নিজস্ব প্রতিনিধি
০৭ সেপ্টেম্বর, ২০২২, 2:32 PM
অবশেষে নিজস্ব প্রযুক্তিতে সচল হচ্ছে ডেমু ট্রেন
*প্রাণ ফিরে পাবে চিনকি আস্তানা ও বড়তাকিয়া ষ্টেশান
২০১৩ সাল থেকে কুমিল্লা থেকে ভোরবেলায় চট্টগ্রাম শহরে যেত এই ট্রেনটি। মীরসরাইয়ের চিনকি আস্তানা আসতো সকাল ৬টা ৪০ মিনিটে। বড়তাকিয়া ষ্টেশান আসতো ৭.২এ। সাড়ে ৮টা নাগাদ পৌছাত চট্টগ্রাম শহরে। বিকেল সাড়ে ৪টায় চট্টগ্রাম থেকে ছাড়তো বড়তাকিয়া পৌছাত সন্ধা ৬টায়। চিনকি আস্তানা পৌছাত ৭. ১৫ মিনিটে। মীরসরাই অঞ্চল থেকে চট্টগ্রামের অফিস পাড়ার লোকজন শহরে যাতায়াতে সুবিধায় অনেক মানুষ উপকৃত হতো। ৭ বছর ধরে নিয়মিত চলাচলের পর এইরুটের এই ট্রেনটি ২০০০ সালের দিকে অচল হয়ে যায় । এর আগে ও পরে অন্যান্য রুটের ও ১৩ টিই বিকল হয়ে যায়। এর মধ্যে চট্টগ্রাম- দোহাজারি রুটের খুব স্বল্প দৈর্ঘ্যে যাতায়াত কারি ট্রেনটি বেশী দিন সচল ছিল। এই ডেমু ট্রেনে নিয়মিত ভ্রমনকারি চিনকি আস্তানা ষ্টেশানের যাত্রী জাভেদ ভূঞা (৪২) বলেন আমি একটি সরকারি অফিসে চাকুরি করি, বাড়িতে মা বাবা পরিবার সবাই থাকায় এই ট্রেনে নিরাপদ ভ্রমন সহ চাকুরিতে ও পরিবারে অনেক সুবিধাজনক অবস্থান রাখতে পেরেছি। ট্রেনটি বন্ধ হয়ে যাবার পর একদিকে বাড়তি খরচ, অপরদিকে পরিবার অফিসের জন্য বাড়তি সময় রাখতে গিয়ে জীবনযাত্রা অনেক বিপর্যস্ত এখন। এই বিষয়ে জানতে চাইলে রেলওয়ের চিনকি আস্তানা ষ্টেশান মাষ্টার সিরাজুল ইসলাম বলেন এই ষ্টেশান থেকে একসময় অনেক মানুষ ডেমু ট্রেনে যাতায়াত করতো। রেলওয়ের প্রকৌশলীদের এই সাফল্যে অন্যান্য রুটের পাশাপাশি এই রুটের ডেমু ট্রেনটি ও আশা করছি খুব শীঘ্রই আবার চালু হবে। এতে আবার মানুষের দূর্ভোগ লাঘব হবে। এই বিষয়ে রেলওয়ের সীতাকুন্ড থেকে ফেনী আঞ্চলিক উপ সহকারি প্রকৌশলী রিটন চাকমা বলেন এই ট্রেনটি চালু হলে আগের মতো আবার মীরসরাই উপজেলার চিনকি আস্তানা, বড়তাকিয়া ও সীতাকুন্ড উপজেলার কয়েকটি ষ্টেশান আরো নতুন উদ্যোমে প্রাণ ফিরে পাবে। প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে মডিউল পাল্টে ডেমু ট্রেনে বসানো হয়েছে ইনভার্টার। কোটি টাকার চীনা ব্যাটারি বাদ দেওয়া হয়েছে। লাগানো হয়েছে সুলভ মূল্যের ব্যাটারি। আর এই ব্যাটারির সাহায্যেই দিব্যি স্বাভাবিক গতিতে ছুটে চলছে ডেমু ট্রেন। প্রযুক্তির আগাগোড়া প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে এই অসাধ্য সাধন সম্ভব হয়েছে। পার্বতীপুর থেকে লালমনিরহাট পর্যন্ত সফলভাবে ডেমু ট্রেনের ট্রায়াল রানের সময় রাস্তার দু’পাশে ভিড় জমায় সাধারণ মানুষ। চীনা প্রযুক্তিকে বাদ দিয়ে দেশীয় প্রযুক্তি সংযোজনে কাজ করা প্রকৌশলী আসাদুজ্জামান বলেন, অনেকটা বলা যায়, বাংলা ট্রাক যে রকম চালায় ব্যাপারটা ওই রকমই করা হইছে। তাতে অনেক কম টাকা খরচ করে এগুলো চালু করা সম্ভব হয়েছে।
