণে এসব উৎসের ব্যয় বেড়েছে। আগে বহুপাক্ষিক সংস্থাগুলো ১ শতাংশেরও কম সুদে ঋণ দিত। এখন অনেক ক্ষেত্রে তা ২ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছেছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যাংক ঋণের সুদের হারও তুলনামূলক বেশি, আর কর-জিডিপি অনুপাত এখনও নিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। আমির খসরু মাহমুদ বলেন, সরকারি অর্থায়ন কাঠামোকে নতুন করে মূল্যায়ন ও পুনর্বিবেচনা করার প্রয়োজন রয়েছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কাঠামোয় যে পরিবর্তন এসেছে, তা বিশ্বের সব দেশের অর্থনীতিকেই প্রভাবিত করছে। তবে উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর এর প্রভাব তুলনামূলকভাবে বেশি। এ কারণে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে একটি ভিন্নধর্মী আর্থিক কাঠামো গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে। তিনি আরও বলেন, সরকারের পক্ষে সব ধরনের ব্যয় বহন করা সম্ভব নয়। বিশেষ করে যেসব প্রতিষ্ঠান সরকারি মালিকানাধীন হলেও বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা করে, সেগুলোর সরকারের অর্থায়নের ওপর নির্ভরশীল থাকা উচিত নয়। এসব প্রতিষ্ঠানকে প্রকৃত ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের মতো পরিচালিত হতে হবে। নিজেদের প্রয়োজনীয় অর্থ বাজার থেকে সংগ্রহ করতে হবে এবং নিজেদের আয় দিয়েই পরিচালিত হতে হবে। কোনো প্রতিষ্ঠান যদি বাণিজ্যিকভাবে পরিচালিত হয়, তাহলে সেটিকে ব্যবসার নিয়ম মেনেই চলতে হবে জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, একদিকে সরকারি মালিকানা থাকবে, অন্যদিকে লোকসান হলে সরকারি কোষাগার থেকে সহায়তা দেয়া হবে; এ ধরনের ব্যবস্থা কার্যকর নয় এবং অতীতেও কার্যকর ছিল না। বাংলাদেশেও এমন ব্যবস্থার নানা উদাহরণ রয়েছে। তাই সরকারি মালিকানাধীন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নিজস্ব অর্থায়ন ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।