প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে প্রায় সাড়ে ৬ শ’ কোটি টাকা খরচে ২০১৩ সালে বাংলাদেশ রেলে যুক্ত হয় ২০ সেট ডেমু ট্রেন। কিন্তু যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে অচল হতে শুরু করা এই ট্রেনগুলোতে ৫ বছরও সেবা পায়নি দেশের মানুষ। এগুলো সারাতে উৎপাদনকারী চীনা প্রতিষ্ঠান ক্রয়মূল্যের কাছাকাছি অর্থ দাবি করেছিলো। খরচের কথা বিবেচনায় উৎপাদনকারী চীনা প্রতিষ্ঠানের কাছে মেরামত করা হয়নি ট্রেনগুলো। বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মঞ্জুর-উল-আলম চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশে পাওয়া যায় সে রকম মালামাল দিয়ে অত্যন্ত সাশ্রয়ী মূল্যে আমরা ডেমু ট্রেনগুলো মোডিফাই করেছি,তাতে এইগুলো নিয়মিত মেন্টেন করা যাবে। দেশের প্রকৌশলীরা চীনের লুকিয়ে রাখা প্রযুক্তি হটিয়ে নিজেদের প্রযুক্তি ব্যবহার করে দিনাজপুরের পার্বতীপুর ডিজেল ওয়ার্কশপে সচল করেছে ৫টি ডেমু ট্রেন।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সাবেক শিক্ষার্থী ও আনবিক শক্তি কমিশনের সাবেক কর্মকর্তা প্রকৌশলী মো. আসাদুজ্জামানের সহযোগিতা চাওয়া হয়। আসাদুজ্জামান ডেমু নিয়ে ইতোমধ্যে গবেষণা শুরু করেন। গবেষণাগার হিসেবে তিনি বেছে নেন সৈয়দপুর রেলওয়ে অফিসার্স ক্লাবের একটি কক্ষ। ৭২ দিনের প্রচেষ্টায় তিনি উদ্ভাবন করে ফেলেন বাস-ট্রাকের মতই ডেমু চালানোর প্রযুক্তি। ব্যয়বহুল মডিউল হটিয়ে দেন তিনি। সেক্ষেত্রে বসানো হয় মাত্র ২টি কন্ট্রোলার। আর চালু হয়ে যায় অচল ট্রেন। ঢাকা ও চট্টগ্রাম শহরের কম দূরত্বে চলাচলের জন্য মূলত এই ডেমু ট্রেন ক্রয় করা হয়। চীনের থাংশান রেলওয়ে ভেহিকেল কোম্পানি লিমিটেড থেকে এই ডেমু আমদানিতে খরচ হয়েছিল ৬৪৫ কোটি টাকা। ট্রেনগুলোর মেয়াদ ধরা হয়েছিল ২০ বছর। সে হিসেবে ২০১৩ সালে তৈরি করা এসব ডেমু ট্রেনের চলার কথা ২০৩৩ সাল পর্যন্ত । সাত বছরের মধ্যে ২০টি ডেমুর ১৩টিই বিকল গেছে।
দেশের বিভিন্ন রুটের মধ্যে চট্টগ্রামের চট্টগ্রাম-কুমিল্লা, চট্টগ্রাম-নাজিরহাট, চট্টগ্রাম-দোহাজারি, ঢাকা- টঙ্গী, ঢাকা- জয়দেবপুর, জয়দেবপুর-ময়মনসিংহ, সিলেট-আখাউড়া, নোয়াখালী- লাকসাম, লাকসাম-চাঁদপুর, পাবর্তীপুর-লালমনিরহাট, পাবর্তীপুর-পঞ্চগড় রুটে চলাচল করতো। ট্রেনগুলো মূলত ঢাকা ও চট্টগ্রাম শহরের আশপাশে কম দূরত্বে ২০-৩০ কিলোমিটার এর মধ্যে চলাচলের জন্য কেনা হয়েছিল। কিন্তু অন্য রুটগুলোতে দূরত্ব চারগুণেরও বেশি ছিল, যে কারনে ট্রেনগুলো বেশিদিন টিকে থাকতে পারেনি। সব মিলিয়ে আশা করা যাচ্ছে এই ট্রেনটি যেন নতুন মাত্রায় আবার প্রাণ সঞ্চার করবে মীরসরাই উপজেলার বড়তাকিয়া ও চিনকি আস্তানা ষ্টেশানের। তবে সচেতন মহল আশা করছেন পাশাপাশি মীরসরাই সদর ষ্টেশানটি ও চালু হলে এই অঞ্চলের মানুষের সুবিধা ও সম্ভাবনার নতুন মাত্রা যোগ হবে।